আমার জীবনে তিন নারী
যে কোনও পুরুষের জীবনেই
নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের
গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে
যাচ্ছি।
যে কোনও মানুষের জীবন
শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে
নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে
ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে
একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে
ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে
রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয়
আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর
ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে
আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা হিসাবে কল্পনা করা হয়। ধরিত্রী
মানে যিনি আমাদের প্রত্যেককে ধারণ করে আছেন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ধারণ করবার
ক্ষমতা রাখতে হলে একটা শক্তির প্রয়োজন আছে। সেটাই নারীশক্তি বা বলা ভাল মাতৃশক্তি।
আমার নিজের জীবনেও আমি
মনে করি তিন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনজন ছাড়া আমার জীবন পরিপূর্ণ
হয়ে উঠত না। সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি মুহূর্তেই তাদের অবদান আমি
অনুভব করি। এখনও অনুভব করছি।
ছোটবেলাতে আমি খুব
মুখচোরা ছিলাম। এখনও হয়ত আছি। তবে সব ক্ষেত্রে নয়। কিছু কিছু জায়গায়। কিন্তু যতদূর
মনে পড়ে বা বাড়ির লোকেদের থেকে যেটুকু শুনেছি তা হল, আমি সেইসময় থেকেই শুনতাম বা
দেখতাম খুব বেশি, কিন্তু বলতাম খুব কম। মানে কথা বলতাম খুব কম। হয়ত বা বলতামই না।
পরিচিত বা খুব পরিচিত ব্যক্তিরা কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে আমি হয়ত তার উত্তর দিতাম।
আমার ডাকনাম বাবু। আমার দিদিমা আমার নাম রেখেছিলেন চন্দন। “বাবু ওটা খেয়ে নে, বাবু
ওই বাক্সটা দিয়ে যা তো, বাবু যাও শুয়ে পড়ো, অথবা চন্দন ওই দেখ, উঠোনে কল্কে ফুল আর
শিউলি ফুলগুলো পড়ে আছে। যাও তো, ওগুলো কুঁড়িয়ে নিয়ে এসে এই ঠাকুরের থালায় রাখ তো,
সুন্দর করে সাজিয়ে রেখ। কেমন”।।
এই ধরণের আদেশসূচক বাক্যে
আমি কোনদিনই কোন বিরোধিতা করিনি বা দেখাইনি। যখনই যেটা বলা হত ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ করে
সেই কাজটা করে ফেলতাম। কিন্তু খুবই চুপচাপ করে করতাম সেই কাজগুলো।
ছোটবেলার ঘটনাগুলো খুব
মনে পড়ে মাঝে মাঝে। আমার দাদু (মায়ের বাবা) আমার খুব ছোটবেলাকার সময়ে মারা যান।
হয়ত তখন আমার বয়স হবে দুই কি তিন। দাদুকে নিয়ে দু তিনটে স্মৃতি আমার এখনও মনে আছে।
তবে স্মৃতিটা খুবই ঝাপসা। মনে পড়ে হ্যারিকেনের আলোয় এক ঘরে বসে দাদু বিড়ি বাঁধছেন।
পাশে দিদিমা দাদুকে সংগ দিচ্ছেন সেই কাজে। দাদু খাওয়া দাওয়ার পর একটা পিতলের ঘটি
থেকে জল ঢেলে মুখ ধুচ্ছেন। এছাড়া একটা খুব প্রিয় ঘটনা মনে পড়ে তা হল জিলিপি এবং
পাউরুটি। সেই সময় দাদু দিদার বাড়ি গেলে দাদু আমাকে এবং আমার ভাইকে কোলের মধ্যে
বসিয়ে পরম যত্নে, পরম আদরে একটু একটু করে পাউরুটি ও জিলিপি খাওয়াতেন। সুকুমার
রায়ের ছড়াতে আমরা প্রত্যেকেই হয়তো পড়েছি পাউরুটি আর ঝোলাগুঁড়ের গল্প। কিন্তু আমার
সেইসময় সবচেয়ে ভাল লাগত পাউরুটি এবং জিলিপি। খুবই আনন্দ সহকারে আমি তা খেতাম।
দাদুকে নিয়ে শেষ স্মৃতি যেটা মনে পড়ে সেটা খুব বেদনাদায়ক এক দৃশ্য। কাটা কাটা
কতগুলো দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। আমি আমার বাড়ির কাজের পরিচারিকার কোলে রয়েছি।
আমার মা হাউহাউ করে কাঁদছেন। সেই দৃশ্য দেখে আমার ভেতরটাও কেমন ছটফট করছে। আমিও
চেঁচিয়ে উঠে, কেঁদে উঠে মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। পাশ থেকে কেউ একজন আমাকে
বোঝানোর চেষ্টা করছে – “সোনাবাবু আমার, মানিক আমার, এখন মায়ের কাছে যেতে নেই”।
তারপরের দৃশ্যেই আমি দেখছি আমার দাদুকে কতগুলো শুকনো গাছের মোটা মোটা ডালের উপর
শায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে। বুকের উপর কিছু ফুলমালা দেওয়া। আমি কিছুই বুঝলাম না।
দাদুর চোখ, মুখ বন্ধ। দাদু যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। আশেপাশে অনেক লোকজনের
অনেকগুলো মুখ। মনে হল অনেক মহিলারা কান্নাকাটি করছেন। মনে হল কেউ যেন একটা গাছের
ডালের মধ্যে আগুন লাগিয়ে দাদুর শায়িত দেহের দিকে এগিয়ে আসছে। এরপর দাদুকে নিয়ে আর
কোন স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। সেই দু-তিন বছর বয়সের পর থেকে আজ অবধি দিদিমা বা
দিদার সাথে একটা সখ্যতা বা বন্ধুতা রয়েই গেছে। দিদার এখন নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স।
পরপারে যাওয়ার সময় হয়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছেন।
যাইহোক যেটা বলার বিষয় তা
হল সেই দিদা, দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই সংসারের হালটাকে ধরে
রেখেছেন। এখানেই পাঠক মাতৃশক্তির পরিচয় আপনারা পাবেন। দাদু কিছুটা আগেই চলে গেলেন।
সংসারে আর মাত্র দুটি প্রাণী। দিদিমা এবং আমার মাসিমনি। মাসিমনির বয়স তখন যতদূর শুনেছি
আঠার হয়ত হবে বা হয়েছে। সেই সুত্রে দাদুর চাকরিটাতে মাসি যোগদান করবার সুযোগ পান।
অর্থাৎ পড়াশোনার গণ্ডি ওখানেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। বলতে দ্বিধা নেই দাদুর আর্থিক
অবস্থা খুব একটা ভাল না হওয়ার জন্য উনি বাড়ি এসে আরও বিভিন্ন ধরণের কাজ করতেন। তার
মধ্যে এই একটা ছিল বিড়ি তৈরি করবার বা বিড়ি বাঁধবার কাজ। দাদু গত হবার পর দিদিমা
ধীরে ধীরে এই সব কাজগুলিই করতে লাগলেন অর্থাৎ কিনা বাড়ির সমস্ত কাজ ছাড়াও এই ধরণের
আরও কিছু কাজ যা কিনা সংসারের জন্যও প্রয়োজনীয় ছিল। মাসি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন চাকরি
নিয়ে। দিদা থাকলেন সাংসারিক কাজ কর্ম নিয়ে। শুনেছিলাম দিদাও নাকি কিছুদিন দাদুর
অফিসে কাজ করেছিলেন। আমার মায়ের বাপের বাড়ির লোকজন বলতে ছিলেন এই দুজন। দিদিমা এবং
মাসি। যেকোনো একটা সংসারে স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়েরই প্রয়োজন পড়ে। বিভিন্ন সময়ে
বিভিন্ন কাজে সংসারে পুরুষের প্রয়োজন অনুভূত হয়। কিন্তু সেই সময়কালে মানে আমি বলছি
১৯৮৫-৯০ সালের কথা। আজকের দিনে তো উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট, নারী স্বাধীনতা, ওয়ার্কিং
ওমেন এইসব ব্যাপার নিয়ে অনেক মানুষ অনেক বুলি আওড়ান। কিন্তু আমি নিজে সেই
ঘটনাগুলোর স্বাক্ষী যেখানে আমি দেখেছিলাম এবং এখনও দেখে চলেছি দুজন নারীর লড়াই।
কখনও তা সংসার টিকিয়ে রাখার লড়াই, কখনও আর্থিক সঙ্কটের লড়াই, কখনও সম্পর্কের
টানাপোড়েনের লড়াই তো কখনও শারীরিক সঙ্কটের লড়াই। বুঝতেই পারছেন মা, মাসি এই দুই
বোন এবং আমার দিদিমা, এই তিনজন মিলেই আমার মায়ের দিকের পরিবার।
দাদু চলে যাবার পর পর
বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন আমার দিদিমা এবং মাসি। একজন পুরুষ পরিচালিত
সংসারকে হঠাৎ করে একজন স্ত্রী কে চালাতে হলে তার জন্য একটা আলাদা ধক লাগে। আমি
আগেই উল্লেখ করেছি সেই সময়ে (অর্থাৎ ৮৫-৯০) দিদিমার বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি ছিল না।
হ্যারিকেন বা লণ্ঠন বা প্রদীপের আলোয় সমস্ত কাজ করতেন দিদা এবং মাসি। মনে পড়ে সেই
সময় স্টোভকে দিদিমা বেশিরভাগ সময় জনতা বলে সম্বোধন করতেন। হয়ত সেই স্টোভ কোম্পানির
নাম হবে ‘জনতা’।
-
'এই তপু (মাসির ডাকনাম) জনতায় কেরোসিনটা ভরেছিস? ভরা হলে
সেটা জ্বালায়ে দে'। এই বলতে বলতে উনি হয়ত ঘরমোছা
বা বাসনমাজা বা ফুলতোলার কাজটা সেরে ফেলছেন। আমার দিদিমার বাড়ির সামনে একটা বেশ
বড়ো উঠোন ছিল, আর ছিল একটা ছোট বাগান। সেই বাগানে জবা, শিউলি, কদম, টগর, কল্কে ফুল
ও আরও নানাবিধ গাছের ফুল ছিল। আমার এখন সেসব মনে নেই পুরোপুরি। রোজ সকালে দেখতাম
আমার মাসিমনি ঘুম থেকে উঠে সেই উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন। গাছের শুকনো শুকনো খসখসে
পাতাগুলোকে, ডালপালাগুলোকে জড়ো করে উনুনের কাজে লাগাবেন বলে একত্র করছেন। আমি
আগাগোড়াই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তাম আর চুপটি করে দাড়িয়ে থেকে এইসব দেখতাম। ওই
যে আগেই বলেছি আমি কখনোই কিছু বলতে পারতাম না, শুধুই দেখতাম আর শুনতাম। উঠোন ঝাঁট
দেওয়া হয়ে গেলে এরপর মাসিমনি চলে যেতেন ফুল পাড়তে। আমাকে বলতেন “চন্দন যা তো বাবা,
দিদার কাছ থেকে ফুলের ঝুড়িটা নিয়ে আয় তো। তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়। বাগান থেকে ফুল পাড়তে
যাব”। আমি এক ছুটে নিয়ে আসতাম ফুল তোলার ঝুড়ি এবং তার সাথে একটা লম্বা লাঠি। সেই
লাঠির মাথায় আরও দুটো ছোট ছোট কাঠের টুকরোকে বেঁধে একটা আংটা টাইপের করা ছিল। যাতে
করে সেটা দিয়ে গাছের ডালগুলো টেনে ধরে ফুল পাড়তে সুবিধা হয়।
দিদার বাড়িতে দুটো ঘর
ছিল। ঘরগুলো দরমা বা বেড়া দিয়ে তৈরি। সেই বেড়ার খাঁজগুলোর মধ্যে টুথব্রাশ এবং টুথপেস্ট
আটকিয়ে রাখা থাকত। সেইগুলো আমার বেশ লাগত। আমি দেখতাম, খেলতাম সেগুলো নিয়ে। মাঝে
মাঝেই সেই টুথব্রাশ ও পেস্টগুলো বেড়ার খাঁজ থেকে খুলতাম আর লাগাতাম। সেটাই ছিল
আমার খেলা। কখনও দুটো ইটের মাঝে তিনটে প্যাকাটি জোগাড় করে উইকেট বানিয়ে সেটার
মধ্যে ঢিল ছুড়ে ছুড়ে খেলতাম। তা যেটা বলছিলাম, দিদার দুটো ঘর ছিল বেড়ার এবং ওপরে
ছিল টালির ছাউনি। রাতে জ্বলত হ্যারিকেন বা লম্ফ। আমার বাড়িতে যেহেতু ইলেকট্রিসিটি
ছিল তাই গরমের সময় আমি দিদার বাড়িতে রাত কাটাতে চাইতাম না। বাড়ি ফিরে যাবার জন্য
কান্নাকাটি জুড়ে দিতাম। হঠাৎ করে একদিন দেখলাম দিদার বাড়িতে ‘কারেন’ এসেছে।
দুটো ঘরে দুটো পাখা
(সিলিং) এবং দুটো পাইপ লাইট। আমার মাসিমনি টিউব লাইটকে পাইপ লাইট বলতেন। মাঝে
মধ্যে এখনও বলেন। ব্যাটারি চালিত একটা রেডিও আগেই ছিল। সেটা তারপর ইলেকট্রিকের
সাথে জুড়ে দেওয়া হল। দিদা শুধালেন “কি চন্দন, এবার থেকে রাতের বেলা দিদার সাথে থাকবি
তো বাবা? এখন তো পাখা এসে গেছে। আর গরম লাগবে না, মশা আসবে না, অন্ধকারে ভূত,
ব্রহ্মদ্যোতি কিছুই আসবে না”। আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়েছিলাম। তাই দেখে দিদা এবং
মাসির কি আনন্দ। পাঠক একজন সফল অর্জনকারীর মনে প্রসন্নতা তখনই আসে যখন তিনি যাদের
উদ্দেশ্যে কোন কাজ অর্জন করছেন, তারা যদি খুশি হন, তাদের মুখে যদি হাসি ফুটে ওঠে।
তখনই। হ্যাঁ তখনই পাঠক, তখনই। আমার আনন্দেই তখন তাদের আনন্দ। কিন্তু সেই ছোটবেলাতে
তো কিছুই বুঝতাম না। কি অমানুষিক পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে ওনারা একের পর এক কাজ করে
গেছেন। ধীরে ধীরে দেখলাম বেড়ার দেওয়াল আর নেই ঘরে। চারপাশে সিমেন্টের দেওয়াল
উঠেছে। সদ্য চুনকাম করবার পর, সাদা ধবধবে ঘরটাকে ভাল করে দেখছি আর তার গন্ধ
নিচ্ছি। নতুন ঘরে ঢুকে ভাল করে লক্ষ্য করবেন, চুনের একটা গন্ধ পাবেন। আরও কিছুদিন
পর দেখলাম একটা বেশ ছোট পোর্টেবল টিভি দিদিমার ঘরে এসেছে। এই সবকিছুই দিদিমা ও
মাসিমনি তিল তিল করে, একটা একটা করে গড়ে তুললেন। জীবন চলতে থাকল, চলতে থাকল
সংগ্রাম। যা আজও চলছে। এ সংগ্রাম শেষ হওয়ার নয়। আরও বেশ কিছু বছর অতিবাহিত হতে
থাকল। চার পাঁচটা বছর পার হবার পর হঠাৎ করে শোনা গেল মাসির কোম্পানিতে লক আউট।
কোম্পানির প্রোডাকশনে কিছু ত্রুটি থাকাতে মালিকপক্ষ ধীরে ধীরে কোম্পানির কর্মীদের
ছাঁটাইএর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইউনিয়নের চাপে খুব তাড়াতাড়ি গেটে তালা না ঝুললেও
কাজকর্ম ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল। বড় কোম্পানি ছিল। বোধয় প্রাইভেট লিমিটেড। তাই
অনেকদিন পর্যন্ত মাসিমনিকে দেখেছি অফিসে হাজিরা দিতে। প্রায় শেষের দিকে আমি
মাসিমনির সাথে অফিসে যেতাম। ফ্যাক্টরিতে ঢুকতাম। বিভিন্ন মেশিনারিগুলো দেখতাম অবাক
হয়ে। মনে আছে কোনও এক বিশ্বকর্মা পুজোয় আমি মাসিমনির সাথে অফিসে গিয়েছি। অফিসে আরও
মামা মাসিরা আমায় একটা প্লেটে করে নাড়ু, খই, ফল ও ইয়া বড়ো একটা লাড্ডু খেতে দিয়ে
গিয়েছিল। আমি তো প্লেট নিয়ে বেজায় খুশি। বড় ভালো ছিল সেইসব দিন। জিনিস ছিল অল্প,
আমাদের চাহিদাও ছিল খুব কম, কিন্তু মনে আনন্দ ছিল অনেক বেশি। মনে আছে একবার,
মাসিমনির অফিসে লাঞ্চ টাইমে খাওয়া দাওয়া করে খুব ঘুম পেয়ে গেল। বাচ্ছা ছেলে,
চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমোতে গিয়ে বারবার করে আমার মাথাটা চেয়ার থেকে বাইরে পড়ে
যাচ্ছিল। তখন মাসিমনি অফিসের পাশে রাখা পিচবোর্ডের বাক্সগুলোকে সমান করে দিয়ে তার
মধ্যে আমায় শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তা সেই কোম্পানি যখন ধীরে ধীরে বন্ধ হতে
থাকল, তখন দিদা ও মাসিমনি তাদের সেই বাড়ির বাগানের কিছু অংশে একটা ঘর তৈরি করে সেই
ঘরে এক ভাড়াটে বসালেন। বুঝতেই পারছেন পাঠক। নদীর এক পার গড়ে আর এক পার ভাঙ্গে।
আমার মাসিমনি ও দিদার তখন জীবনের সেইরকম এক ভগ্নদশা চলছে। তাছাড়া আরও একটা চিন্তা
দিদিমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তা হল আমার মাসিমনির বিবাহ। ঘরে একজন বিবাহ যোগ্যা
কন্যা থাকলে তার দায়িত্ব পিতা মাতার উপরই বর্তায়। এক্ষেত্রে দাদুর অবর্তমানে পুরো
দায়িত্বই ছিল দিদার। ধীরে ধীরে সময়ের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়েও সেই কার্য
সম্পন্ন হয়। মাসির বোধহয় সেই সময় ৩০ কি ৩২ বছর বয়স। কোম্পানি পুরোপুরি বন্ধ। ঝাঁপি
বন্ধ করবার সময় কিছু টাকা মাসিমণি পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে এবং আরও কিছু যোগাড়ের
মাধ্যমে মাসির বিবাহ সম্পন্ন হয়। ১৯৯৯-২০০০ সালের পর দিদিমা পুরোপুরি একা হয়ে
গেলেন।
আমার মেসোমশাই কলকাতায়
সরকারী অফিসে চাকরি করতেন। মাসির বিয়ে হয়েছিল হালিশহরে। সম্ভবত মেসোমশায়ের হালিশহর
থেকে ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে চাকরি করতে অসুবিধা হচ্ছিল। তাই মাসিমণি ও
মেসোমশাই কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থাকা শুরু করলেন দিদিমাকে এক সাথে নিয়ে। দিদিমার পক্ষে
একটু সুবিধে হল। মাসি বিয়ে হয়ে চলে যাওয়ার পর দিদিমার একা থাকতে বেশ কষ্টই হত।
কিন্তু তিনি তা আমাদের কাছে কোনদিনই বুঝতে দেন নি। আমি তখন ১৮-১৯ বছরের হব। মাঝে
মাঝে দিদাকে দেখতে যেতাম। দিদা সেই সময়তেও আমার জন্য ভালো ভালো মাছ বাজার থেকে
কিনে এনে খাওয়াতেন। নিজে বাজার থেকে নিয়ে আসতেন এবং সুন্দর করে রেঁধে বেড়ে
খাওয়াতেন। আমি খুব তৃপ্তিসহ খেতাম। এখনকার বাচ্চারা তো দিদিমা ঠাকুমার ভালোবাসা কি
তাই বুঝতে পারে না। আসলে তারা জানেই না। আমি ভাগ্যবান আমি সেই ভালবাসা পেয়েছি এবং
আজও পেয়ে চলেছি। বাবাও সেইসময় মাঝে মাঝে যেতেন দিদার কাছে। দিদাকে গিয়ে দেখে
আসতেন। কিন্তু সে তো ক্ষণিকের। হ্যাঁ এটা ঠিক আমরা যাওয়াতে দিদিমা একটা মানসিক
সন্তোষ লাভ করতেন। আনন্দ পেতেন, সুখী হতেন। কিন্তু সেই সময়কার নিত্যদিনের লড়াই তো
ওনাকেই করতে হতো। মা আমাদের সংসারে এতটা বেশীমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছিলেন যে মায়ের
পক্ষে দিদাকে নজর দেওয়াটা সেভাবে কোনদিনও হয়ে ওঠে নি। বাবার মতো মা’ও মাঝে মধ্যে
সংসারের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে অনেক তর্কবিতর্ক করে কোনও কোনও দিন দিদিমার কাছে
যেতেন। সেও তো খুবই সল্প সময়ের জন্য। আসলে মায়ের পক্ষে এর থেকে বেশি কিছু করা
সত্যি সম্ভব ছিল না। নিজের সংসারের যাঁতাকলে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছিলেন। আমাদের
বাড়িতে তখন পাঁচজন সদস্য। আমার ঠাকুরদা তখন সদ্য গত হয়েছেন। মা কেই সমস্ত কাজ করতে
হতো। আমি ছোটবেলা থেকে মা’কে হেন কোনও কাজ নেই যা করতে দেখিনি। অবিশ্যি সেটা সংসার
সম্পর্কিত কাজই বটে। এখনকার মহিলারা বাইরের অর্থাৎ অফিস কাছারি, ব্যাঙ্ক যাওয়া
ইত্যাদি কাজেও পটীয়সী হন। মা হয়তো অফিস সংক্রান্ত কাজে সেরকম সুযোগ কোনোদিন পান
নি। কিন্তু সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক যে যে কাজগুলো মা নীরবে, মুখ বুজে,
অনেকের অনেক কথা শুনে, অনেক অপমান সহ্য করে চালিয়ে গিয়েছেন তা বোধকরি এখনকার যুগের
কোনও মহিলার পক্ষেই তা সম্ভবপর হবে না। আসলে আমার মা, মাসি, দিদিমা এদের তিনজনের
মধ্যে একটা আশ্চর্য্য রকমের গুন ছিল এবং তা এখনও আছে। এত অল্পতে এরা সন্তুষ্ট এবং
খুশি হতেন যে তা বলার নয়। আমি দেখেছি আমার মা’কে ‘খুব ভাল বউ’ এর তকমা দিয়ে আমার
ঠাকুমা অনেক কাজ করিয়ে নিয়েছেন। ‘আমার বড় বউ খুব কাজের’, এমন মেয়ে পাওয়া সত্যি
দুস্কর’। এরকম ধরণের কিছু মন্তব্য বোধহয় আমার মা’কে ভেতরে ভেতরে একটা অনুপ্রেরণা
যোগাত। আর অনুপ্রাণিত হয়ে আরও বেশি করে মা চাইতেন তার এই ‘ভালো তকমা’ টা প্রমাণ
করতে। ফলস্বরুপ মা সংসারে ব্যবহৃতই হতে থাকলেন। যোগ্য বউমার সম্মানটা ঠিক পেলেন
না।
আমি আগেই বলেছি ভাল বউয়ের
তকমা দিয়ে ঠাকুমা আমার মা’কে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিতেন। আগে আমাদের বাড়িতে ছিল
যৌথ পরিবার। দাদু, ঠাকুমা, বাবা, মা, কাকা, কাকিমা, পিসি, পিসেমশাই ও আমরা
বাচ্চারা। সবাইকে নিয়েই ছিল আমাদের পরিবার। এক হাঁড়িতেই রান্না হত সবার। এই
রান্নার কাজে প্রধান দায়িত্বই ছিল আমার মায়ের। কেন হবে না বলুন। বাড়ির বড় বউ বলে
কথা। দায়িত্ব তো নিতেই হবে। কর্তব্য তো করতেই হবে। শুধুমাত্র রান্নার কাজ নয়, আরও
নানাবিধ কাজ মা’কে অত্যন্ত দায়িত্ব সহকারে করতে হয়েছে এবং পান থেকে চুন খসলেই
অনেকের কাছ থেকে অনেক রকমের কথা শুনতে হয়েছে, এবং তা আজও হয়ে চলেছে। আমার পিসির
ছিল দুই ছেলে। ছোটবেলা থেকেই ওরা বড়মামা, বড়মামী বলে পাগল ছিল। বাচ্চারা যেমন হয়
আর কি। তাছাড়া বেশিরভাগ সময়তেই ওদের খাওয়া-দাওয়া, স্নান করানো, কাপড় কাঁচা সব মা’ই
করে দিতেন। একটা ভালোলাগা বা ভালোবাসা থেকে হয়তো আমাদের সাথে সাথে ওদের এই
কাজগুলোকে মা একসাথে করে দিতেন। আলাদা ভাব তখন এত ছিল না। আমার মনে আছে বাবা
আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে একসাথে একবার আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। আমরা দল
বেঁধে একত্রে আঁকার স্কুলে যেতাম, আর এখন তো আমরা একটা বাচ্ছা সামলাতেই হিমসিম
খেয়ে যাই। আমাদের মায়েরা বা তখনকার মায়েরা এই সমস্ত কাজগুলো একত্রে এবং হাসিমুখেই
করতেন। পাঠক মনে রাখবেন পাঁচজনের সংসারে পাঁচজনের নানাবিধ দাবিদাওয়া থাকে। এই
নানাবিধ দাবি দাওয়া মেটানোর দায়িত্ব বাড়ির মহিলাদের উপরই বেশি বর্তায়। তাই বাবা
মায়ের উপরই বেশি চাপ ছিল সেসময়।
আবার একটু মাসি ও দিদার
কথায় আসা যাক। মেসোমশাই পাকাপাকিভাবে কলকাতায় এসে থাকা শুরু করলেন এটা তো আগেই
বলেছি। এতে দিদিমার একপ্রকার সুবিধাই হল। আমারও মনটা বেশ ভালো লাগতে শুরু করল।
সবাইকে একসাথে পাওয়া গেল। দিদা, মাসিমণি, মেসো এবং আমার ছোট্ট বোনুকে একসঙ্গে
পেলাম আমরা সবাই। ধীরে ধীরে বোনু বড় হতে লাগল। স্কুলে পড়া শুরু করল। মেসোমশাই
সরকারী অফিসে চাকরি করতেন। অফিস থেকে লোন নিয়ে মাসির নামে যে প্রাপ্ত জায়গাটা ছিল
তাতে ঘরগুলোকে বেশ পাকা পোক্ত করে, ছাদ ঢালাই করে একটি ছোট একতলা বাড়ি করলেন।
আমাদের সাধের বাগানটা এতে আর রইল না ঠিকই, কিন্তু দুটো পাকা পোক্ত ঘর হওয়াতে বৃষ্টির
দিনের সমস্যা, জলের সমস্যা ও আরও বিবিধ সমস্যা মিটল। দিদার বাড়ির ঘরগুলো অত্যধিক
নিচু হওয়াতে বর্ষার সময় জল ঢুকে যেত। রাস্তা থেকে ঘর নিচু ছিল সেসময়। এরকম অনেক
সময় আমি দেখেছি যে খাটে সবাই উঠে বসে আছে সমস্ত কিছু নিয়ে, লোটাকম্বল নিয়ে, ঘরময়
জল শুধু থই থই করছে। দু তিনদিন ধরে হয়ত হাঁড়ি চরে নি। পেট ভরাবার জন্য দিদা এবং
মাসিমণি একটু মুড়ি, গুড় ও বিস্কুট এইসব খেয়েই রয়েছেন। আমি এরকম ঘটনাও মা এবং মাসির
মুখে শুনেছি যখন বর্ষা হয়ে ঘরময় জল থই থই করছে তখন আশপাশের পুকুর থেকে জ্যান্তমাছ
ঘরের মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে নিত্যদিন। আটাত্তর সালের বন্যা হয়ত অনেকেরই জানা
থাকবে। আমার জন্মেরও আগের কথা। সেই বন্যার সময় আমার দিদা, দাদু বাড়ির মধ্যে ঢুকে
যাওয়া বর্ষার জল সাঁতরে পার হয়ে পাড়ারই মধ্যে এক দোতলা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ছোটবেলায়
মাসিমণি একটু ডানপিটে টাইপের ছিলেন। পুকুর থেকে জ্যান্তমাছ ঘরের মধ্যে সাঁতরে
বেড়াচ্ছে শুনে পাড়ার সেই দোতলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাঁতার কেটে নিজের ঘরে চলে
এসেছিলেন। দিদার ঘরে তখন গলা পর্যন্ত জল থইথই করছে।
এইসব ঘটনাগুলো আমার দিদা,
মাসিমণি, মা এনাদের কাছ থেকেই শোনা। অনেক কষ্টে কেটেছিল তাদের সেইসব দিন। অমানুষিক
পরিশ্রম ও লড়াই চলছিল তখন তাদের এবং আজও অনবরত চলছে সেই পরিশ্রম ও লড়াই।
লড়াই আজও চলছে এই তিন
নারীর জীবনে। আমরা পুরুষ মানুষেরা আশেপাশে থেকেও কিছুই করতে পারিনি। মা আজও
সংসারের যাঁতাকলে আটকে থেকে পরিশ্রম করেই চলেছেন। বাবার অসুস্থতার কারণে ও আরও
বিবিধ কারণে শারীরিক ও মানসিক খাটনি বেড়ে গিয়েছে। আসলে কোনোদিন তো মুখ খুলে
প্রতিবাদটা করতে পারলেন না। তাহলে হয়তো শান্তি পেতেন জীবনে আরেকটু। ২০১২ সালে
মেসোমশাই মারা যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। সুতরাং মাসিমণির লড়াই যে এখনও চলছে
তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দিদা আজ
শয্যাশায়ী। মাঝে মধ্যে লোকজন চিনতেও ভুল করেন। কিডনিতে টিউমার ধরা পড়েছে। উনিও
লড়াই করেই চলেছেন। এর মধ্যে দিয়ে আরেক নারী বড় হয়ে চলেছে। আঠার বছর সম্পূর্ণ হয়েছে
তার। আমার বোনু। লড়াই তারও চালু হয়ে গেছে। যে যার নিজের জায়গা থেকে লড়াই করে
চলেছে। আমি শুধুমাত্র বিহ্বল হয়ে এগুলো দেখে চলেছি। কিছুই করতে পারলাম না জীবনে
কারোর জন্য।

We are so lucky to have a supporter like you..😊
ReplyDelete