তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব
-
দেবু বাবু শুনছেন!
দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন
সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ
লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার
বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই
রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না
করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে
হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন
থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই
লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও
লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না।
তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন
আছেন যিনি তিরুপতি মন্দিরের এই স্পেশাল দর্শনের টিকিট ও লজে থাকার বন্দোবস্ত করে
দেবেন। কিন্তু মিস্টার সুব্রমনিয়াম নিজে আসবেন না। কোন এক ব্যক্তির মাধ্যমে টিকিট
পাঠিয়ে দেবেন। তাই আপাতত সেই লজের দিকে ওরা বেশ জোরের সাথে হেঁটে চলেছে। কিছুক্ষণ
পর যখন ওরা সেই লজের সামনে মানে তিরুমালা লজের সামনে পৌঁছল তখন মিস্টার
সুব্রমনিয়াম ফোন করলেন চকু দা’র মোবাইলে। মিনিট পাঁচেক ধরে কথা বলার সময় দেবু হঠাৎ
করে লক্ষ্য করল ওদের দিকে একজোড়া চোখ ওপারের ফুটপাথ থেকে নজর রাখছে। দেবুর এবার আর
সহ্য হল না। এক মুহূর্তের মধ্যে প্রায় লাফিয়ে সেই অচেনা অজানা লোকটির কাছে চলে গেল
এবং ওনার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল – ‘ক্যায়া বাত হ্যায় ভাইসাব? আপ হামারে পিছা
কিউ কর রহা হ্যায়? হুম? ট্রেন সে দেখ রহা হু আপকো’। ভদ্রলোক বেশ ঘাবড়ে গেলেন। কেমন
একটা আমতা আমতা করতে থাকলেন। ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে বললেন – ‘আপকে লিয়ে আতা,
টিকিট কে লিয়ে, মন্দির দর্শন করাতা’।
‘ক্যায়া টিকিট, আতা যাতা, সব বোল রহা হ্যায়? বুরবক সমঝকে রখা হ্যায় ক্যায়া
হামকো? পিছা কিউ কর রহা থা, পহেলে ও বতাও’। এমন সময় চকু দা পিছন থেকে সেই লোকটির
উদ্দ্যেশে বলল – ‘ ও তো আপ হি হ্যায় মিস্টার রেড্ডি? সুব্রমনিয়াম নে আপকো হি ভেজা
হ্যায় টিকিট দেকর’? এই প্রশ্ন শুনে মিস্টার রেড্ডি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কোনরকমে
বলল – ‘টিকিট লেকে আতা, মন্দির দর্শন কড়তা’। চকু দা তখন হাসতে হাসতে বলল – ‘ হা হা
ঠিক হ্যায় সমঝ গয়া, দিজিয়ে কাহা হ্যায় টিকিট’? এরপর টিকিট হাতে নিয়ে ওরা মিস্টার
রেড্ডিকে বিদায় জানাল। মিস্টার রেড্ডি হিন্দিটা একদমই বলতে পারেন না। টিকিট লেকার
আয়া বলতে গিয়ে টিকিট লেকে আতা, যাতা, কড়তা এইসব বলতে থাকে। যাই হোক ওরা তিনটে
স্পেশাল দর্শনের টিকিট ও তিরুমালা লজের টিকিট পেয়ে গেল। মিস্টার সুব্রমনিয়ামের
সঙ্গে চকু দা’র আগে থেকেই বেশ ভাল জানাশোনা ছিল। উনিই রেড্ডিকে পাঠিয়েছিলেন।
ট্রেনে থাকাকালীন রেড্ডির অনেকবার মনে হয়েছিল যে এই তিনজনই বোধহয় সেই তিনজন যাদের
টিকিট দিতে হবে, কিন্তু মুখ চেনা না থাকায় এবং হিন্দি ও ইংরাজি ঠিক ঠাক বলতে না
পারার জন্য ঠিক সাহস করে ওদের কাছে আসতে পারেনি। তাছাড়া লোকটা একটু ভিতু টাইপেরও।
(৩)
তিরুপতি দর্শনের জন্য ওরা তিনজন খুব সুন্দর সাদা রঙের তিন তিনটে ধুতি
কিনেছিল। বেশ লেগেছিল ধুতি পরে ওদের তিনজনকেই। ভারতবর্ষে যেকোনো ধর্মীয় স্থানে খুব
ভিড় থাকে। এখানেও তাই। লোকে লোকারণ্য। স্পেশাল দর্শনের সুবিধার জন্য ওদের ঘণ্টা
তিনেক লাইনে দাঁড়াবার পরপরই তিরুমল বাবাকে দর্শন পেল ওরা। এই লাইনে থাকাকালীন
সমস্ত ভক্তগণ গোভিন্দা গোওওভিন্দা বলে হাক দিতে দিতে মন্দিরের মূল ফটকে প্রবেশ করছিল।
পাল বাবু বেশ ভক্তিভরে গদগদ হয়ে দু হাত তুলে তিরুমল বাবাকে দর্শন করতে লাগলেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বাধ সাধলেন ওখানকার সিকিউরিটি গার্ড। ওদের তিনজনকেই প্রায়
ধাক্কা মেরে বাইরে বার করে দিলেন মন্দির চত্বর থেকে। অবশ্য ওদের তিনজনই শুধু নয়,
সমস্ত তীর্থযাত্রীদেরই প্রায় ঠেলে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়া হচ্ছিল মন্দির
থেকে। নইলে এই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দর্শন হবার পর ভক্তবৃন্দগণ দলে দলে
সেখানকার হুন্ডিতে কেউ টাকাপয়সা, কেউ সোনাদানা ইত্যাদি ভগবান তিরুমলের উদ্দ্যেশে
দান করে। একজনকে দ্যাখা গেল ১০০ টাকার প্রায় ২০/২২ টা বাণ্ডিল একত্র করে সেই
হুন্ডিতে দান করছেন ও সেই হুন্ডিকে জড়িয়ে ধরে নিজের মনস্কামনা করছেন। কথিত আছে তিরুমল,
পদ্মাবতী অর্থাৎ লক্ষ্মীকে বিবাহ করবার অভিপ্রায় নিয়ে এই তিরুমালা শহরের পাহাড়ের
উপর এসে কুবেরের কাছে টাকা ধার করেছিলেন। সেই ধার করা টাকা শোধ করবার জন্য
তিরুমলকে তার ভক্তগণ অর্থ, সোনা, দানা দিয়ে তাকে সাহায্য করেন এই ভেবে যে তিরুপতি
মহারাজ বা ভগবান তিরুমল সেই অর্থ অনেকগুন পরিমাণে ফিরিয়ে দেবেন। এই জন্যই এই
হুন্ডিগুলোতে এত ভর্তি ভর্তি টাকা, সোনাদানা দ্যাখা যায়। তবে দেবুর একটা ব্যাপার
ভেবে ভাল লাগে যে তিরুমল ও পদ্মাবতী যাদের কখনওই মিলন হল না, যাদের মধ্যে একজন
পাহাড়ের উপর ও একজন পাহাড়ের নীচে অবস্থান করে আছেন আজও শুধুমাত্র মিলনের কাঙ্খিত
আশায়। হ্যাঁ ঠিক তাই। পদ্মাবতী দেবীর মন্দির পাহাড়ের নীচে। এর মধ্যে কেন যেন দেবুর
মনে হয় কোন স্বার্থত্যাগ ও মানসিক দর্শন লুকিয়ে আছে। যুগ যুগ ধরে এনারা পূজিত হয়ে
আসছেন। কিন্তু না এদের মিলন হল না বিচ্ছেদ। ঠিক যেন পদ্মপাতার উপর এক বিন্দু জলের
উপর, শুধু টলমল করতে থাকে কিন্তু পড়ে যায় না।
(৪)
পরের দিন অর্থাৎ ১৮.০৯.১৬ তারিখে ওরা সেই বাসে করে তিরুমালা থেকে তিরুপতি
ফিরে আসে। সেখানে অটোয় করে ওরা দেবী পদ্মাবতী দর্শনে যায়। সেখানেও ভক্তবৃন্দের ভিড়
লেগেই রয়েছে।
ধর্মীয় স্থানে অধর্ম বেশি করে হয় এরকম একটা ধারণা দেবুর বদ্ধমূল ছিল। কিন্তু
তিরুপতি যাবার পর ওর সেই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেল। তার প্রথম কারণ যখন ওরা লাড্ডু
কাউন্টারে লাড্ডু নেবার জন্য গিয়েছিল তখন কিন্তু প্রাপ্য লাড্ডু সংখ্যার থেকে
একটিও বেশি লাড্ডু ওরা পেল না অতিরিক্ত অর্থ দেবার আশ্বাস দিয়েও। সবার জন্যই
সংখ্যাটা সীমাবদ্ধ। দ্বিতীয় কারণ হিসাবে সেই অটো চালকের কথা মনে হল দেবুর যে ওদের
তিরুপতি স্টেশন থেকে পদ্মাবতী মন্দির পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। মন্দিরে যাবার পর সেই
অটোতেই ওদের ব্যাগ, মোবাইল, জুতো, এমনকি টাকা পয়সাও গচ্ছিত রেখে যেতে হয়েছিল।
একমাত্র অটোচালকের গাড়ির নম্বর ছাড়া ওদের কাছে আর কোনরকম ইনফরমেশন ছিল না।
অটোচালকের নামটা পর্যন্ত ওরা জানত না। এতে দেবুর ঘোর আপত্তি ছিল কিন্তু চকু দা’র
জোরাজুরিতে সেগুলো জানাও আর হয়ে ওঠেনি। আর পালবাবুতো পালবাবুই। কিছু বললেই বলে সব
ভগবানের ইচ্ছে। কোন সমস্যাই হবে না। মন্দির দর্শন করবার সময়ে দেবুর মনে একটা
আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যদি জিনিসগুলো আর ফিরে না পাওয়া যায় তাহলে কি হবে। কিন্তু ফিরে
যাওয়ার পর সবকিছুই যথাযথভাবে ফিরে পেল ওরা।
দুপুর দুটো নাগাদ ওরা স্টেশনে এসে একটি হোটেলে লাঞ্চ সেরে নিল। এরপরের সময়টা
ওরা ওয়েটিং রুমেই কাটিয়ে দিল। বিকেল ৫ টা নাগাদ তিরুপতি স্টেশন থেকেই ওদের ট্রেন।
বিকেল হওয়ার কিছু আগে অনেক লোকজন স্টেশনে জড়ো হতে দ্যাখা গেল যাদের মস্তকমুণ্ডন
করা হয়েছে সদ্য। অর্থাৎ বাচ্চা, বুড়ো, স্ত্রি, পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই ন্যাড়া
হয়েছে। তিরুপতি গেলে অনেকেই মানত টানত করে ও ন্যাড়া হয়। ওরা ট্রেনে উঠতে যাবে এমন
সময় হঠাৎ দেবু দেখে সামনে মিস্টার রেড্ডি কিন্তু ন্যাড়া মাথা। দেবু পেছন থেকে গিয়ে
রেড্ডির কানের কাছে গিয়ে বেশ জোরের সাথে জিজ্ঞাসা করে – ‘ক্যায়া বাত হ্যায় রেড্ডি
সাব আপনা বাল ভগবানকো অর্পিত কর দিয়ে’? রেড্ডি আবারও একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু
ওর গোলমুখে একটু মুচকি হাসি হেসে ওদের নমস্কার জানাল। দেবু ওর দিকে নিজের হাতটা
বাড়িয়ে দিয়ে বলল – “ Thank you Mr. Reddy & don’t mind for that day.”
সমাপ্ত............

Comments
Post a Comment