জলগাঁও স্টেশনটি বেশ বড়সড়ই। বেলা সাড়ে নটা নাগাদ ওরা তিনজনে যখন ষ্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়াল তখন সেখানে জনঅরণ্যের আধিক্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছুটা এগোলে সারি সারি দোকান, হোটেল, রিক্সা ও অটোস্ট্যান্ড। ষ্টেশনের ঠিক পাশেই বি আর আম্বেদকারের মূর্তি। তার ঠিক সামনের খালি জায়গাটায় বোধহয় কোন রাজনৈতিক দলের মিছিল জড়ো হয়ে আছে। সকাল বেলাতেই রোদের তেজ বেশ প্রখর। তিনজনের মধ্যে উজ্জ্বল এবং ভোদলু দা'র ব্যাগগুলো বেশ লম্বা লম্বা। আয়তনে বেশ খানিকটা বড়। ওই ট্রেকিংএর রুকস্যাক ব্যাগগুলো যেমন হয় আর কি। সেই ব্যাগ নিয়ে ভোদলু দা গরমের মধ্যে হাঁস ফাঁস করতে করতে একটি চায়ের দোকানে এসে বসল। উজ্জ্বল এবং যাদব চা সহযোগে মহারাষ্ট্রের পুরি অর্থাৎ লুচির অর্ডার দিল। লুচি ও আলুর তরকারি খেয়ে ভোদলু দা'র জিভের দফারফা। গলা,বুক ও পেট তিনটেই একদম জ্বলছে। ভোদলু দা উঃ আঃ করতে করতে নিজের সুপুষ্ট গোলগাল ভুঁড়িটিতে হাত বোলাতে লাগল। মহারাষ্ট্রের খাবারগুলোর মধ্যে অত্যধিক শুকনো লঙ্কার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তা সে পুরিসব্জি, পাওভাজি বা চাট যাই হোক না কেন। খাওয়া দাওয়া সাঙ্গ হবার পর একটি অটোয় করে সোজা বাস স্ট্যান্ড। জলগাঁও থেকে ঔরঙ্গাবাদ যাবার বাসে উঠে পড়ল ওরা তিনজনে। প্রথম দিন ওরা যাবে অজন্তায়। অজন্তা স্টপেজ বললে বাস সেখানেই নামিয়ে দেবে। মহারাষ্ট্রের সরকারি বাসগুলো সংখ্যায় অনেক এবং হাইওয়েগুলোতে বেশ পাল্লা দিয়ে চলে। দুরন্ত গতিতে বাস চলছে ও সেইসাথে হুঁ হুঁ করে জানলা দিয়ে হাওয়া বইছে। ভোদলু দা বেশ আয়েশ করে বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসল ও একটু ঘুমোবার চেষ্টা করল। যতই হোক ট্রেনেতে ওই আধো আধো ঘুমটা যদি এই বেলা পুষিয়ে নেওয়া যায়।
সময় দুপুর ১টা
-"বুঝলে উজ্জ্বল, যা গরম তিনটে ডাব খাওয়া যাক বরং। কি বল?"
ভোদলু দা বলল। ওরা তিনজনে এখন অজন্তা বাস স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে। ঠা ঠা পোড়া রোদ, অসহনীয় গরম। তাই তিনজনে মিলে তিনটে ডাব চোঁ চোঁ করে টানতে লাগল। অজন্তা গুহার সামনে যেতে গেলে আবার অটো ধরতে হবে। সুতরাং অটো করে অজন্তার গেটের সামনে প্রবেশ। গেট থেকে প্রবেশ করবার পরই পাহাড়ী খাঁড়াই রাস্তা। রাস্তাগুলো এঁকে বেঁকে চলেছে। পথ মসৃণ কিন্তু বেশ চড়াই। উজ্জ্বল বলে উঠল- "ভোদলু দা আবার ট্রেকিং শুরু হল আমাদের। কেমন লাগছে?"
-"বুঝলে ভায়া, পাহাড় বোধহয় আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে, নইলে হঠাৎ করে কেন এখানে ভিড়ে গেলাম বল। তুমি তো জানই, কেমন লাগতে পারে আমার।" ভোদলু দা বলল।
-"ও তুমি তো আবার লেখ্যকার। তা হবে নাকি অজন্তা ইলোরা নিয়ে লেখালেখি?" যাদব বলল।
-"আসলে আমি নিজেও জানি না কলম কোন সময়ে চলবে। তবে আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।" - ভোদলু দা বলল।
টুকটাক কথা বলতে বলতে ওরা এসে পৌঁছল এক নম্বর গুহার সামনে। গুহা দেখে ওরা তিনজনেই অভিভূত। চোখ যেন ফেরানোই যায় না। কি অসম্ভব শিল্পকলার নিদর্শন। পাশে গুহা সম্পর্কিত কিছু তথ্য পাওয়া গেল। একটা সাইনবোর্ডে হিন্দি এবং ইংরেজিতে ছাপানো। ঔরঙ্গাবাদ সার্কেলের ARCHEOLOGICAL SURVEY OF INDIA দ্বারা সমস্ত তথ্য খুব সংক্ষেপে রয়েছে সেই সাইনবোর্ডে। এই এক নম্বর গুহাটিকে কেটে কেটে একটা সুন্দর মনাস্ট্রি তৈরি করা হয়েছে ভগবান বুদ্ধের। ভীষণ সুসজ্জিত এই মনাস্ট্রি (35.7 x 27.6m)। মহাযান সম্প্রদায়ের এই মনাসট্রিতে রয়েছে একটা বারান্দা, একটা বড় হল ঘর এবং চারপাশে ছোট ছোট কুঠুরি। গুহা মধ্যে প্রবেশ করে একদম সোজাসুজিই ভগবান বুদ্ধের মূর্তি। তার পাশে বোধিসত্ত্ব ও আরও পাঁচজন শিষ্যের মূর্তিও দণ্ডায়মান। আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে এই পুরো স্থাপত্যটা একটা পাহাড়ের গুহা কেটে কেটে তৈরি করা। কি অসম্ভব সুন্দর সেই কারুকাজ। প্রাচীনকালের শিল্পনিদর্শন যে এই মাত্রায় যেতে পারে ভাবলে সত্যি অবাক হতে হয়। আশ্চর্যচকিত হয়ে ওরা তিনজনে শুধু দেখতেই থাকে গুহার অভন্ত্যরীন কারুকাজগুলো। গুহার প্রধান ফটকের গায়ে একজোড়া নগ্ন নারীপুরুষের রতিক্রিয়ার স্থাপত্য। কি নিখুঁত সে শিল্পকলা। মাথার মুকুট, হাতের চুরি, কোমরের অলংকার বা কোমর বিছে, মনে হয় যেন কোনও জলজ্যান্ত নারীপুরুষের সঙ্গম দৃশ্য সামনে থেকে দৃশ্যমান। নারী শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমা, তার এলোকেশ, বক্ষবিভাজিকা, সুডোল হাত, নিতম্ব ও পদযুগল যেকোনো পুরুষের শরীরে যৌনতার আবহ তৈরি করছে। অত প্রাচীনকালে কি উপায়েই বা গুহার অভ্যন্তরীণ ছাদগুলি বিভিন্ন পাথর বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে সেটাই অবিশ্বাস্য। ভোদলু দা অপলক চাউনিতে দেখতে থাকে সেই অবিস্মরণীয় কীর্তিগুলো। পাশ থেকে যাদব বলে উঠল - "দাদা, আর কত রতিক্রিয়ার কারুকার্য দেখবে, এরপর তো এর প্রতিক্রিয়া অন্যরকম হয়ে দেখা দেবে।" সম্বিত ফিরে পাবার পর ভোদলু দা'র সরস মন্তব্য - "ভালো করে গেঁথে নিচ্ছি, দু'মাস পর ভাল কাজে আসবে। আর তোমরা শুধু দেখো না একেবারে ছবি তুলে রেখ। তোমাদেরও কাজে আসবে। আগে আর পরে।"
আপনারা কি কিছু বুঝলেন? ওই দু'মাস পর ভাল কাজে লাগবে'র ব্যাপারটা? বুঝলেন না তো? এই যে অজন্তা ইলোরার গল্পটা আপনাদের বলছি এটা কোন মাসের? ভুলে গেছেন তো? অক্টোবর (২০১৭) মাসের। চুপিচুপি এই বেলা বলে রাখি এর ঠিক দুইমাস পর অর্থাৎ ডিসেম্বর(২০১৭) তে ভোদলু দা'র বিয়ে। তাই উনি ভাল করে গেঁথে নিচ্ছেন।
না আজকে আর কোনও গল্প নয়। বাকি গল্প নেক্সট পর্বে। চলি? বাআআআআই।।

Kemon Laglo 4th edition ? janaben apnara.................
ReplyDelete