ভাইজ্যাগ ২০৪০
অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের
নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে
দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে
প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে
হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের
ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক
অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে
ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ।
সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু
মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু
এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির
খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল
বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো
বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদারার হাতল দুটি বেশ চওড়া। মেহগিনি কাঠের। খুব সুন্দর
পালিশ ও কারুকাজ করা। অংশুমানের স্ত্রী কঙ্কণা একটি কেদারায় এসে বসলেন। হাতে চায়ের
কেটলি ও কাপ। টেবিলের উপরে ট্রেতে অনেক রকমের বিস্কুট সুসজ্জিত। স্বামীর পাশে গিয়ে
দাঁড়াল কাঁকন। অংশুমানের দেওয়া আদুরে নাম। গত ২০১৮ তে কোন এক রোম্যান্টিক সকালে
রামকৃষ্ণ বিচের একদম পাশে কোন এক ছিমছাম হোটেলের রুমে হঠাৎ করেই এই সুন্দর নামটা
উপহার দিয়েছিল অংশুমান ওর স্ত্রীকে। নরম বিছানায় এক পরম আবেগঘন মুহূর্তের প্রতিটা
ক্ষণ আজও রোমাঞ্চিত করে কঙ্কণাকে। সেই চিরস্মরণীয় মুহূর্তেই কাঁকনের জন্ম হয়েছিল।
চা এর কাপ ও সাথে বিস্কুট এগিয়ে দিতে দিতে কাঁকন বলল – সমুদ্র ভীষণ উত্তাল হয়েছে
ঠিকই, কিন্তু তুমি একই আছো। একটুও বদলাওনি। আজও তোমার হাতে চায়ের কাপই ওঠে। কফি
কোনদিনই তোমায় আকৃষ্ট করল না। তোমার মনে পড়ে ২০১৮ তে এই এপি ট্যুরিজমের বাসে করে
আরাকু যাওয়ার কথা? সেই কফি বাগান, কয়েকজন আদিবাসী মহিলা রাস্তার ঠিক পাশেই ছোট ছোট
দোকান খুলে বসেছিল এবং কফি বিক্রি করছিল?
-
হ্যাঁ মনে পড়ে। তবে সেটা কফি বাগান মোটেও ছিল না। ছিল একটা
পাহাড়ি জঙ্গল। পাহাড়ি ঢালু জমিতে পর পর সাজান কফি গাছ। সেখানে উঠে আমরা বেশ কয়েকটা
ছবিও তুলেছিলাম আমাদের মোবাইলে। তোমার একটা নাম দিয়েছিলাম। জংলী সুন্দরী। কি এবারে
মনে পড়ছে তোমার?
-
হ্যাঁ পড়ছে। ফেসবুকে আমি ছবিটা আপলোড করবার পর তুমি বোধহয়
কমেন্ট করেছিলে। আর তারপর তো কি কাণ্ড। বন্ধুবান্ধব সবাই বলে উঠল ‘কি রে কঙ্কণা,
তোর বর যে তোকে জংলী বানিয়ে দিল।
সে সব ছিল আজকের
সমুদ্রের মতই উত্তাল এক সময়। সেই জীবনে ছিল হৈ হৈ, আনন্দ। জীবন ছিল অনেকটাই চাপমুক্ত।
কিন্তু বিগত এই ২২ বছরে সময় অনেক বদলেছে, তাই জীবনও অনেক বদলেছে। জীবনে কিছু যোগ
বিয়োগের খেলা প্রতিনিয়ত চলতেই থাকে। সময় কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। দুজনের জীবনেই
এসেছে ঝড়। কখনও শারীরিক সঙ্কট তো কখনও মানসিক। আর্থিক সঙ্কট সেরকমভাবে না হলেও খুব
বিত্তবানদের মত করে ওদের জীবন কাটেনি কখনও। সেই দিক দিয়ে বলতে গেলে অংশুমান ও
কঙ্কণা দুজনেই খুব ভাল পরিবার নিয়ন্ত্রক। একে অপরের কষ্টকে ওরা চিরকালই বুঝে এসেছে
এবং পরস্পরকে সাহায্যও করে এসেছে সেইমতো। সংসারের বাহ্যিক দিকগুলো অংশুমান যেমন
দেখে এসেছে, ঠিক সেইরকম অভ্যন্তরীণ দিকগুলো কঙ্কণা দেখে এসেছে।
গতবার ওরা প্রথম
যখন ভাইজ্যাগে এসেছিল তখন হঠাৎ করেই ওরা চলে এসেছিল। রামকৃষ্ণ বিচ বলে যেটা
পরিচিত, সেখানকার সামনে একটা বাঙালি হোটেল নাম ‘নিরালা সৈকতে’ সেখানে ওরা উঠেছিল।
এই আর কে বিচ বরাবরই কেমন যেন অশান্ত। একটু অপরিষ্কারও থাকে সবসময়। সমুদ্রতলটা
একটু রাফ। সামুদ্রিক স্রোতের মধ্যে দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ অদৃশ্য পাথুরে ভুমিরুপ দৃশ্যমান
হয়ে ওঠে। এই বিচের সৌন্দর্যও খানিক কম। স্নান করবার অনুমতি নেই এই বিচে। তুলনায়
রুশিকোনডা বিচ অনেক বেশি মনোরম। শান্ত, ভুমিরুপ খুবই মসৃণ। তাই আজ দুই বুড়োবুড়ি
জীবনের সায়াহ্নে এসে এই রুশিকোনডা বিচের সামনে এপি ট্যুরিজমের রিসর্টেই উঠল।
কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছে অংশুমান। এই বিচের সামনে যে অজস্র গাছপালা গতবার
ও দেখেছিল আজ তার অনেকাংশেই নেই। সেই গাছপালা সাফ করে হয়ত কোন টুরিস্ট লজ, হোটেল
বা ওইজাতীয় কিছু গড়ে উঠেছে সেখানে। কে বলতে পারে!
আসলে মানুষ তো
চিরকালই প্রকৃতির ধ্বংসলীলায় মেতে উঠেছে। প্রকৃতির যে নৈসর্গিক শোভা তা ধীরে ধীরে
হারিয়ে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য অনুকরণ তা এই ভারতবর্ষে আগেও ছিল, কিন্তু এখন এই ২০৪০ এ
তা যেন চরমসীমায় এসে পৌঁছেছে। প্রৌঢ় অংশুমান লক্ষ্য করল বাইরে থেকে আসা নতুন নতুন
ছেলেমেয়েদের। ওর মনে হতে লাগল ও যেন ভারতবর্ষের বাইরে বিদেশের কোনও এক বিচের সামনে
এসে পড়েছে। অনেক অষ্টাদশী মহিলা, প্রায় সবাই সল্পবসনা। শরীরে অন্তর্বাস ছাড়া আর
যেন কিছুই নেই। সবাই প্রায় উন্মুক্ত। কচি কচি ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে প্রেমহীন কাম
যেন চেপে বসেছে। সমুদ্রের ঢেউ এর সাথে সাথে তাদের উদ্দামতাও বেড়ে চলেছে ক্রমাগত।
এখানে এখন পরিবার বলে কিছু নেই। সিংগল ফাদার, সিংগল মাদারে ছেয়ে যাচ্ছে আজকের
সমাজ। এক সিংগল মাদার তার প্রেমিকের সাথে যখন খুনসুটিতে ব্যস্ত, তখন তার বাচ্চাটি
সুপার স্মার্টফোনে আরও তীব্রভাবে আসক্ত। হ্যাঁ সুপার স্মার্টফোন। মানে আরও উন্নত
প্রযুক্তির স্মার্টফোন। এখন এই দুনিয়ায় না আছে প্রেম, না আছে ভালবাসা। যা আছে তা
হল তীব্র আসক্তি। সেই আসক্তির সময়কালও ভীষণই অল্প। খিদে মিটে গেলেই আবার নতুন কোন
প্রলোভনে প্রলোভিত আজকের যুবসম্প্রদায়। পাশ থেকে কঙ্কণা দেখতে থাকে ওর স্বামীকে।
বুঝতে পারে স্বামীর মনের এই দোলাচল অবস্থা। পাশ থেকে বলে – শুধু মানুষ নয় অংশু,
মানুষের সাথে প্রকৃতিও অনেক পরিবর্তিত হয়েছে আজ। এই পরিবর্তনের মূলেই আছে
প্রযুক্তি।
কিন্তু এই
প্রযুক্তিকে উন্নত বলবে নাকি অতি উন্নত না অনুন্নত তাই বুঝে উঠতে পারে না অংশুমান।
এই প্রযুক্তির ফলেই আজ ওরা যে বিলাসবহুল হোটেলের কামরায় রয়েছে তাতে শুধুমাত্র ওআই
ফাই এবং ব্লু টুথের মাধ্যমেই প্রায় সবধরনের কাজ করা যায়। ওরা যখন এপি ট্যুরিজমের
এই রিসর্টে এসে উঠল তখন চেক-ইন করবার সময় রিসর্ট ম্যানেজার ওদের সঙ্গে সর্বক্ষণের
এক রোবট ফিট করে দিল। রিসর্ট বা হোটেলে উঠলে হোটেল বয় এতদিনে যে যে কাজ করে থাকত
ঠিক সেই সেই কাজ বা বলা যেতে পারে তার থেকে আরও অনেক বেশি কাজ আজ এই যান্ত্রিক
রোবট করে থাকে। অংশুমান ও কঙ্কণা যেন অনেকটা ভেল্কি দেখবার মত করে সেই রোবটের সাথে
ওদের রুমে এসে ঢুকেছিল। এই রোবটটির নির্দিষ্ট কোনও রুপ বা আকার নেই। কখনও সেটা
মানুষের রুপ নেয় তো কখনও সেটা ছোট বা বড় টেবিলের আকার নেয়। মানুষরূপী রোবট যখন
টেবিলরুপী হয় তখন সেটা অটোমেটিক একটি চাকা লাগানো টেবিলে পরিণত হয়। না এই রোবটটি
এখনও কথা বলতে শেখেনি তবে যেকোনো কম্যান্ড বা ইনপুট প্রদান করলে তা অক্ষরে অক্ষরে
পালন করে। হোটেল রুমের লকিং সিস্টেমও অত্যাধুনিক। মোবাইলের ওয়াই ফাই অন করে রুম
নম্বরটিকে এই এপি ট্যুরিজমের একটি নির্দিষ্ট অ্যাপে লগইন করলেই অংশুমানের সুপার
স্মার্টফোনে একটি চার অক্ষরের ওটিপি আসে। সেটিকে প্রদান করবার সাথে সাথেই রুমের লক
খুলে যায়। লক খুলে গেলে রোবটটি সাথে সাথে রুমের ভেতর প্রথমে ঢুকে লাগেজ গুলো জায়গা
মতো রাখে। তারপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে চুপটি করে দাড়িয়ে পড়ে। রুমের মধ্যে একটি
অত্যাধুনিক রিমোট কন্ট্রোল রয়েছে। যা দিয়ে রুম লক অন, অফ, এসি, টিভি, লাইট, পাখা
অন অফ সব করা যায়। এছাড়াও কলের জল যখন খুশি গরম বা ঠাণ্ডা, দরজা ও জানালা খোলা,
বন্ধ সবকিছুই সেই রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে করা যায়। বাইরে থেকে কোনও কিছু আনবার
হলে রোবট সর্বদা প্রস্তুত। ইনপুট প্রদান করলেই হোটেলের ভেতরের যাবতীয় জিনিস সে
নিয়ে চলে আসে তার ক্লায়েন্টের সামনে। সর্বত্রই টপক্লাস সার্ভিস। যদিও এরকম উন্নত
মানের পরিষেবা যে কারোর পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়, যদি না তার গ্যাঁটে সেরকম জোর থাকে।
অংশুমান নেহাতই একটা অফার পেয়ে গেছে। গেলবার বঙ্গীয় লেখক সম্মেলন থেকে বেশ একটা
মোটা টাকা পুরস্কার মুল্য হিসাবে পেয়ে যাওয়াতে এবারের ভাইজ্যাগ ট্যুর টা সম্ভব হল।
হ্যাঁ অংশুমান রায় একজন লেখক। অনলাইন মিডিয়াতে, ব্লগে ও আরও বিভিন্ন চ্যানেলে ওর কর্মকাণ্ডগুলো
ইদানীং আলোচ্য বিষয়। জীবন সম্পর্কিত ও ভ্রমণকাহিনীকার হিসাবে উনি এখন বেশ জনপ্রিয়।
মাঝে মধ্যে কল্পবিজ্ঞান ও ফিকশন জাতীয় লেখাও লিখে থাকেন। প্রযুক্তি, হ্যাঁ
প্রযুক্তিই লেখক অংশুমানের জীবনটা একেবারে বদলে দিল। প্রায় ২৫ বছরের উপর হয়ে গেল ও
লেখালেখি করছে। পূর্ব জীবনে একটা মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে খুব সাধারণ একটা চাকরি
করতেন। অফিস ক্লার্ক হিসাবে। কিন্তু প্রযুক্তির নিত্য নতুন পরিবর্তনের সাথে সাথে
সেই কোম্পানি পাল্লা দিতে পারল না। মুখ থুবড়ে পড়ল সেই কোম্পানির construction & IT ব্যবসা। ফলস্বরুপ কোম্পানিতে লক আউট ও কর্মী
ছাঁটাই। অন্যান্য কর্মীদের সাথে সাথে চাকরি গেল অংশুমানেরও। তবে খুব বেশি দিন বাড়ি
বসে থাকতে হয়নি ওনাকে। লেখালেখির জগতে থাকায় একটা ছোট খাটো পত্রিকা অফিসে কাজ জুটে
যায়। সেখান থেকে ধীরে ধীরে আবারও উন্নতি করতে থাকেন উনি।
(২)
‘২০১৮ সালের সেই
অনলাইন সাইকেল বুকিংএর কথা মনে আছে তোমার? সেই আর কে বিচের সামনে ফুটপাথে
সাইকেলগুলো সারিবদ্ধ ভাবে রাখা ছিল? ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো সেই সাইকেলগুলোর মধ্যে
থাকা বারকোডগুলো স্ক্যান করে কিভাবে যেন লক অন করে সেগুলো নিয়ে বিচ রাস্তায় চালাতে
শুরু করেছিল’? – কঙ্কণার কথায় সম্বিত ফিরে পায় অংশুমান। হ্যাঁ মনে পড়েছে ওর সেই
অনলাইন বুকিং এর মাধ্যমে সাইকেল চালানোর কথা। সেই ওয়েবসাইটের নাম যতদূর মনে পড়ছে www.hexi.com ঠিক একইরকম আরও
একটি ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছিল অংশুমান। www.chartardbike.com মধ্যপ্রদেশের এই
ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও ওই একই ধরণের অনলাইন বুকিং এর মাধ্যমে সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত।
সাইকেলগুলো রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে রাখা। দেখভাল করার কোনও লোক নেই,
কিন্তু সেই সাইকেলের লক খুলতে গেলে ওইসব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই লগ ইন করে তবে সে
গুলো পাওয়া যেত। তখনকার সময়েই সেগুলো ছিল অত্যাধুনিক সিস্টেম। আর এখন তো ২০১৮ সাল
নয়, এখন ২০৪০ সাল। আরও আরও উন্নত প্রযুক্তি। এখন শুধু সাইকেল নয়, এখন পেট্রোল ও
ডিজেলবিহীন গাড়ি আবিষ্কৃত হয়েছে কিছু মোটরনির্মাতার কল্যাণে। যা কিনা ভাইজ্যাগের
এই আর কে বিচের রাস্তায় প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। না শুধু পেট্রোলবিহীন নয়,
চালকবিহীনও বটে। উন্নত মানের জিপিএস ও ম্যাগনেট পদ্ধতিকে অবলম্বন করে এ গাড়ি ঘুরে
বেড়াচ্ছে এখন ভাইজ্যাগের আনাচে কানাচে। অনলাইন বুকিং করবার পর জিপিএস পরিষেবার
মাধ্যমে এ গাড়ি গ্রাহকের দোরগোড়ায় আসে প্রথমে। তারপর মোবাইলের ওটিপি’র মাধ্যমে
গাড়ির দরজা খোলা হলে গাড়ির মধ্যে প্রবেশ ও যাত্রা শুরু। আগে থেকে গন্তব্য স্থির
করা হলে গাড়ি ঠিক সময়মতো সেই জায়গায় নিয়ে গ্রাহককে পৌঁছে দেয়। গাড়ি চালকবিহীন হলেও
ইচ্ছে করলে যে কেউ সেই চালকের আসনে বসে স্টিয়ারিংটাকে ডানদিক বাঁদিক করতেই পারে।
কিন্তু সেটা কোন কাজ করে না। অনেকটা খেলনা গাড়ির মতো। যদিও খুব সম্প্রতি এ গাড়ি
চালু হয়েছে। তাই গাড়ির গতিবেগ খুবই কম। গাড়ির মধ্যে এক অত্যাধুনিক সেন্সর সিস্টেম
থাকার জন্য এ গাড়ির সামনে কেউ এসে পড়লে সেটি অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায় ও দাড়িয়ে পড়ে। গাড়ির
হর্ন, ইনডিকেটর সিস্টেম সবই অত্যাধুনিক। সেন্সর সিস্টেমই ওটাকে কন্ট্রোল করে।
কিন্তু এহেন অত্যাধুনিক গাড়ি বাজারে আসতে শুরু করলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হবে
তা নিয়েই উদ্বেগ ও চাপানউতোর চালু হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। অংশু ও কাঁকন দেখছে যে
ভাইজ্যাগের রাস্তায় আজ এই ২০৪০ সালে অটোর সংখ্যা কত কম। অটোচালকেরা মাত্র ৪০/৫০
টাকাতেই ভাইজ্যাগের সিটি ট্যুর করাবে বলে আশ্বাস দিচ্ছে। যেখানে ২০১৮ সালে মাত্র
২/৩ কিমি রাস্তা যাওয়ার জন্য ৬০/৭০ টাকা চেয়ে বসত। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম তো এক ধাক্কায় অনেকটাই কমতে বসেছে এখন। গাড়ি
ড্রাইভারদের ভ্যালু এখন আর থাকছে না সেরকমভাবে। তাই প্রযুক্তির এইসব আমূল
পরিবর্তনের ফলে ভারতবর্ষের মধ্যে চালু হতে চলেছে দুটো শ্রেণী। ধনী ও গরীব। না
মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলে বোধহয় আর কিছু থাকবে না। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজেকে কেমন
যেন অসহায় লাগে অংশুমানের। আজ যখন এপি ট্যুরিজমের বাসে
চড়ে সিটি ট্যুর করল, তখন ভাল লাগার সাথে সাথে মনের মধ্যে এক ধরণের বিষাদও তৈরি হল।
প্রযুক্তি মানুষকে দিয়েছে অনেক, কিন্তু কেঁড়ে নিয়েছে আরও বেশি। এই বাসটিতে একজন
ড্রাইভার আছে ঠিকই, কিন্তু ট্যুর গাইড হিসাবে কেউ নেই। বাসে প্রবেশ করবার দরজাটায় উন্নত
প্রযুক্তিবিশিষ্ট সেন্সর লাগানো। বাসের সামনে এসে কেউ দাঁড়ালে অটোমেটিক লক অন হয়ে
গিয়ে দরজাটি খুলে যায় ও মানুষ প্রবেশ করতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরে একটি করে
ছোট ডিভাইস লাগানো থাকে যার ফলে বাসে চেক ইন ও চেক আউট পদ্ধতিটা সেই ডিভাইসের
মাধ্যমেই হয়ে যায়। এছাড়া ডিভাইস সমেত বাসে ঢোকা মাত্রই বসবার সিটের মধ্যে একটি করে
লাইট লাগানো রয়েছে যা জ্বলে উঠে মানুষজনকে সেই সিটে বসবার অনুমতি দেয়। অর্থাৎ
একবার কোন সিট নম্বর ফিক্সড হয়ে গেলে সেটিকে চেঞ্জ করবার অনুমতি সেই ডিভাইস আর
দেবে না। বাসের মধ্যে একটি তিরিশ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যর ডিসপ্লে বসানো আছে। যা কিনা
অনেকটা টিভির মতো দেখতে। যন্ত্রটি
অডিও ভিসুয়াল। এই যন্ত্রটি ট্যুর গাইডের কাজ করে। হয়তো বাস কৈলাসগিরি মন্দিরের
উদ্দ্যেশে রওনা দিয়েছে। তখন সেই ডিসপ্লেতে কৈলাসগিরি সম্পর্কে যাবতীয় বর্ণনা চলতে
থাকে যা কিনা মানুষ শুনতে, দেখতে ও বুঝতে পারবে। কারোর মনে কোন প্রশ্ন উদয় হলে সেই
ব্যক্তি তার নিজস্ব সুপার স্মার্টফোনের ব্লু টুথ বা ওয়াই ফাই অন করে সেই প্রশ্নটি
মোবাইলে টাইপ করলে সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর ডিসপ্লেতে ভেসে উঠবে। উত্তরটি হবে অডিও
ভিসুয়াল। টুরিস্ট স্পটে গিয়ে জায়গা হারিয়ে ফেললেও সুপার স্মার্টফোন তার উন্নত পরিষেবার
মাধ্যমে টুরিস্টদের পথ চেনাবে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে। এই উন্নত পরিষেবার মাধ্যমে
অংশুমান ও কঙ্কণা ঘুরেই এল ভাইজ্যাগ সিটিতে। ওরা গেল সিমাচলম, কৈলাসগিরি মন্দির।
দেখল ২২০০ বছরের পুরনো বৌদ্ধ মন্দির থোকলাকোনডা। সাবমেরিন মিউজিয়াম, বিশাখা
মিউজিয়াম, লাইট হাউস, ডলফিন নোজ, এয়ারক্রাফট মিউজিয়াম সবই আছে কিন্তু সর্বত্রই
পরিবর্তনের হাওয়া। অংশু ও কাঁকনের সবসময় একটা কথা মনে হচ্ছে। সেটা হল উন্নত
প্রযুক্তি আসার ফলে মানুষের অভন্ত্যরীণ আবেগ কমেছে। শুধুমাত্র গতিবেগ বেড়েছে।
মানুষ যেন প্রযুক্তির আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন
করে চলেছে। সেখানে ভাবনার কোন স্থান নেই। আজ এই ২০৪০ সালে ইন্টারনেট 12G থেকে 15G গতিতে চলছে।
অন্তরজালের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষও যেন ধীরে ধীরে একটা জালের মধ্যে আটকে যাচ্ছে।
ভাবনা, আবেগের স্থান আর নেই কোথাও। সমস্তটাই হয়ে গেছে কম্যান্ড আর ইনপুট প্রদানের
সিস্টেম। সবকিছুই তথ্যনির্ভর।
চা খেতে খেতে
এসবই ভাবতে থাকে অংশুমান। পাশে বসা কঙ্কণা রিমোটে কি একটা কম্যান্ড দেওয়াতে
টেবিলরুপী রোবট সামনে এসে হাজির। ও চায়ের কাপ, প্লেট, কেটলি, টিপয় সব কিছু সেই
রোবটের উপর রেখে দিলে টেবিলরুপী রোবট সেগুলো নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গতবারের
আরাকু যাওয়ার ঘটনা মনে পড়ল কঙ্কণার। আরাকু ভ্যালীতে ওরা সেইবছর বাসে করে যাওয়াতে
পাহাড়ি টানেলগুলো সব মিস করেছিল। শোনা যায় মোট ৫৮ টা টানেল আছে ভাইজ্যাগ থেকে
আরাকু রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত। আরাকু এমনই এক হিল স্টেশন যা কিনা ঘন জঙ্গল ও কফি
ফার্মের দ্বারা পরিবেষ্টিত। এখানে একপ্রকার উপজাতির বাস যারা ধিমসা নাচ পরিবেশন
করে থাকে পর্যটকদের উদ্দ্যেশে। কিন্তু অংশু ও কাঁকন জানে না এবারে ওরা সেই নাচ
দেখতে পাবে কিনা। গতবারে কাঁকন সেই আদিবাসী মেয়েগুলোর সাথে দু এক স্টেপ কোমর
দুলিয়ে নেচেও ছিল, কিন্তু এবার! শোনা যায় এই আদিবাসী সম্প্রদায় এখন আর সেই নাচ
পরিবেশন করতে চায় না সবসময়। অন্ধ্র সরকারের কাছে এখন ওদের অনেকরকমের দাবি দাওয়া।
সেগুলোর জন্য ওরা একজোট হয়ে বেশ কিছু আন্দোলন করেছে। বেশ কিছু রাজনৈতিক দলেরও তাতে
মদত রয়েছে বলে মনে হয়। কাঁকনের সেই নাচের কথা ভেবে অংশুমানের তিতলির কথা মনে পড়ে
গেল। অংশুমান ও কাঁকনের মেয়ে তিতলি। মায়ের মতই হয়েছে মেয়ে। তবে চিন্তাভাবনাতে
বাবার ছাপ রয়েছে। এ যুগের হয়েও চিন্তাভাবনাতে উদারতা ও একটু ভাবুক প্রকৃতি লক্ষ্য
করেছে অংশুমান তিতলির মধ্যে। সামনে কলেজের পরীক্ষা। বি এ ফার্স্ট ইয়ার। তাই ওদের
সঙ্গী হতে পারেনি ও। মনে পড়ে গেল বাম্বু চিকেনের কথা। গতবার ওরা বেশ আয়েশ করে
খেয়েছিল। একফুট বা দেড়ফুট মাপের একটি বাঁশের টুকরোকে লম্বভাবে মাঝ বরাবর চিরে তার
মধ্যে চিকেনের পুর ঢুকিয়ে সেটাকে আগুনের আঁচে সেঁক করে প্রস্তুত করা হয় এই
বাম্বুচিকেন। এটি বিনা তেল ও নুনে প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু এক অসাধারণ স্বাদ
কিভাবে যে তৈরি হত, সেটা যে বা যারা সেই স্বাদ না গ্রহণ করেছে তারা বুঝবে না।
কিন্তু এখন কি বাম্বুচিকেন পাওয়া যাবে আরাকুতে? কে জানে? অথবা বাম্বু বিরিয়ানি।
পেলে তিতলিকে নিয়ে গিয়ে যে খাওয়াবে সেও সম্ভব নয়। মনে পড়ছে সেই বোরা কেভসের কথা।
ভারতবর্ষের অনেকগুলো গভীরতম গুহার মধ্যে একটা এই বোরা কেভস। কয়েক হাজার বছরের
প্রাচীন। এই বোরা গুহালু স্টেশনটি আরাকু স্টেশন থেকে ৪০ কিমি দূরে। অনেক কিছুই মনে
পড়ছে আজ ওদের দুজনের। আরাকু ভ্যালি, হরিথা হিল রিসর্ট, অনন্তগিরি, হোটেল ময়ূরী,
ধিমসা নাচ ইত্যাদি। আগামীকাল যাবেও ওরা উন্নত প্রযুক্তির কোন ট্রেনে করে আরাকু হিল
স্টেশন যা কিনা ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে পৌঁছবে সেখানে। বিশাখাপত্তনম স্টেশন থেকে আরাকু
হিল স্টেশন ১০০ কিমি যা কিনা আগে ৩ থেকে ৩.৫ ঘণ্টা লাগত এখন এই বুলেট ট্রেনের জমানায়
তা হয়ত দেড় ঘণ্টাতেই পৌঁছে দেবে। কিন্তু সেই আবেগ, সেই প্রকৃতির প্রতি ভালোলাগা,
ভালোবাসা কি পাবে ওরা শেষ পর্যন্ত। এই প্রশ্নই এখন অংশুমান ও কঙ্কণার মনে। কারণ
এটা যে ২০৪০ সাল। ভাইজ্যাগ ২০৪০।
সমাপ্ত..................

পড়তে পড়তে মনে হলো শুভেচ্ছার ডাকনাম টা তিতলি রাখতে পারো।
ReplyDeleteকাল্পনিক চরিত্র তো সেটাই ইঙ্গিত করলো। কি তাই কিনা!?
তুমি "তিতলি"ই চেয়েছিলে।