সম্বন্ধ
আজ মেয়ের বাড়ির থেকে আসার
কথা। রমিতের বিয়ের সমন্ধ চলছে অনেকদিন ধরেই। কোনওটাই ঠিক কার্যকরী হচ্ছে না। দেখা
যাক আজ কি হয়। মেয়ের বাড়ি চুঁচুড়ায়। কোলকাতার কাছাকাছি এক মফঃস্বল শহরে। মেয়ের
বাবা একবার এসে দেখে গিয়েছেন রমিতকে। পাত্র পছন্দ হয়েছে তার। তাই কাল ফোন করে
জানালেন আবার সপরিবারে আসবেন আজ। সঙ্গে পাত্রীও আসতে চায়। বর্তমান সময়ের কথা ভেবে
রমিত ও তার পরিবার পাত্রীকে আসার জন্য বরং স্বাগতমই জানায়। রমিতের বয়স বত্রিশ।
হাইট পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বিগত ছয় বছর ধরে। নয়
নয় করে প্রায় ন’বার পাত্রীপক্ষের সামনে বসেছে রমিত, কিন্তু কোনও সম্বন্ধই টেকে নি।
না এতে রমিতের বা তার পরিবারের কোনও হাত নেই। একমাত্র দুটি পাত্রী ছাড়া বাকি সবকটি
সম্বন্ধেই রমিতের মত ছিল। কিন্তু পাত্রীপক্ষই বরং রমিত ও তার পরিবারকে নাকচ করে
দেয় প্রতিবার। রমিত কিন্তু দেখতে খারাপ নয়। বরং হ্যান্ডসামই বলা চলে। অন্তত ওর
বন্ধুবান্ধবেরা সেরকমই বলে থাকে ওর সম্পর্কে। রমিত ফর্সা, চেহারা স্লিম না হলেও
একটা না রোগা না মোটা ভাব আছে। অত্যধিক পুরুষালী বা পেটাই চেহারা বলতে যা বোঝায়
রমিতের চেহারা সেরকম নয়, বরং শরীরে একটা লালিত্য এবং গোলগাল ভাব আছে। যা তথাকথিত
ভাবে রমিতকে একটা ‘ভালো ছেলে’র তকমা দেয়। জিন্স, টিশার্ট, ফর্মাল বা পাঞ্জাবী
কোনটাতেই কিন্তু রমিত বেমানান নয় বরং আর পাঁচটা ছেলের তুলনায় একটু বেশিই ভাল দেখায়
ওকে। চোখে একটা সরু কালো ফ্রেমের চশমায় বেশ ইন্টেলেকচুয়াল ভাবটাও লক্ষ্য করা যায়
ওর মধ্যে। এমনিতে রমিত বুদ্ধিদীপ্ত, হাসিখুশি, তবে একটু চাঁপা স্বভাবের। মনের কথা
মুখে আনতে সময়টা যেন একটু বেশিই লাগে। তথাকথিত ভাবে স্মার্ট বলতে যা বোঝায় রমিত
বোধহয় তা নয়। আসলে একটু চুপচাপ ছেলেদের তুলনায় টকিটিভ ছেলেদের প্রাধান্য বোধহয়
মানুষ বেশি দেয় আজকাল। রমিত হলো গিয়ে আজকের যুগের গুডি গুডি বয়, অথবা বলা ভাল বাবা
মায়ের ভালো ছেলে। ও যে চাকরিটা করে সেটাও খুব আহামরি কিছু নয়। সল্টলেকের সেক্টর
ফাইভ এলাকায় একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির জুনিয়র ক্লার্ক হিসাবে পোস্টেড আছে
রমিত। মাসিক মাইনে পনের হাজার টাকা পি এফ, ই এস আই সব মিলিয়ে। কোলকাতার বুকে
নিজস্ব বাড়ি ওদের। ছোট্ট তিনকামরার টালির বাড়ি। একটি সরু ঘিঞ্জি গলির ভিতর। রমিতের
বাবার একটা ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। অর্ডার সাপ্লাইয়ের। ভদ্রলোক শারীরিকভাবে বেশ
খানিকটা উইক হয়ে পড়ায় আপাতত ব্যবসার কাজ স্থগিত আছে। রমিতের মা বেশ কিছু ছোট ছোট
ছেলেমেয়েদের টিউশানি করেন বাড়িতেই একসঙ্গে বসিয়ে। সংসারে লোক বলতে এই তিনজন এবং ওর
ঠাকুমা যিনি বিগত তিন বছর ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী। ছোট্ট সংসার, ছিমছাম ও পরিপাটি
করে সাজানো ওদের ঘরগুলো। সংসারে সবাই যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নিজেদের মধ্যে
কথাবার্তাও ওদের কম হয়। ছোটবেলা থেকেই এইভাবে মানুষ হওয়ার জন্য রমিতের মধ্যে একটা
একাকিত্ব কাজ করে, একজন ভাবুক মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ওর মধ্যে লক্ষ্য করা
যায়। পাড়াতেও ও খুব একটা পপুলার নয়। জাস্ট অমুক বাড়ির ছেলে।
তা এহেন ছেলের কি পাত্রীর
অভাব হওয়া উচিত? আসুন একটু দেখে নি।
ওদের বাড়ি থেকে কোনও
দাবিদাওয়া নেই। মেয়ে শুধুমাত্র ঘরোয়া ও সুশ্রী হলেই হবে। বয়স ২৬-২৭ এর মধ্যে হলেই
ভাল এরকম লিখে বর্তমান কাগজে ছেলের জন্য একটি বিজ্ঞাপন দেন রমিতের বাবা। সেই
বিজ্ঞাপনের দৌলতে ও জানাশোনা কিছু লোকের মাধ্যমে সম্বন্ধগুলো আসতে থাকে। সম্প্রতি
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে রমিত। পাত্রীর বাড়ির লোক আজকাল প্রথমেই পাত্রপক্ষকে নিমন্ত্রণ করে
না মেয়ে দেখে যাওয়ার জন্য। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটে। পাত্রীপক্ষই আগে
এসে সবকিছু দেখে, বুঝে ও জেনে যেতে চায়। এভাবেই দেখা সাক্ষাৎ চলতেই থাকছিল নতুন
নতুন পাত্রীর সন্ধানে। কিন্তু বিয়ের জন্য পাকা কথা পর্যন্ত এগোল না কিছুতেই। চুঁচুড়া
থেকে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করেছিলেন মেয়ের বাবা। প্রথমেই ছেলেকে এসে দেখতে
চেয়েছিলেন। দেখলেন, কথা বললেন এবং পছন্দ করলেন। বলে গেলেন যে বাড়ির লোকজনকে নিয়ে আরও
একবার আসবেন। পাত্রী স্নাতক, বাংলায় অনার্স, ফর্সা, সুশ্রী। আপাতত বছর দুই হল
স্নাতক হয়েছেন ও বর্তমানে একটি নাচের স্কুলে জয়েন করেছেন। পাত্রী ভাল নাচিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই নাচের খুব শখ। এই কথা জেনে রমিতের একটা কথা মনে পড়ে যায়। ওর অফিসের
রায়বাবু একবার মজার ছলে বলেছিলেন যে, ‘পাত্রী যদি ভাল নাচিয়ে হয় তবে অবশ্যই
জিজ্ঞাসা করে নেবে যে মেয়ে কি শুধু নাচতেই জানে, নাকি ভাল নাচাতেও জানে?’ – কথাটা
মনে পড়ায় একটু হাসি আসল রমিতের মুখে। কিন্তু এ হাসি যে কখনোই একটি দীর্ঘস্থায়ী
হাসিতে পরিণত হতে পারে না রমিত ও তার পরিবারের কাছে। মাঝে মাঝে রমিতের মনে হতে
থাকে এ যেন এক সামাজিক সমস্যা বা অবক্ষয়। আসলে দাবার গুটিগুলোই বোধহয় পারস্পরিক
পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু সমস্যাটা বোধহয় থেকেই গেছে। কিছু বছর আগেও ছেলের বাড়ি বা
পাত্রপক্ষ নানারকম দাবীদাওয়া ও ধানাইপানাই করত একটি বিয়ের সম্বন্ধ হলে। এখন সেটা
পাত্রীপক্ষের বাড়ি থেকেই প্রথমে শুরু হচ্ছে। মেয়েপক্ষই যেন আগেভাগে সব কিছু চেয়ে
বসছে পাত্রপক্ষের কাছে। আগে যেমন পাত্রপক্ষ দেনাপাওনার ব্যাপারে সব কিছু
কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিত, এখন ঠিক সেইরকমভাবেই পাত্রীপক্ষ ছেলের বাড়ির ও চাকরির
ব্যাপারে খুব ভালো করে আগেভাগেই বুঝে নেয়। ব্যাংক ব্যালান্স, ফিক্সড ডিপোজিট,
শেয়ার মার্কেট ও এস আই পির ব্যাপারেও পাত্রী সরাসরি পাত্রের কাছে খোলাখুলি জানতে
চায়। জেনে বুঝে নিতে চায় টাকাপয়সার পাই টু পাই হিসেবনিকেশ। রমিত একজন কমার্স
গ্র্যাজুয়েট হয়েও এইসব হিসেবনিকেশে খুব কাঁচা থেকে গিয়েছে। ভালোবাসা শব্দটার সঙ্গে
দেনাপাওনা ও ব্যাংক ব্যালান্স যে একপ্রকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা ও আজ বেশ হাড়ে হাড়ে
টের পাচ্ছে। নারী ও পুরুষের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ সম্পর্ক যা কিনা বিবাহের মাধ্যমে শুরু হয়। কিন্তু সেই সম্পর্কের শুরুতেই
চলে আসে দেনাপাওনা, মিথ্যাচার, কড়ায়গণ্ডায় হিসাব বুঝে নেওয়ার লড়াই। যা হয়ত
কোনোদিনও বন্ধ হবার নয়। সামাজিক অবক্ষয়টা বোধহয় এখানেই। রমিতের প্রায়শই মনে হতে
থাকে যে সেই রবিঠাকুরের দেনাপাওনার সময় থেকে আজও সমস্যাটা একইরকম বোধহয় থেকেই
গেছে। শুধুমাত্র সময়কাল ও পরিবেশটা হয়ত বদলেছে। পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ সম্পর্ক যা
কিনা প্রথমেই শুরু হয় দেনাপাওনার হিসাব দিয়ে। এই চিন্তাই মাঝে মাঝে রমিতকে কুঁড়ে
কুঁড়ে খায়। মনে পড়ে যায় ওর সেই বয়সন্ধিকালের গোপন প্রেমের কথা। যা কিনা কেউ বুঝবে
না, জানবে না। যা একেবারেই একান্ত ব্যক্তিগত, নিষ্পাপ একটি ফুলের কুঁড়ির মতো। ওদের
পাশের বাড়ির মনীষাদি। যে কিনা রমিতেরই কিরকম দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় হয়। মনীষাদির
বাড়িতে ও একসময় রোজ সকালবেলা শিউলি ফুল কুঁড়াতে যেত। রমিত মনীষার বাবা ও মাকে জেঠু
ও জেঠিমা বলে সম্বোধন করত। রমিতের বাবার পিসির দেওরের ছেলে এই মনীষার বাবা।
ঘটনাচক্রে একই পাড়ায় বসবাস ওদের। সেই সুত্রে প্রায় ছোটবেলা থেকেই একইসঙ্গে বেড়ে
ওঠা ওদের। মনীষা রমিতের থেকে দুবছরের বড়। তাই ছোটবেলা থেকে রমিত মনীষাকে ‘মনীষাদি’
বলেই ডাকত। একদিন ভোরবেলায় রমিত গেছে ওদের বাড়িতে শিউলি ফুল আনতে। তখন রমিত
ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। এক আষাঢ় মাসের ভোরবেলা। হঠাৎ করেই কালো করে আসল সারা আকাশ।
ঘন কালো মেঘে পুরো ছেঁয়ে এসেছে। উঠোন থেকে একটা একটা করে ফুল কুঁড়োতে থাকে ও।
মনীষাও কুঁড়োতে থাকে। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল সেইসময়। মেঘ কালো করে এসে সব
অন্ধকার করে দিল। বর্শার ফলার মতো করে এসে গাঁয়ে বিঁধতে লাগল বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা।
মনীষা খপ করে রমিতের ডান হাতটা ধরে টানতে টানতে উঠোনের পাশের পরিত্যক্ত ভাঙ্গা
ঘরটায় উঠে এল। হঠাৎ করে তীব্র ভাবে বৃষ্টি আসার কারণে ওরা দুজনেই বেশ ভালরকম ভিজে
গেল। মনীষা নিজের বুকের ওড়নাটা সরিয়ে চেপে চেপে বৃষ্টির জল নিংড়োতে থাকে। ঘরটাতে
পুরনো আসবাবপত্র এবং পরিত্যক্ত জিনিস একসঙ্গে মজুত করে রাখার কারণে ওদের দুজনের
সেখানে একসঙ্গে দাড়াতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল। মনীষার শরীরের উষ্ণ স্পর্শ রমিত মাঝে
মধ্যে অনুভব করছিল। যদিও মনীষার সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের ওড়নাটা দিয়ে মাথার চুল
মুছতে থাকে ও। রমিত খুব জড়সড় হয়েই চুপটি করে দাড়িয়ে থাকে। বাইরে তখন মুষলধারে
বৃষ্টি অনবরত হয়েই চলেছে। সঙ্গে বজ্রপাতের আওয়াজ। জোরাল বৃষ্টিপাতের কারণে ঘরটিতে
আলো খুব কম। প্রায় অন্ধকারই বলা চলে। সেসময় এক বিকট আওয়াজে প্রচণ্ড জোরে বজ্রপাত
হওয়ায় মনীষা ভয়ে কেঁপে ওঠে ও রমিতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সেই প্রথম এক সদ্য যৌবনা
মেয়ের শরীরের স্পর্শ রমিত অনুভব করে। দুটো সিক্ত শরীর মুহূর্তের মধ্যে উষ্ণ হয়ে
ওঠে। হঠাৎ করে যেন এক বিদ্যুৎ খেলে যায় রমিতের শরীরে ও মনে। মনীষার ভেজা ঠোঁটের
দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ও। দুজন দুজনের শরীরের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণ অনুভব
করে সেই বিশেষ মুহূর্তে। রমিত আলতো করে কিছুটা ভয়ে নিজের ঠোঁট রাখে মনীষার ঠোঁটের
উপর। এক আবেগঘন মুহূর্তে নিজের ডান হাতটা মনীষার বুকের উপর রাখে রমিত। চমকে ওঠে
মনীষা। ঝটিতি সিদ্ধান্ত নেয় ও হাল্কা করে ধাক্কা মারে রমিতকে। এক লজ্জামিশ্রিত ভয়ে
কুঁকড়ে ওঠে রমিত। বুঝে উঠতে পারে না কি করা উচিত ওর সেই সময়ে। মনীষা রমিতের কানের
কাছে এসে বলে ওঠে ‘কাকিমাকে কিন্তু আমি আজকের ঘটনা নালিশ করব’ – বলেই খিলখিলিয়ে
হেসে ওঠে ও এক ছুঁটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। মনীষার ওড়নাটা তখনও রমিতের হাতের মধ্যে
ধরা।
এই ঘটনার এখানেই
পরিসমাপ্তি ঘটে। রমিতের দুরুদুরু বুক ও চক্ষুলজ্জা আর মনীষার দিকে এগোতে দেয়নি।
মনীষাও সামনাসামনি দেখা হলে ‘কেমন আছিস রমিত’ বলে মাথার চুলের মধ্যে হাল্কা বিলি
কেটে চলে যেত। যেন সেদিনকার ঘটনাটা কিছুই নয়। কেমন এক তীব্র অপমানকর পরিস্থিতির
মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল রমিত সেসময়। এই তীব্র অবহেলা দগ্ধে দগ্ধে যেন শেষ করে দিচ্ছিল
ওকে।
....................................
মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে
পায় রমিত। ওনারা নাকি এসে গিয়েছেন। এবার পাত্রীপক্ষের লোকসংখ্যা গণনা করে সেই মতো
মিষ্টি আনতে হবে ওকে। মেয়ের বাড়ি থেকে মোট সাতজন এসেছেন। সেই মতো মিষ্টি আনতে হবে।
প্রতিবারের মতো এবারেও। রমিত জানে এই সময়টায় বাবা ও মায়ের সাথেই বেশি কথা হবে
পাত্রীর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে। মেয়ের সঙ্গে মামা, মামী, মাসি, মেসো, মেয়ের বাবা এবং
ওনার এক বন্ধু এসেছেন। রমিত তৈরি হয়েই আছে। এবারে যে ইন্টারভিউয়ে বসতে হবে।
তাড়াতাড়ি মিষ্টি কিনতে গেল ও। রাস্তায় যেতে যেতে ভাবতে থাকে ও যে এত লোক যদি ছেলে
ও তার বাড়ির লোককে বিচার করতে আসে তাহলে নানা মুনির নানা মত হবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
সুতরাং এ সম্বন্ধও যে একটা পজিটিভ দিকে এগোচ্ছে এমনটা তো নাও হতে পারে, বরং
উল্টোটাই হওয়ার চান্স বেশি। মিষ্টি কিনে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে রমিত। রান্নাঘরে এসে
মায়ের সাথে কাজে হাত লাগায়। প্লেটে সাজাতে থাকে মিষ্টিগুলো। ওর মা নিচু স্বরে
রমিতকে জানায় যে পাত্রী নাকি আর এক মুহূর্তও বসতে চাইছে না। একটা ফোন এসেছিল বাড়ি
থেকে। নাচের কি একটা প্রোগ্রাম পড়েছে। এখুনি নাকি যেতেই হবে। মিষ্টি নিয়ে ঘরে
ঢোকার পর রমিতের সাথে দু’চার কথার আলাপ হয় পাত্রীপক্ষের সবার সঙ্গেই। রমিত লক্ষ্য
করে পাত্রীর বাবা কেমন যেন একটু মাথা নিচু করে বসে আছেন। বাকি মেম্বাররা
মিষ্টিগুলো গোগ্রাসে গিলেই বাড়ি থেকে বেরোনোর জন্য শশব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাই সেইমতো
তড়িঘড়ি করেই ওনারা বেরোবার জন্য প্রস্তুত হলেন। রমিতের বাবা ও মা বুঝতে পারলেন না
যে হঠাৎ কি হল। এতগুলো লোক এলেন, বসলেন আর চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন! রমিত
কিঞ্চিত সাহস সঞ্চয় করে মেয়েকে একান্তে পেয়ে প্রশ্নটা করেই বসল – ‘সত্যি করে বলুন
তো, আমাদের বাড়ি বা আমাদের মানুষজনকে আপনার বোধহয় ঠিক পছন্দ হয় নি, তাই না?’
‘হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরেছেন।
সরাসরি কথা বলতেই আমি পছন্দ করি। নিজে এরকম পরিবেশে বড় হয়েছি ঠিকই, কিন্তু I need a change. একটা ক্লাস
মেনটেন করতে হবে তো। চিরকাল তো আর এরকম থাকতে পারে না। এরকম সবার সাথে কমন বাথরুম
শেয়ার করা, টালির বাড়িতে একসঙ্গে থাকা এ সব আমার পক্ষে সম্ভব নয়। I need extra space. আর আপনার যা
মাইনে তাতে করে আগামি দিনে কোনও ফ্ল্যাট ট্যাট করা মনে হয় সম্ভব হবে না আপনার
দ্বারা। সো.........’
‘এ সব কথাগুলো এতদূর থেকে
বাড়ি বয়ে এসে না বললেই কি চলছিল না? আশাকরি আপনি সবকিছুই জানতেন। আপনার বাবা
নিশ্চয়ই সবকিছু বলেই আপনাদের নিয়ে এসেছেন। জাস্ট একটা ফোন করে জানিয়ে দিলেই তো
হতো। আর হ্যাঁ আমি মনে করি বৈবাহিক সম্পর্কের জন্য ফ্ল্যাটের থেকে অনেক বেশি জরুরী
দুটো মানুষের মনের মিল, তাদের একে অপরের ভালোলাগা। ভালোই হল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
আমার জীবনে না আসার জন্য। আপনারা আসতে পারেন’।
রমিতের সামনে দিয়ে প্রায়
তিনচার ইঞ্চি হিল জুতো পড়ে গটগট করে হেঁটে চলে গেল মেয়েটি। রাগে, অপমানে জ্বলছিল
রমিত। কিন্তু তবুও আজ কেমন যেন এক অপার ভালোলাগা কাজ করছে রমিতের মধ্যে। মনের
মধ্যে জমে থাকা এই কথাগুলো বলতে পেরে। যা এতদিন ধরে পুষে রেখেছিল। কোনোদিন যে
মুখফুটে কাউকে কিছু বলেনি। আজ যেন নিজের কাছে একটু হলেও জিতে গিয়েছে ও নিজে।

Comments
Post a Comment