আয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে কিছু
কথা
গত ১৮ই অক্টোবর ২০১৮ তে
মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করবার পর আমার এক বন্ধু শুভম আমায় অনুরোধ
করেছিল যাতে আমি ওনাকে মানে আয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে কিছু লিখি। সত্যি কথা বলতে ওনার
সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। আমি একজন অজ্ঞ ভারতীয় বলেই হয়ত বাচ্চুর সম্পর্কে
কিছুই জানতাম না। ওনার নামটাই আমি জানতাম না। বাংলাদেশের জেমস এর গান আমি শুনেছি।
জেমসের ‘মা’ গানটি খুব জনপ্রিয় এবং ব্যক্তিগত ভাবে আমারও খুব পছন্দের। এছাড়া
বলিউডের বেশ কিছু গান জেমস গেয়েও ছিলেন। আসলে আমরা বলিউড টলিউড ছাড়া আর কি বা বুঝি
বলুন! তাই আমাদের জ্ঞ্যানও খুব সীমিত। কিছুদিন আগে জি বাংলা সারেগামাপা অনুষ্ঠানে
নোবেল বলে এক জনপ্রিয় প্রতিযোগী “সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে” নামক একটি গান
পরিবেশন করলেন। গানটা শোনবার পর আমার শিরায় শিরায় যেন এক শিহরণ খেলে গেল। নোবেল
খুব ভাল গায় এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গানের এমন কথা ও সুর কিভাবে কেউ
লিখলেন ও তৈরি করলেন সে বিষয়ে জানবার খুব আগ্রহ তৈরি হল আমার ভিতর। এর পর আবারও
নোবেলের গলায় শুনলাম “হাসতে দেখ, গাইতে দেখ” গানটি। কি বলব! একদম সহজপাচ্য একটি
গান। মানে কথা শুনে মনে হয় এ তো আমারই মনের কথা। না বলতে পারা কিছু বেদনার কথা।
সুর শুনে মনে হয় এই গানে এই সুর ছাড়া আর হয়তো অন্য কোনও সুর হতেই পারে না। তারপর
থেকে মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ইচ্ছা থেকেই গেল। এই গান দুটোর ব্যাপারে জানতেই হবে।
কিন্তু কেমন পাবলিক দেখুন আমি, গুগুল বা ইউটিউব কোনটাতেই একদিনের জন্যও সার্চ করে
দেখলাম না গান দুটোর ব্যাপারে। যাই হোক দুদিন আগে আমার উনি দেখি গানটি বেশ মনোযোগ
সহকারে শুনছেন। আমায় বললেন “আরে এটা তো আয়ুব বাচ্চুর গাওয়া গান, তুমি আগে শোন নি। তারপর
‘হাসতে দেখ, গাইতে দেখ’ এই গানটাও তো ওনারই তৈরি করা গান। সত্যি বলছি শুনতে শুনতে
এক গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে পড়লাম আমি আয়ুব বাচ্চুর।
১৯৬২ সালের ১৬ই আগস্ট
আয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। লাভ রুইন্স ব্লাইন্ড বলে একটি
ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। বাচ্চুর ডাকনাম ছিল রবিন। চট্টগ্রামের
গভর্মেন্ট মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে বাচ্চু প্রথম ফিলিংস
বলে একটি রক ব্যান্ডের সাথে যুক্ত হন। বছর দুয়েক সেখানে কাজ করেন। তারপর ১৯৮০ সালে
সউল বলে একটি ব্যান্ডের সাথে যুক্ত হন। সেখানে তিনি একজন গিটার বাদক ও গীতিকার
হিসাবে কাজ করতেন প্রায় দশ বছর ধরে। ১৯৯০ সালে সউল ব্যান্ডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন
করবার পর তিনি ১৯৯১ সালে নিজের ব্যান্ড লাভ রুইন্স ব্লাইন্ড তৈরি করেন। LRB ব্যান্ডের প্রথম
অ্যালবাম এর নাম ডবল অ্যালবাম। সেই অ্যালবামের বেশ কিছু হার্ড রক গানগুলির মধ্যে
অন্যতম হল ‘ঘুম ভাঙ্গা শহরে, মাধবী, হকার’ ইত্যাদি। এল আর বি ব্যান্ডের দ্বিতীয়
এবং তৃতীয় অ্যালবামের নাম ‘সুখ’ এবং ‘তবুও’। বাচ্চুর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য
গানগুলি হল ‘সুখ, গতকাল রাতে, ক্ষণিকের জন্য, চলো বদলে যাই, সেই তুমি, হাসতে দেখ,
গাইতে দেখ’। ১৯৯৫ সালে ওনার তৃতীয় অ্যালবাম প্রকাশিত হয় যার নাম ‘কষ্ট’। বাংলাদেশ
মিউজিকাল ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েসন এর নেতৃত্ব দেন আয়ুব বাচ্চু। নভেম্বর ২০১২ সালে
বাচ্চুর ফুসফুসে সংক্রমণ দেখা দেয়। তারপর থেকেই শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পরেন
তিনি। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ওনার নিজের বাসা মাঘবাজারে হঠাৎ করেই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে শেষ
নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২০১৮ সালের ১৮ই অক্টোবরে।
শিল্পী চলে যায় আমাদের
ছেড়ে। কিন্তু রেখে যায় তার অমর সৃষ্টি। শিল্পীর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু
শিল্পের নয়। সেই জন্যই বোধহয় আজও আমাদের কানে বাজতেই থাকে ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা
হলে’। ‘রুপালি গিটার’ বাজতেই থাকে ‘ঘুম ভাঙ্গা শহরে’।

Comments
Post a Comment