নেট বিপ্লব
গত ১৪-১৫ বছর আগে খবরের
কাগজের পাতায় একটা হেডিং দেখতাম, এখনও হয়ত অনেকে দেখতে পান। হাতের মুঠোয় দুনিয়া।
কি তাই না? সম্ভবত আনন্দবাজারেই হয়ত। প্রশ্নটা সেখানে নয়। মনে হয় একটা চিন্তাভাবনা
করবার সময় এসেছে। উহু ভুল বললাম। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। আচ্ছা ভেবে দেখুন তো
আমাদের প্রত্যেকের হাতে তো দুনিয়া। মানে মুঠোফোন। কিন্তু কজন তার সঠিক ব্যবহার
করছি? দুনিয়ার এই বিভিন্ন রকম কাণ্ডকারখানার কতটুকুই বা আমাদের করায়ত্ত? আমরা
শুধুমাত্র ভেসে বেড়াচ্ছি। ঠিক যেরকম ভাবে কোন অডিও বা ভিডিও হোয়াটসআপ বা মেসেনজারে
ভেসে বেড়ায়। আমাদের হাতের মুঠোয় দুনিয়া, তাই আমাদের সময় নেই। সময় নেই মুখ তুলে
তাকাবার ঠিক পাশে বসা বন্ধুটির দিকে। দশটা ভিডিও এসেছে হোয়াটসআপে। দেখে এখুনি
শেয়ার করতে হবে গার্লফ্রেন্ডকে। সময় কোথায়? মেসেনজারে চারটে লিঙ্ক এসেছে নিউজিল্যান্ডের
হামলাকারীর। এখুনি পাঠাতে হবে সবাইকে। সময় কোথায়? সত্যি আমরা সেন্ড ও শেয়ার করতে
সারাদিন ধরে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে নতুন কিছু ভাবনা করবার সময় আমাদের নেই। আজ আমদের
হাতের মুঠোয় দুনিয়া রয়েছে, তাই বোধয় নিজের মনের প্রতি আমাদের আর কোন লাগাম নেই।
নিজের চোখের প্রতি, নিজের হাতের আঙ্গুলের প্রতি আমাদের কোনও সংযম নেই। আমরা দেখছি,
শুনছি, ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত হচ্ছি ও আনন্দে ফেটে পড়ছি। কিন্তু সেটা খুবই কম
সময়ের জন্য। খালি মনে হয় আরও আরও কেন আসে না ভিডিও বা অডিও যা কিনা আরও বেশি করে
শেয়ার করে জানান দিতে পারব যে আমি অন্যদের তুলনায় এগিয়ে। একটা সময়ের পর হয়ত কারোর
কারোর মধ্যে আসে ডিপ্রেশন বা একাকিত্ত। তাহলে? কি? নেট করব না? নেট ছাড়া যে জীবন
অচল। আমাদের প্রত্যেকের সামনের পদক্ষেপে নেটের ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। তাহলে কি করতে
হবে? আছে, ব্যালান্স করে চলবার উপায় আছে।
আমরা যারা দুহাজার তিন
চার বা তার কিছু পরে স্নাতকস্তর উত্তীর্ণ হই, আমাদের মধ্যে একটা মাইন্ড সেট কাজ
করত। যা কিনা আজকের যুগে একেবারেই অচল। আমি বা আমার মত অনেকেই ভেবে নিয়েছিল যে
এরপর একটা চাকরি পেলেই লাইফ সেট। তারপর দেখেশুনে বা বাপমায়ের কথামতো একটি সুন্দরী
মেয়ের সাথে বিয়ে। কিন্তু জীবন যে আর সোজা পথে চলছে না কাকা! প্রতিমুহূর্তে আমাদের
এই এক জায়গায় দাড়িয়ে যাওয়া চিন্তাভাবনার অবসান ঘটাতেই হবে। নইলে জাস্ট মুছে যাব
আমরা। আমাদের মাঝে মাঝে হয়ত মনে হয় যে আমাদের বাবা কাকারা একটা মুঠো ফোন পাওয়া
সত্তেও কেন যে ঠিক মতো ফেসবুক বা হোয়াটসআপ করতে পারেন না কে জানে। কিন্তু আমরা কি
এটা ভাবছি যে আর পাঁচ সাতটা বছর পর আমাদের এই ফেসবুক বা হোয়াটসআপকে টেক্কা দিয়ে
আরও নতুন কিছু আমাদের হাতছানি দিতে চলেছে। এমন হবে না তো যে সেগুলি ব্যবহারে আমরা
অনভস্ত্য হয়ে পড়ব। প্রতিমুহূর্তে বদলানো এই দুনিয়ায় তাই আমাদের ও বদলাতে হবে। আমি
নিজে একটা construction কোম্পানিতে কাজ
করি। দুহাজার নয় দশ সাল থেকে দেখছি সেই কোম্পানিতে একই সফটঅয়্যারে কাজ আজও হয়ে
আসছে। তার কোনও আপগ্রেডেশন নেই। আগামি দিনেও হবে বলে কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।
এক্ষেত্রে বলতেই হচ্ছে যে আমরা আমাদের নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়ুল মারছি। কর্মচারীদের
মধ্যেও কেমন যেন এক ধরণের ঝিমুনি ভাব কাজ করে। খুব শিগগিরই এর পরিবর্তন হওয়া
দরকার। কেউ কেউ হয়ত ভাবছেন কাকা নেট বিপ্লব লিখতে বসে যে শুধু নেগেটিভ কথাই লিখে
যাচ্ছ, পজিটিভ কিছু ছাড়। তাহলে বলি ইনটারনেটে পজিটিভ দিকটাই অনেক বেশি। কিন্তু
আমরা সেগুলো জানিনা বা জানলেও তার সঠিক প্রয়োগ করছি না। ছুরি ভালো বা মন্দ দুটো
কাজেই ব্যবহার করা যায়। ডাক্তার ছুরি ব্যবহার করে মানুষের প্রাণ বাঁচায়। গুন্ডা
ছুরি ব্যবহার করে মানুষের প্রাণ নেয়। এই নেট বা অন্তরজাল কে যদি একটি ছুরির সাথে
তুলনা করা যায় তাহলে আমরা বরং ভেবে দেখি একে ডাক্তারের মতো ব্যবহার করব নাকি
গুণ্ডার মতো।
নেট থেকে আমি নিজে যে
ধরণের পজিটিভ এনার্জি পেয়ে থাকি তার কিছু কথাই বরং বলি। মুলত ইউটিউব ও ফেসবুক
নিয়েই বরং আলোচনা করা যাক। কারণ এই দুটি জায়গায় মানুষের নিত্য যাতায়াত। একদিন
দেখলাম ফেসবুকে রক্ত চেয়ে পোস্ট, দেখলাম ঘরোয়া গান বাজনা করে তার পোস্ট, দেখলাম
বন্যাত্রাণে সাহায্য চেয়ে পোস্ট। আমরা মানুষেরা ফেসবুককে তাহলে মানুষের কল্যাণের
কাজে ব্যবহার করলাম। নেট বিপ্লবের পজিটিভ দিক। কিন্তু আমরা নিজেরা সেটা কজন করি
প্রশ্ন সেখানেই। শুনলাম অমুক বন্ধুর এক পিসি খুব ভাল রান্না করেন। পিসেমসাই সদ্য
মারা যাওয়ার পর উনি বসে না থেকে ইউটিউবে সেই রান্নার রেসিপি আপলোড করছেন নিয়মিত।
শুধু তাই নয় সেখান থেকে ধীরে ধীরে কিছু উপার্জন করবার রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছেন।
জীবনকে খুঁজে পাচ্ছেন। আরও আছে। self teaching. ঘরে বসে আপনি
শিখতে পারছেন অনেক কিছু। ইউটিউব ও ফেসবুকের
ভিডিও থেকে। সম্প্রতি আয়মান সাদিকের নাম হয়ত অনেকেই জেনে থাকবেন। একজন ইউটিউবার
এবং একজন শিক্ষক, যিনি 10 minute school বলে একটি অনলাইন স্কুল খুলেছেন বছর তিন চার আগে
যা থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী উপকৃত। আমি নিজে ওনার motivational
speech গুলো শুনে ভীষণ ভাবে পজিটিভ এনার্জি লাভ করেছি। আরও আছেন।
গৌর গোপাল দাস, সন্দীপ মাহেস্বরি, সিমারজিত সিং। আছে IELTS এর ইংলিশ স্পিকিং কোর্স। আছেন অনেক ফেসবুক
লেখিয়ে যাদের থেকে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারছি প্রতিনিয়ত। তার মধ্যে অনেকের নাম
না বললে নয়। যেমন উত্তরায়ন দেব, অতনু প্রজ্ঞ্যান বন্দোপাধ্যায়, সুবর্ণা রয়, প্রিয়ম
সেনগুপ্ত, বিমোচন বাবু, সব্যসাচী দা এবং আরও অনেকে। দেখতে পারেন টেড এক্স ও জোশ টকস
এর মতো ভিডিও গুলো। ইন্টার নেট পরিষেবার এই পজিটিভ দিক গুলো নিয়ে কাজ করলে আমরাও
আনতে পারি সমাজে এক নতুন বিপ্লব এই আমার বিশ্বাস।
Comments
Post a Comment