কাল রাতে এক পেত্নীর সাথে
চেন্নুর মেসে ঘুটঘুটে
অন্ধকার। কাল রাত সাড়ে ন’টার পর নিচের তলায় মেসের ক্যান্টিনে খেতে গিয়েছিলাম। হাতে
একটা তিন ইঞ্চি মাপের কম পাওয়ারের টর্চ লাইট। মোবাইলের চার্জ কম থাকায় সেটিতে আর
কোনও কাজ হচ্ছিল না। সেই টর্চ লাইটের আলোয় কোনোরকমে খাওয়া শেষ করলাম। সন্ধ্যে নাগাদ
ঝড়ো হাওয়া ও সাথে সামান্য বৃষ্টির কারণে লোডশেডিং। আমাদের মেসের মূল ফটকের
সোজাসুজি একটি করিডর লম্বা ভাবে মেসের শেষ বরাবর চলে গিয়েছে। করিডর এর পাশাপাশি
ঘর। লোকজন এখন বেশ কম। বেশিরভাগ ঘরই খালি পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে। খাওয়া শেষ
হবার পর করিডরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছি। সাথে পুলক দা ও শুভম। পাশেই মুখার্জিদা’র
ঘর। পুলক দা ও মুখার্জিদা’র ঘর একে অপরের মুখোমুখি। এই দুই ঘরের পাশেই খানিক অংশ
ফাঁকা অবস্থায় পরে আছে। এই দুই ঘরের জানালার ভেতর থেকে মূল প্রবেশদ্বার পর্যন্ত
দেখা যায়। পুলক দা’ই হঠাৎ করে শুরু করল – ‘জানতো একদিন রাতের বেলা শুয়ে আছি, পাশে
জানালাটা খোলা। দেখি একটা লোক। অন্ধকারে ওই মেন গেটের মধ্যে দিয়ে এসে আমার দিকে
তাকিয়ে আছে। আমি মোবাইলে সিনেমা দেখছিলাম। পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কে কে
আপনি? দেখলাম লোকটাকে ফিরে যেতে। অন্ধকারে একটা কালো অবয়ব, চেহারা কিছুই ঠাহর করতে
পারলাম না। এই কুকেদের কতবার বলেছি, রাতের বেলা মেন গেটটা বন্ধ করবার জন্য। এরা
কিছুতেই কোনও কথা কানে তুলবে না’।
‘কোনও চোর ছ্যাঁচোড়
এসেছিল নিশ্চয়ই’। আমি বললাম।
‘এখানে কোনও চোর ছ্যাঁচোড়
পাবে না তুমি’।
‘তাহলে? কি বলতে চাইছেন?’
‘এই চেন্নুর মেসে ওপরে
একা কোনোদিন থেকেছ? মানে আমি বলছি একদম একা। বাকি সবকটা ঘর ফাঁকা, মানে খালি।
থেকেছ কখনও?’
‘না সেই সৌভাগ্য হয়নি
কোনোদিন’।
‘ভগবান না করুন, এরকম দিন
যেন না আসে তোমার জীবনে’।
আমি বললাম ‘সময়টাকে ভালোই
উপভোগ করছেন, এরকম এক লোডশেডিং এর রাতে, মৃদু চাঁদের আলোয়, লম্বা নিমগাছটার আলো
আঁধারের ছায়ায় গাঁজা খুড়ি গল্পের আসর ভালোই বানাচ্ছেন’।
‘তুমি আমার কথা মানছ না?
তুমি জানো এখানে কত অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে? আরে এটা তো পুরো জঙ্গল ছিল। মাওবাদীরা
এখানে ঘাঁটি গেড়েছিল কতদিন তার খবর তুমি জান? ওই যে কি নাম কিষান জি, ওর
সাঙ্গপাঙ্গরা তো এখানে মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি টুরতি করতে আসত। এই এই এখানে যেখানে
তুমি দাড়িয়ে আছো, এখানেই হয়তো মাটির তলায় কারোর লাশ পোঁতা আছে। রেপ এবং মার্ডার এর
কেস এখানে একসময় অনেক হয়েছে’।
শুভম, পুলক দা কিন্তু
দারুণ দিচ্ছে, প্রথমে অপঘাত, তারপর কিষান জি, তারপর মেয়েছেলে নিয়ে ফুর্তি, রেপ,
মাটির তলায় লাশ, আরও কত কি ছাড়বেন বলুন দেখি?’
‘আমি ছাড়ছি না, আমাদের
মেসের অনেকেই দেখেছে। পরিস্কার নয়, অস্পষ্ট শরীর, বাংলায় যাকে বলে অশরীরী।
শ্রীবাস্তব, জহর দা এদের জিজ্ঞাসা করে দেখছ কোনোদিন? ওরাও বলেছে’।
এই শুনে শুভম আবার বলে
উঠল ‘আমি কিন্তু একা ঘরে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার আওয়াজ পেয়েছি। মনে হল দরজায় কেউ নক
করছে। কে কে বলে চিৎকার করাতে আর কোনও সারা শব্দ পেলাম না’।
‘তখন ঝাঁট টা আরও জ্বলে
যায় না, হ্যাঁ? কি বল?’ এই বলে আমি টর্চ জ্বালিয়ে ওপরে সিঁড়ির দিকে যাওয়ার জন্য পা
বাড়ালাম। পেছন থেকে পুলক দা বলে উঠল ‘গা
ছম ছম করছে নাকি ভাই? ভয় পেলে?’
‘আপাতত সবাই নীচে খাওয়া
দাওয়া করছে, একমাত্র অনির্বাণ ছাড়া। ও এবার খেতে এল বলে। ও নীচে এলে ওপরে কিন্তু
তখন ফাঁকা। যাই এই সুযোগে যদি কিষান জির প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে মানে অপঘাতে মরা
কোনও পেত্নীর সাথে যদি দেখা পাই!’
‘সিঁড়ি দিয়ে কিন্তু
সাবধানে যেও, না সত্যি বলছি এই সব নয়, লতা পাতা বোঝ তো সে গুলো অন্তত দেখে যাও’।
‘ওকে বস’। এই বলে আমি
সিঁড়ির উদ্দ্যেশে রওয়ানা দিলাম। পুলক দা শেষ কথাটা ঠিকই বলেছে। লতা অর্থাৎ সাপের
উপদ্রব আমাদের এই মেসে রয়েছে অনেকদিন ধরে। সেটা অবশ্য আমি নিজে চোখে দেখেওছি
অনেকবার।
সিঁড়ি দিয়ে উঠছি আর
স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি পায়ের আওয়াজ। কেউ যেন নেমে আসছে। এক পুরুষালী পায়ের শব্দ।
আওয়াজে মনে হল ব্যক্তিটি বেশ লম্বা চওড়া। আরেকটু উঠতেই অনির্বাণের মুখোমুখি। খাওয়া
হলো জিজ্ঞাসা করতে করতে অনির্বাণ তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। আমি যেন
প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই সিরিয়াস হয়ে গেলাম। আমার অনুভুতি যেন অনেক গুন বেড়ে
গেল। নীরবতার শব্দগুলো যেন আমাকে গ্রাস করতে লাগল। ওপরে উঠে এলাম। সামনে পেছনে,
চারধারে তাকালাম। যুক্তি বোধ আমায় জিজ্ঞাসা করল আমি কেন এতটা সচেতন হয়ে পড়লাম হঠাৎ
করে। আমার মধ্যে কি হঠাৎ করে সংশয় বোধ কাজ করতে শুরু করেছে। ঘরে ঢোকবার আগে বেশ
কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলাম বাইরের বারান্দায়। অর্ধেক চাঁদের আলোয় বেশ একটা আলো আঁধারীর
পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বাইরে হাওয়া বইছে সড়সড় করে। শুকনো পাতার খসখস শব্দ এক অদ্ভুত
মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে যেন। দড়াম করে পাশের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। ছ্যাঁত করে
উঠল বুকের ভেতর। এক চাঁপা দমবন্ধ করা উত্তেজনা শুরু হল আমার মধ্যে। এক অদ্ভুত ক্যা
শব্দ করে দরজাটা আবার আসতে আসতে খুলতে লাগল। ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলাম
আমি। মনে হল সত্যিই বোধয় আমাকে ঘরের ভেতর থেকে কেউ দেখছে। আমি টর্চ দিয়ে সামনে আলো
ফেললাম।
................................................................................................
টর্চের আলো আমায় ঘরে নিয়ে
গেল। মেসের ওপরতলায় এখন জনমানবশূন্য। শুধুমাত্র আমি একা। পুলক দা’র সেই কথাটা আমার
মনে পড়ল। ‘এই চেন্নুর মেসে ওপরে একা কোনোদিন থেকেছ? মানে আমি বলছি একদম একা। বাকি
সবকটা ঘর ফাঁকা, মানে খালি। থেকেছ কখনও?’ কথাটা বার কয়েক মনে করছি আর এদিক ওদিক
তাকিয়ে দেখছি। ইংরিজিতে সাউন্ড অফ সাইলেন্স বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ নিঃশব্দেরও
শব্দ আছে। আমি যেন তাই শুনতে পাচ্ছি এখন। তাহলে কি অদেখা কে দেখতে চলেছি? নিজের
মনকে প্রশ্ন করলাম। টর্চের আলো নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকারে আস্তে আস্তে পা ফেলে একটু
এগোলাম। আমার বাঁ হাতটা কিসের সাথে যেন ঠেকল। পাশে থাকা চেয়ারটার সাথে। থপ করে
চেয়ারটার উপর বসে পড়লাম আমি। মনে মনে কিছু একটা অবলম্বন যেন আমি চাইছিলাম। কিন্তু
এই অন্ধকারেও আমার যেন বার বার মনে হতে লাগল কেউ একজন আমায় দেখছে। অনবরত। আমি
স্থির হয়ে বসে রইলাম। আমার চলনশক্তি কেমন যেন হ্রাস পেতে লাগল। শরীরে যেন এক
বিন্দু শক্তি আমার নেই। কেন এমন হচ্ছে, আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার ঘরের
জানালা দিয়ে চাঁদের মৃদু আলো এসে পড়েছে। আমি একভাবে ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছি।
স্পষ্ট দেখলাম এক নারী শরীরের ছায়া সেই মেঝেতে এসে মিলিয়ে গেল। আমার মানসিক শক্তি
তখনও লোপ পায় নি। আমি আবারও সেই ছায়া দেখবার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম, কিন্তু শরীরে
তখন কোনও সাড় নেই। তাই শুধু বসে বসেই অপেক্ষা করতে থাকলাম। মুখ দিয়ে যে কিছু কথা
বলব সে সামর্থও তখন যেন লোপ পেয়েছে। এবারে আর মেঝেতে নয়। ঘরের দরজায় স্পষ্ট দেখলাম
হাওয়ায় উড়ন্ত এক শাড়ির আঁচল। এক অদ্ভুত অনুভুতি হল আমার। আমি যেন জড়ভরতের মতো হয়ে
গেছি। তিনি আমায় যা দেখাচ্ছেন, আমি যেন তাই দেখছি। আমার চোখ সেই উড়ন্ত আঁচলের দিকে।
মেঝের দিকে আমি যেন আর তাকাতেই পারছি না। আমার দৃষ্টি এক দিকে নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমার ডান কানের পাশ দিয়ে কেউ যেন হেঁটে আমার ঘরে প্রবেশ করল।
আমার শিঁড়দাড়ার মধ্যে দিয়ে খেলে গেল এক ঠাণ্ডা স্রোত। এক স্পষ্ট ছায়ামূর্তি আমার
বিছানায় গিয়ে বসল। এবারে মনে হল আমি তার দিকে তাকাতে পারলাম। বোবা দৃষ্টি নিয়ে আমি
তাকালাম সেই রমণীর দিকে। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাবে তার দিকে তাকাতেই তিনি বিছানা ছেঁড়ে
পাশেই দাড়িয়ে পড়লেন সঙ্গে সঙ্গে। অস্পষ্ট এক অবয়ব, কিন্তু মনে হল যেন খুব লাবন্যে
ভরা এক মুখ। এক সদ্য যৌবনা যুবতীর মুখোমুখি আমি। আমি আমার প্রখর অনুভূতির মাধ্যমে
ওকে বোঝবার চেষ্টা করে যাচ্ছি ক্রমাগত কিন্তু পারছি না। না মুখে কিছু বলতে পারছি,
না চেয়ার ছেঁড়ে দাড়িয়ে ওর সামনে যেতে পারছি। নিজেকে এক চলতশক্তিহীন বৃদ্ধের মতো
মনে হতে লাগল। সম্পূর্ণভাবে বাকরুদ্ধ হল আমার।
‘বাবু, কেমন আছেন?’ ছ্যাঁত
করে উঠল আমার বুক। নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ আমি নিজেই অনুভব করতে লাগলাম। আমায় সে কি
কিছু বলল? নাকি এটা আমার মতিভ্রম? নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি এমন সময় আবারও ‘বাবু
কেমন আছেন?’
আমি কোনওমতে ‘কেক-কে
তততুমি? জিজ্ঞাসা করলাম।
‘আমি ফুলমণি বাবু। আপনেরা
নীচে গল্প করতে ছিলেন, আমি সব শুনেছি বটে। উহাতে একটুক ভুল বলিছিল ও লম্বা মতন
বাবুটা। আমি তাই সুধরাতে আইলাম। আমাদের দলের কিষাণজী মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি টুরতি
করতক নাই বাবু। উ বাবুটা ভুল বলিছিল। আমরা মাওবাদীরাও তো মানুষ ছিলুম। নিজেদের হকের
জন্য লড়াই চালায়ে ছিলুম। উহাতে কিছু ভুল ছিল না বাবু। ফুর্তি তো করেক ছিল ইখানকার
পুলিশ ও পার্টির নেতা গুলা। মেয়েমানুষ ও মদ নিয়া পড়ে থাকত পুলিসগুলা। আমার মরদটারে
ফাঁসায়ে আমার ইজ্জতটারে নিয়া খেলা করছিল ও হারামিরা। এই, এই ঘরের ঠিক নিচেই আমার গলায় ফাঁস লেগে মরণ হইছিল। ওই যে আপনেরা কইতেছিলেন না অপঘাতে মৃত্যু নিয়ে। আমিও ওইভাবেই
জান দিয়া ছিলাম। জানেন বাবু, আমার মরদটা আমায় খুব ভালবাসত। কিষাণজী আমাদের দুজনের
বিয়া দিছিল। আমার মরদটা অনেক গুলা বদমাশ পুলিশকে খুন করছিল। সেই রাগে উহারে ফাঁসায়
ওরা। আমি আমার নিজের ইজ্জত ওদের হাতে দিই নাই বাবু। শয়তানগুলার হাত হইতে পলাইয়া এই
জঙ্গলে আইসা পড়ি। কিন্তু কপালটা বড়ই মন্দ ছিল রে বাবু। উহারা আমার পিছু নিল ও
এখানে আইসা পড়ল। নেকড়ের মত পশুগুলা আমারে লইয়া টানাহিঁচড়া করতে লাগল। আমার পরনের
শাড়িটারে আমার শরীর হইতে খুইলা ফেলাইল। আমি চিৎকার কইরা কান্নাকাটি করতে থাকলাম।
আমার শরীরের উপর তখন তিনটা নেকড়ে লাফালাফি শুরু কড়ছে। কাঁটাঝোপ ও ঘাসের আঁচড়ে আমার
বুক ও পিঠ ক্ষতবিক্ষত হইতে লাগল। কোনরকমে হাতে একটা ভাঙ্গা ডালের নাগাল পাইয়া
একটার চোখে ঢুকাইয়া দিলাম খোঁচা। একটার মাথায় দিলাম এক বারি। তারপর লাগাইলাম দৌড়।
তখন আর একটা শয়তান পিছন থেইক্যা আমার শাড়ির আঁচলটা দিয়া গলায় লাগাইল এক প্যাঁচ। আমারে
টাইন্যা হিঁচড়া একটা গাছের ডালের সাথে বাইন্ধ্যা দিল। আমি আবারও প্রাণপণ পলাইতে
চেষ্টা করিলাম কিন্তু পারি নাই। গলায় ফাঁস লাইগ্যা আমার মরণ হইল’।
.......................................................................................
আমি কি কোনও গর্তের ভেতর
পড়ে আছি? ঠিক বুঝতে পারছি না। আকাশ দেখতে পাচ্ছি। এ আকাশ রাতের না দিনের, কালো না
সাদা ঠিক বুঝতে পারছি না। এই আকাশে না আছে কোনও তারা না আছে কোন চাঁদ, সূর্য। তবে
কি এ আকাশ মরণের পূর্বাভাষ? এখন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার শরীরের উপর দিয়ে
হেঁটে যাচ্ছে পুলক দা, শুভম, অনির্বাণ। ওদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে জ্বলন্ত
মোমবাতি। আমার বুকের উপর দিয়ে ওরা তিনজন হেঁটে চলেছে। কিন্তু আশ্চর্য, আমার কোনও
কষ্ট হচ্ছে না। আমি শুধু দেখছি। না আছে কোনও স্পর্শ, না আছে কোনও শব্দ, না আছে
কোনও গন্ধ। তবে কি আমার দেহটা কফিনে বন্দি হয়ে আছে? কাঁচের ভেতর থেকে দেখছি এই
পৃথিবীকে? পুলক দা, শুভম ও অনির্বাণ তিনজনে যেন এক সাথে বলছে ‘মেসে তো কারেন্ট
নেই, মোমবাতি জ্বালিয়ে খেতে চল সবাই’। মনে হল কথাগুলো একসাথে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বরের
মাধ্যমে উচ্চারিত হচ্ছে আমার দু কানে।
‘এ রমিত দা, চোখ বুজে
জঙ্গলের দিকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি? হ্যাঁ?’ শুভমের শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম
আমি। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। পুলক দা’ও ছুটে এল আমার দিকে। বলল - ‘তুমি
কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাঁটছ নাকি বলতো? সেই কখন থেকে ডাকছি তোমায় আমরা। আর এই ঘন
জঙ্গলের দিকে এই রাতের বেলা কোথায় যাচ্ছ শুনি? নিশি ডেকেছে নাকি তোমাকে রাতের
বেলা?’ দেখলাম পাশে দাঁড়িয়ে মুখার্জিদা ও অনির্বাণ।
আমি বললাম ‘আমি তো ঘরে
ছিলাম, চেয়ারে বসে, এখানে কি করে এলাম, সত্যি বুঝতে পারছি না’।
‘দেখি মুখে দারুর গন্ধ
আছে কিনা, না তুমি তো দারু খাওনি, তবে, এসব ভুলভাল বকছ কেন?’ পুলক দা বলল।
অভিজ্ঞ মুখার্জিদা আমার
দিকে তাকালেন। আমার দু কাঁধে হাত রেখে শরীরটা সামান্য ঝাঁকালেন। জিজ্ঞাসা করলেন
‘এখন কেমন বোধ হচ্ছে? তোমার কি somnambulism আছে নাকি? রাতের বেলা ঘুমের ঘরে হেঁটে বেড়ানোর রোগ?’
পড়েছিলাম বটে চাকরীর
পরীক্ষায় ‘A PERSON WHO WALKS IN SLEEP IS CALLED
SOMNAMBULIST’ তবে আমার তো এ রোগ কোনদিন ছিল না। আমি তবে কি করে ঘুমের মধ্যে হেঁটে
হেঁটে দোতলা থেকে নীচে নেমে জঙ্গলের রাস্তায় চলে যাচ্ছিলাম। আর কেনই বা যাচ্ছিলাম?
ফুলমণিই বা কে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বাকি রাতটা কোনোরকমে কাটালাম।
পরের দিন সকাল
বেলা...............
আমার ঘরের দরজার
সামনে একটি বেশ পুরনো খবরের কাগজের টুকরো যাতে লেখা মাওবাদী কর্মী ফুলমণি ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের
মৃত্যুর খবর।
সমাপ্ত......
প্রেমাংশু......21/04/19
Comments
Post a Comment