#আমার চোখে সত্যজিৎ – এক
প্রতিষ্ঠান – কিছু কোলাজ
তিনি শিখিয়েছেন সাসপেন্স
কিভাবে সৃষ্টি করতে হয়। দু জোড়া পায়ের দিকে ক্লোজ করা ক্যামেরা। সেই দু জোড়া পা
একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে একটি বাচ্চা ছেলের কাছে। তারপর শুরু হয় কিছু কথোপকথন।
সিনেমার পর্দার সামনে বসা দর্শক মুগ্ধ হয়ে দেখেন সেই দৃশ্য। ক্যামেরা তখনও তাক করে
রাখা সেই দু জোড়া পায়ের দিকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে কিছু প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়
এইভাবে “এই খোকা, খোকা, শোন, মুকুলদের বাড়িটা আমাদের একটু দেখিয়ে দিতে পারবে?”
কতকটা এইভাবেই সত্যজিৎ সাসপেন্স সৃষ্টি করেছিলেন। সোনার কেল্লা গল্পে এই দুই দুষ্টু
লোককে অনেক পরে ক্যামেরার সামনে এনে দেখিয়েছেন। কিন্তু এই দুই দুষ্টু লোক সম্পর্কে
খুব সচেতন ভাবে দর্শকের মনে এক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন। এতক্ষণে মনে পড়ছে
নিশ্চয়ই মন্দার বোস এবং বর্মণের নাম। একজন ভূ-পর্যটক ও একজন নকল ডঃ হাজরা। বাঙালির
মধ্যে সত্যজিৎ সৃষ্টি করলেন প্যারাসাইকোলজি সম্পর্কে আগ্রহ। মানুষের মনে আনলেন
কিছু প্রশ্ন জাতিস্বর সম্পর্কে। সেইসময় ছোটদের কাছে বড়দিনের বড় উপহার এনেছিলেন
সত্যজিৎ। যার নাম সোনার কেল্লা। ১৯৭৫ সালের ৩রা জানুয়ারি আনন্দবাজারে প্রকাশিত
চিত্রসমালোচনার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলাম।
“রঙিন সোনার কেল্লা’র
প্রথম এবং শেষ কথা তার উপভোগ্যতা। ছোটরা যদি এ ছবি দেখে কখনও রোমাঞ্চিত, কখনও
কৌতূহলে উদ্দীপিত হয়, তবে ওদের আনন্দ-উৎসাহের শরিক হতে পারবেন ওদের অভিভাবকরাও।
ছবির স্নিগ্ধ, সরস কৌতুক আর বহিরঙ্গের লাবণ্যে তারা পরিতৃপ্ত হবেন। এই লাবণ্যকে
পরিচালকের প্রকাশভঙ্গীর প্রসাদগুণ বলা যায়”।
“মুকুল এবং ডঃ হাজরা
বিপদের মুখে পরতে পারেন, এই আশঙ্কা ক্রমে দানা বাঁধে। ফেলুদা কেমন করে মুকুলকে
বাঁচান, সেটাই অতঃপর দ্রষ্টব্য। ফেলুদার একান্ত ভক্ত তোপসের মতো দর্শকরাও যেন তখন
ওই গোয়েন্দার সঙ্গী। নাট্য-কৌতূহল রচিত যোধপুর পর্বে, যেখানে সার্কিট হাউসের
পাশাপাশি কামরায় এবং কাছাকাছি মুকুল, ছদ্ম পরিচয়ে দুই খলনায়ক এবং ফেলুদা সহ সব
কয়েকটি প্রধান চরিত্রের অবস্থান”।
“ছবিতে অবশ্য টেনশন অথবা
উত্তেজনার চেয়েও কৌতুকের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে যে কারণে কিছু অংশে রহস্য
উপন্যাসের লেখক চরিত্রটির প্রাধান্য। এই কমিক চরিত্রের আচরণ এবং সংলাপ আগাগোড়া
উপভোগ্য (সন্তোষ দত্তের অভিনয় চমৎকার) ট্রেনের কামরায় ফেলুদাকে অবাঙালী ভেবে তার
হিন্দিতে অনর্গল কথা বলে যাওয়ার দৃশ্যটি তো খুবই মজাদার”।
ঘরে বাইরে সম্পর্কে
সত্যজিৎ বলেছিলেন ‘একটা খাঁটি ট্র্যাজেডি করা গেল’। এই ছবির চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে
সত্যজিৎ চল্লিশটা বই পড়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনের ব্যাকগ্রাউন্ড ভাল করে জানার
জন্য, আন্দোলনের ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখার জন্য। তিনজনের সম্পর্ক এবং রাজনীতির
মেলবন্ধন ছবিটাকে এক আলাদা মাত্রা এনে দেয়। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস নিয়ে সত্যিকারের
সিনেমা, যা ছিল কঠিনতম কাজ সত্যজিতের কাছে। উপন্যাসটি যেভাবে লেখা তা থেকে একটি
নিটোল চিত্রনাট্য করা যে সম্ভব তা তিনি দেখিয়েছিলেন। পরিচালকের অনেকদিনের
পরিকল্পনা অনেক পরে রুপ পেয়েছিল বলেই ছবিটি এত ভালো হয়েছে বলে মনে করেন চিত্র
সমালোচকেরা। কারণ সেসময় সত্যজিতের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় বেড়েছে অনেক। ‘ঘরে বাইরে’ রিলিজ
করবার পর চুম্বন নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছিল সেইসময়। এ বিষয়ে সত্যজিতের মন্তব্য ছিল
“চুম্বনের দরকার ছিল, এটা খুবই প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে আমার কাছে। এছাড়া বিমলার
‘সারেন্ডার’ সম্পূর্ণ হতে পারে না”। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে চুম্বনদৃশ্য বেশ
সাহসিকতার পরিচয় দেয়। তার সম্পর্কে আকিরা কুরোসাওয়া যা বলেছিলেন - "The quiet but
deep observation, understanding and love of the human race, which are
characteristic of all his films, have impressed me greatly. ...I feel that he
is a "giant" of the movie industry."
বুদ্ধিমত্তা ও আবেগ দিয়ে
মিলিয়ে মিশিয়ে ছবি করতেন সত্যজিৎ। অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ কিন্তু মেলোড্রামাবিহীন
বাংলা ছবি তৈরিতে তার মুন্সিয়ানা অনবদ্য। তার প্রথম নির্মিত ছবি ‘পথের পাঁচালী’
(১৯৫৫) বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট পায় কান চলচ্চিত্র উৎসবে ১৯৫৬ সালে এবং ১৯৫৮ সালে
বেস্ট ফিল্ম (ভ্যাঙ্কুভার) হিসাবে স্বীকৃতি পায়। কাহিনী, চিত্রনাট্য, আবহ এবং
সঙ্গীত নিজেই তৈরি করতেন সত্যজিৎ এবং নিজের ছবিতে ব্যবহার করেছেন বহুবার, সম্ভবত
১৯৬১ সালের পর থেকে। নিজের ছবির পোস্টার তৈরির কাজ নিজেই করতেন তিনি। চিত্র
পরিচালনা ছাড়াও সত্যজিৎ একাধারে ছিলেন সঙ্গীতকার, লেখক এবং একজন প্রচ্ছদ শিল্পী।
নতুন আঙ্গিকে টাইপো গ্রাফির প্রচলন করেন তিনি। বাংলা শিশু সাহিত্য পত্রিকা
‘সন্দেশ’ ১৯৬১ সালে নতুন করে প্রকাশনার কাজ শুরু করেন, যা কিনা ওনার দাদু উপেন্দ্রকিশোর
রায় চৌধুরীর প্রথম প্রকাশিত পত্রিকা। ১৯৯২ সালে অস্কার – সারাজীবনের জন্য অর্জিত
সম্মান লাভ করেন, এছাড়া ফ্রান্স থেকে লিজিও ডি অনার, আমাদের দেশের থেকে ভারতরত্ন
সম্মানে ভূষিত করা হয় ওনাকে। এছাড়াও দেশ বিদেশের আরও অনেক সম্মানে ভূষিত হন তিনি।
পথের পাঁচালী, অপরাজিত
এবং অপুর সংসার। এই নিয়ে অপু ট্রিলজি। ভারতবর্ষে বোধহয় প্রথম এরকম একটা বিষয় নিয়ে
ছবি হয়েছে যেখানে একজন বাচ্চার জন্ম থেকে তার বড় হয়ে ওঠা এবং সাংসারিক জীবনের
বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত নিয়ে সুনিপুণ বর্ণনা
করা হয়েছে এই তিনটি ছবির মাধ্যমে। হয়ত সত্যজিৎ নিজেকেই বর্ণনা করেছেন তার এই তিনটে
সিনেমার মাধ্যমে। আশ্চর্যের কথা এটাই ‘সম্পর্ক’ এবং ‘মৃত্যু’ এই দুটো বিষয় তিনটি
ছবিতেই প্রকট। প্রথম ছবি পথের পাঁচালীতে অপু এবং দুর্গা, অবশেষে দুর্গার মৃত্যু।
অপরাজিত তে অপু এবং ওর মা সর্বজয়া। ছবির প্রায় শেষে সর্বজয়ার মৃত্যু। অপুর সংসারে
অপু ও ওর স্ত্রী অপর্ণা। ছবির মাঝামাঝি অপর্ণার মৃত্যু। অবশ্য অপুর সংসারের শেষ
দৃশ্যে সত্যজিৎ একটা পজিটিভ দিক দেখিয়েছেন যেখানে অপুর কাঁধে অপুর ছেলে ফিরে
যাচ্ছে। এই তিন ছবির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড়ে পৌঁছতে পেরেছেন সত্যজিৎ।
Ray recounts in "My Years with Apu" on what finally led him to
do another film about Apu was, "One single attitude of Apu in the second
novel Aparajita ... After Sarbajaya's (mother) death Apu feels relief... he
felt happy to be free of bondage. ... The idea of Apu growing up and away
from his mother... and much stress is laid on Sarbajaya's slow realization of
the fact."
১৯৫০ সালে সত্যজিৎ
এবং ওর স্ত্রী বিজয়া ১৬দিনের জাহাজ যাত্রার মাধ্যমে লন্ডনে গিয়ে পৌঁছন। সেখানে
গিয়ে উনি দেখেন ‘বাইসাইকেল থিভস’ নামে একটি সিনেমা, যা থেকেই সিনেমা সম্পর্কে
প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। এ সম্পর্কে ওনার বক্তব্য - Bicycle Thieves made a
profound impression on Ray. Later, in the introduction of 'Our Films, Their
Films', he wrote- "All through my stay in London, the lessons of Bicycle
Thieves and neo-realist cinema stayed with me".
বিভিন্ন তথ্যের
থেকে জানতে পারি যে প্রথম দু বছর রায়বাবু পথের পাঁচালী তৈরি করবার জন্য কোনও প্রোডিউসার
পান নি। তিনি চাইছিলেন তার এই ছবির শুটিং করতে আউটডোরে, কিন্তু সেই সময় তিনি
কাউকেই পাশে পান নি। বিমা পলিসির টাকা এবং আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের থেকে কিছু টাকা
ধার করে রায় শুরু করেছিলেন এই ছবির কাজ ১৯৫০ সাল থেকে। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ
করবার জন্য সত্যজিৎ প্রথম প্রথম শুটিং এর কাজ করা শুরু করেছিলেন রবিবার করে। ১৯৫২
সালের ২৭শে অক্টোবর প্রথম শুট হয় সেই ট্রেনের দৃশ্য। অপু এবং দুর্গার কাশ ফুলের
বনের মধ্যে প্রথম ট্রেন দেখবার দৃশ্য। পরের রবিবারে পুরো ইউনিট টিম নিয়ে যখন
সত্যজিৎ শুটিং স্পটে পৌঁছন তখন সেই কাশফুলগুলি আর নেই। বনের গবাদি পশু হয়ত খেয়ে
নষ্ট করে ফেলেছে। সত্যজিৎ অপেক্ষা করেছিলেন পরের ঋতুর জন্য।
১৯৫৩ সালে একজন প্রোডিউসার অ্যানা দত্ত সত্যজিৎ কে কিছু
ফান্ডের ব্যবস্তা করবেন বলে ঠিক ছিল। কিন্তু তার আগের সিনেমা চূড়ান্ত ভাবে ফ্লপ
করায় তিনি সত্যজিৎকে টাকা দিতে অস্বীকার করেন। সেইসময়ে মহা ফাঁপরে পরেন তিনি। এদিকে
শুটিং এর সমস্ত কিছু তখন রেডি। সাহায্যে এগিয়ে আসেন স্ত্রী বিজয়া রায়। নিজের গয়না
বন্ধক দিয়ে শুটিং এর কাজ শুরু করান। ধীরে ধীরে কাজ এগোতে থাকে এবং অবশেষে তৈরি হয়
পথের পাঁচালী।
ট্রিলজির কথা উঠলে গুপী বাঘা’র কথা না উঠে কি পারে! গুপী
বাঘা সিরিজের তিনটি ছবি এখনও আট থেকে আশি সবার পছন্দের। গুপী গায়েন-বাঘা বায়েন,
হীরক রাজার দেশে ও গুপী বাঘা ফিরে এল। ভূতের রাজা’র সেই আকর্ষক কণ্ঠস্বর তাও তো
সত্যজিৎ এরই সৃষ্টি। এক ইন্টারভিউ তে সন্দীপ রায় বলেছিলেন যে গুপী গায়েন-বাঘা
বায়েন প্রথম এক সপ্তাহ দর্শকদের মধ্যে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তারা যেন প্রথম প্রথম
রিলেট করতে পারছিলেন না। তারপর থেকে এই ছবি টানা ৫১ সপ্তাহ চলে ও বিভিন্ন রেকর্ড
ব্রেক করে। শ্রেষ্ঠ ছবি ও শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে ১৬তম জাতীয় পুরস্কার পায় এই
ছবি। চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও সঙ্গীত এই তিন বিভাগেই সমান দক্ষতা দেখান সত্যজিৎ।
১৯৬৯ সালের ৮ই মে রিলিজ করে গুপী বাঘা। তখনকার সময়ে এই ছবির বাজেট ছিল ৬ লক্ষ
টাকা।
উইকি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সত্যজিৎ ১৯৬৭ সালে এই ছবি
করতে চেয়ে ছিলেন কলম্বিয়া পিকচার্স এর সঙ্গে। মার্লোন ব্রান্ডো এবং পিটার সেলার্স
এই ছবির জন্য প্রধান ভূমিকায় মনোনীতও হয়েছিলেন। তারপর বাজেট নিয়ে কোনও সমস্যা
হওয়ার জন্য হলিউডে এই ছবি আর নির্মাণ করতে পারেননি সত্যজিৎ। পরবর্তী কালে পূর্ণিমা
পিকচার্স এর নেপাল দত্ত এবং অসীম দত্ত সত্যজিৎ কে আর্থিক সাহায্য করেন এই ছবি
নির্মানের জন্য। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগের বিষয়টাকে ভূতেদের নাচের
মাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি। চার রকম ভূতেদের শ্রেণী এই ছবিতে দেখিয়েছেন তিনি। মোটা
ভূত, রাজা ভূত, সাহেব ভূত ও সাধারণ ভূত অর্থাৎ আমাদের মত আম আদমি। এই চার বিভাগের
ভূতের পোশাক-আশাক ও চাররকম যা কিনা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। পাক্কা সাড়ে
ছয় মিনিটের নাচের দৃশ্য বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন রকম ভাবে ভাবতে সাহায্য করে। যদিও
সত্যজিতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের শ্রেণী বৈষম্য কে তুলে ধরা ভূতেদের
নাচের মাধ্যমে। হীরক রাজা, উদয়ন পণ্ডিত, গবেষক গোবুচন্দ্র, যন্তরমন্তর সবকিছুর
মধ্যেই রাষ্ট্র, রাজতন্ত্র, রাষ্ট্র দোহিতা এইসবেরই পূর্ণাঙ্গ বহিঃপ্রকাশ পাই
আমরা।
কত বলব বা কত লিখব! আমার সাধ্য কি। মনমোহন মিত্র,
শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি, সোমনাথ ব্যানার্জি এই সব চরিত্র গুলো তো চিরকালীন হয়ে রইল
একমাত্র ওনার জন্যই। জনঅরণ্য, প্রতিদ্বন্দ্বী ও অরণ্যের দিনরাত্রি এই তিন ছবি তো
চিরকালীন আধুনিক ছবি। সত্যি এই জ্ঞান ভাণ্ডার খুঁজে খুঁজে বার করবার ক্ষমতা আমার
নেই, তাই ওনার জন্মদিনে আমার এই সামান্য নিবেদন। যা কিনা কোলাজ হিসাবে দেখাবার বা
জানাবার চেষ্টা করলাম।
তথ্যভাণ্ডারঃ- আনন্দবাজার পত্রিকা, উইকিপিডিয়া ও গুগল।
২রা মে, ২০১৯
প্রেমাংশু..................

Comments
Post a Comment