যাযাবর জীবন
ভুপেন হাজারিকার একটা গান আছে না ‘আমি এক
যাযাবর’। মাঝে মাঝে ভাবি আমি বোধহয় সত্যি যাযাবরে পরিণত হয়েছি। ছোটবেলায় একটা
আক্ষেপ ছিল যে বন্ধুরা প্রতিবছর তাদের মা বাবার সাথে ঘুরতে যায় কত না কত জায়গায়।
কিন্তু আমি দু একবার পুরী ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মা বাবার সাথে কোথাও যেতে
পারিনি। হয়ে ওঠেনি যেকোনো কারণেই হোক। পুরী সুত্রে চিল্কা লেকে গিয়েছিলাম। তাও খুব
ছোটবেলায় তাই মনে সেরকম দাগ কাটেনি। কিন্তু ছোটবেলার সেই আক্ষেপ যে এমন ভাবে আঘাত
হানবে বর্তমান জীবনে তা কে জানত! বড় হবার পর অনেক কিছুই করলাম। গ্রাসাচ্ছাদনের
জন্য প্রথম জীবনে ফ্রি ল্যান্সিং ও পরবর্তী এই জীবনে চাকরিটাকেই বেছে নিলাম। খুবই
সাধারণ মানের ছাত্র হবার কারণে যা চাকরি পেলাম সেটাকেই নিয়ে চললাম জীবনে। পেলাম
চাকরি এক কন্সট্রাকসন কোম্পানিতে। কিন্তু বাইরে বাইরে। ট্রান্সফারের চাকরি। প্রথম
প্রথম বেশ লাগত। মনে হত এই তো বেশ, অনেক জায়গায় ঘুরতে পারব, যেতে পারব, কত জায়গার
নতুন নতুন আদব কায়দা, খাবার, বেশভূষা সম্পর্কে জানতে পারব। ওই জীবনটা সম্পর্কে মনে
মনে এক রোমাঞ্চ অনুভব করতাম। এখনও যে করিনা তা নয়, কিন্তু পাখী বড়ই ক্লান্ত। ঘরে
ফেরার ইচ্ছেটা মাঝে মাঝে ভীষণ প্রকট হয়ে ওঠে। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এ গাছের ডাল ও
গাছের ডাল যেতে যেতে পাখিও নিজের বাসায় একসময় ঠিক ফিরতেই চায়। আমার অবস্থাও এখন
ঠিক তাই। কিন্তু কবে যে নিজের বাসায় থিতু হব জানিনা।
‘থিতু হবি কি রে বেটা, এটাই তো বেশ ভালো। ঘরে
ফিরলেই যে নাগপাশে জড়াবি, মায়ার বাঁধনে পড়বি। তখন কিন্তু আলাদা জ্বালা। আর তাছাড়া
কত অভিজ্ঞতা তোর এই রোমাঞ্চকর জীবনে। নতুন জায়গার নতুন বাসস্থান, নতুন লোকজন, নতুন
নতুন খাবার। ভালো করে চেখে দেখতে ভালো লাগছে না! হ্যাঁ, কি বলিস রে শালা? জীবনকে
যত অন্যরকম ভাবে দেখবি ততই না তার মজা। উপভোগ কর শুধুই উপভোগ। যেমন যেমন জীবন তোকে
নিয়ে চলে তেমন তেমন করে চলতে থাক। এক জীবনে একজন মানুষ কটা বাড়িতে থাকতে পারে বল!
আর তুই নিজেকে দেখ। এখনও পর্যন্ত কতগুলো শহরে, মফস্বলে কত ভালো ভালো বাড়িতেই না
থাকলি’।
নিজের মন মাঝে মাঝে নিজেকেই এরকম ধরণের কথা বলে।
কখনও ভাবি এই যে এত লিখছি এও তো বাইরে এসে একা থাকার ফল। একাকিত্ব কাটাতে কিছু
একটা করতে হত। কিছু বন্ধুর পরামর্শে ও নিজের সুপ্ত ইচ্ছে চরিতার্থ করতে শুরু করলাম
লেখালেখি। বেশিরভাগটাই শুরু করলাম ভ্রমণকাহিনী দিয়ে। একথা সত্যি যে বাইরে থাকার
কারণে লেখালেখিটাকে বেশ আপন করে নিতে শুরু করলাম। অনেকে আমার লেখা ব্যক্তিগত ভাবে
পছন্দ করেন। তারা জানিয়েওছেন। তাদের কাছে আমি চিরঋণী। এই তো সেদিন আমার এক মামা
বললেন ‘লেখালেখির জন্য নতুন নতুন প্লট কোথায় পাবে বল তুমি! লালমোহন বাবু কেন
ফেলুদা’র সাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত! শুধু লালমোহন নয়, অজিতবাবুও তো
ব্যোমকেশের সাথে ঝুলে থাকত সবসময়। কেন? বল কেন? আরে তুমি এই জীবন পেয়েছ। তোমার
লেখার হাত রয়েছে। তাকে কাজে লাগাও’। কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে সাথীহারা হয়ে, আত্মীয় ও
সন্তান-সন্ততি থেকে দূরে থাকতে থাকতে খুব খারাপ লাগে। যতই হোক রক্ত মাংসের শরীর
তো। মন বিচলিত হয়।
বাঞ্জারা জীবনে অনেক রকমের খেদ, আক্ষেপ তৈরি হয়
বিশেষত পরিবারের তরফ থেকে। আমি তো এখন আর জীবিত নই, বিবাহিত। তাই এই বিবাহিত জীবনে
পরিবার ছাড়া কাটানো খুব কষ্টকর বটে। এই কেউ অন্যরকম ভেবো না আবার। আমার থেকেও বেশি
কষ্টে আছে আমার পরিবারের লোকজন। তারা আমায় নিয়ে প্রতি মুহূর্তে খুব চিন্তিত থাকে।
যেহেতু আমি দূরে থাকি, বাইরে একা। আমিও মাঝে মধ্যে খুব বিচলিত হয়ে পড়ি আমার
সন্তান, স্ত্রী ও বাবা মায়ের কথা ভেবে।
এ তো গেল খেদ ও আক্ষেপের কথা। এর একটা পজিটিভ
দিকও আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি। কখনও এরকম ভাবি যে আমার জীবনের মোড়গুলো আমায় কেমন
নতুন নতুন রাস্তা দেখাচ্ছে, চেনাচ্ছে। জীবনে এক নতুন মানচিত্র তৈরি হচ্ছে আমার।
জীবনের প্রতিটা পলকে পলকে রোমাঞ্চ। মাঝে মাঝে বেশ লাগে।
বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের শেওপুর বলে একটি জায়গায়
পোস্টিং হয়েছে আমার। একদম নতুন জায়গা। নতুন কোম্পানি, নতুন লোকজন, নতুন
ম্যানেজমেন্ট। সবকিছুই নতুন তাই নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি এখন। আমাদের অফিসটা
শেওপুর জেলার অন্তর্গত ধোটি বলে একটি গ্রামে। একদম অজপাড়াগাঁ বলা যেতে পারে।
মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা, দুপাশে শুধুই ধান অথবা গম ক্ষেত। বিঘা বিঘা জমি পরে আছে
এই অঞ্চলে। বেশিরভাগটাই সরকারী জমি। এই পুরো অঞ্চলটাই চম্বল উপত্যকার মধ্যে। চম্বল
দস্যুদের কথা হয়ত অনেকেরই জানা আছে। আমি সবে নতুন। তাই কিছুই সেরকম জানিনা এখনও।
শুধু চোখের সামনে দেখতে পাই বড় বড় পাইপ। ইয়া বড় বড়। ইঞ্জিনিয়াররা তাদের মাপঝোঁক
করে বলে কত ডায়া, কত মিটার ইত্যাদি ইত্যাদি। তার আবার কত রকম নাম। MS PIPE, DI PIPE, HDPE etc. নামগুলোর
সাথে যে পরিচিত ছিলাম না তেমন নয়। কিন্তু এতটাও নয়। সরকারী ফাঁকা জমিতে জল সংশোধন
বিভাগ আমাদের কোম্পানিকে পাইপ রাখবার অনুমতি দিয়েছে। বড় বড় ট্রাক, লরিতে করে সেই
পাইপ এসে পড়ছে আমাদের অফিসের সামনে ধোটি গ্রামে। আপাতত সেই ফাঁকা জমিগুলোই ব্যবহৃত
হচ্ছে পাইপ রাখবার কাজে। সরকারী অফিস থেকে অনুমতি দিয়েছে আমাদের কোম্পানিকে সেই
জমি ব্যবহার করবার। আমাদের কোম্পানি এখানকার গ্রামে পাইপ লাইনের কাজ ও জল সরবরাহের
ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কখনও কখনও ফেন্সিং এর কাজ কিভাবে করে সেগুলোও
দেখছি। ধীরে
ধীরে একটা সাইট কিভাবে গড়ে উঠছে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে উঠছি আমি। এত কিছু বলার
বা লেখার উদ্দেশ্য একটাই। নতুন অভিজ্ঞতা পাঠকের সাথে ভাগ করে নেওয়া। আমার সহকর্মী
বা বন্ধুদের অনেকেই এই বাইরে থাকার বিষয় নিয়ে লিখতে বলত মাঝে মধ্যে। বিশেষত এই কন্সট্রাকসন
কোম্পানির সাইট লাইফ সম্পর্কে। তাই এই সামান্য কিছু। আরও অনেক কিছুই বলার বা লেখার
আছে। নিয়ে আসব না হয় আবার অন্য কোনও লেখাতে।
@ প্রেমাংশু.........

Comments
Post a Comment