তিরুপতিতে তিনজন – প্রথম পর্ব
হাতে সময় খুব কম। তাই
রুদ্ধশ্বাসে মাঞ্চেরিয়াল স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে ওরা তিনজনে। বিকেল পাঁচটা কুড়ি
মিনিটের দানাপুর পাটনা এক্সপ্রেস ট্রেনটা না মিস হয়ে যায়। এই ট্রেনে করে যেতে হবে
কাজিপেট স্টেশন। এই স্টেশনগুলো সব দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যে অবস্থিত।
কাজিপেট স্টেশন থেকে পরের ট্রেন আবার পদ্মাবতী এক্সপ্রেস রাত আটটা কুড়ি মিনিটে।
এখন যদি ট্রেন মিস হয় বা ট্রেন লেট করে তাহলে আর যাওয়া হচ্ছে না তিরুপতি। এরকমই
মনে হচ্ছে এখন ওদের তিনজনের। এই পদ্মাবতী এক্সপ্রেসে করে ওরা তিনজনে যাবে তিরুপতি।
গত দুবছর আগে ১৬.০৯.১৬ তারিখে ওরা তিনজনে তড়িঘড়ি করে একপ্রকার না খেয়ে না দেয়ে
বেরিয়ে পড়েছিল রুদ্ধশ্বাসে। সেই দিনটা ছিল বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন।
সময় রাত আঁটটা। দেবু খুব
মন দিয়ে তেলেগু ভাষায় ট্রেন আসবার সময় সারণী ও প্রচার শুনতে লাগল। অকুটি, রেন্ডু,
এরু, আরু, নাল্গু শব্দগুলো। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক। ওই নম্বরের ট্রেনটাই তো আসছে। দেবু
চেঁচিয়ে চকু দা’কে বলল – চকু দা রেডি হয়ে নাও। ট্রেন কিন্তু আসছে। নম্বরটা ভাল করে
খেয়াল কর। ট্রেন নম্বর ১২৭৬৪। ভাগ্যিস ১ থেকে ১০ সংখ্যাগুলো তেলেগুতে আয়ত্ত
করেছিলাম।
অত টেনশন করিস না। সংখ্যাগুলো
ইংরাজিতে আবারও শোনাবে। চকু দা বলল। স্টেশন থেকে কেনা খাবার গুলো ওরা এবার ব্যাগে
ঠিকঠাক করে ভরতে লাগল। ট্রেন তো প্লাটফর্মে ঢুকতে শুরু করেছে।
‘দেবু তুই সাইড লোয়ার, আমি
আপার আর পাল বাবু কে মিডিল বার্থ টা দিলাম’। চকু দা বলল। ট্রেন যেহেতু সকাল সকাল
তিরুপতি স্টেশনে পৌঁছবে তাই ওরা তিনজনেই খাবারগুলো বার করে খেতে আরম্ভ করল। রুটি,
একদম টকে ভরা সবজি আর দক্ষিণ ভারতীয় সন্দেশ। খাওয়া দাওয়া সাঙ্গ হলে দেবু নিজের
মুঠোফোনে ট্রেনের টাইম টেবিল টা দেখে নিল। হ্যাঁ ট্রেন আপাতত রাইট টাইমেই আছে। আরও
টুকটাক কথাবার্তা, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ করতে করতে তিনজনেই ঘুমের দেশে চলে গেল।
(২)
জানালার কাচের মধ্যে দিয়ে
গরম রোদের উত্তাপ মুখের মধ্যে লাগল দেবুর। তার মানে সকাল হয়েছে। ঘড়িতে ৬ টা বেজে
১৭ মিনিট। জানালাটা খুলে দিল দেবু। চলন্ত ট্রেনের মধ্যে থেকে বাইরের মনোরম দৃশ্য
দেখতে দারুণ লাগে। হঠাৎ করে সেই লোকটিকে দেখতে পেল দেবু। সাইড লোয়ারের একেবারে শেষ
বগিটাতে লোকটি বসেছিল, দেবুকে দেখতে পেয়ে টয়লেটের দিকটাতে চলে গেল। দেবুর কেমন যেন
মনে হচ্ছে লোকটা কাল মাঞ্চেরিয়াল স্টেশন থেকেই ওদের তিনজনের উপর ফলো করছে। উদ্দ্যেশ্যটা
যে কি সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। চকু দা’কে কিছুই বলা যাবে না। বললেই বলবে আমরা কি
একাই ট্রেনে চড়ছি, আর কেউ কি এক গন্তব্যে যেতে পারে না। পাল বাবু তো চুপটি করে বসে
ঝিমোচ্ছেন। ভদ্রলোক খুব একটা বেশি কথাও বলেন না। নিজের মনেই থাকেন। আসছে বছর
রিটায়ার করবেন। সুতরাং ওনাকে এ বিষয়ে কিছু না বলাই বোধহয় ঠিক হবে। তার থেকে বরং
চোখ কান খোলা রেখে চলাই ঠিক হবে। এই ভেবে দেবু জানালার মনোরম দৃশ্য দেখতে লাগল আর
সাইড লোয়ারের একদম শেষ বগিটাকে মানে টয়লেটের দিকটা চোখে চোখে রেখে চলল। কিছুক্ষণ
পর পালবাবু টয়লেট থেকে ফিরে এসে দেবুকে যেতে বললেন। দেবু আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে গেল
টয়লেটে। প্রাতঃকৃত্য, দন্তমার্জন ইত্যাদি শেষ করে যখন আসল তখন সকাল ৭টা। ট্রেন
একটি স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। চকুদা জিজ্ঞাসা করল - কোন স্টেশন রে দেবু? জানালা
দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেবু স্টেশনের নামটা দেখল ও বলল – “রানি............গু”
“ কি রানীগঞ্জ?”
“আরে না রেনিগুণটা” –
বলেই দেবু দেখল সেই অপরিচিত লোকটা শেষ বগির দরজা থেকে ওকে আবারও দেখছে। দেবু এবার
রেলের বগির কমন প্যাসেজ দিয়ে ওই লোকটার উদ্দ্যেশে এগিয়ে গেল টয়লেটের দিকে। না
লোকটাকে তো আর দেখা যাচ্ছে না। মতলব কি লোকটার? চকু দা কে কি বলবে ব্যাপারটা।
ভাবতে লাগল দেবু। এমন সময় দেবু দেখল চকু দা ওকে হাত নেড়ে ডাকছে চা খাবার জন্য।
দেবু ফিরে গেল ওর বসার সিটে। রেনিগুন্টা স্টেশনে গাড়ি প্রায় ৪৫মিনিট দাড়িয়ে রইল।
অবশেষে ওরা তিনজনে যখন তিরুপতি স্টেশনে পৌঁছল তখন সকাল ৮ টা বেজে গেছে।
দক্ষিণ ভারতে বিশেষত এই
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের বাস সার্ভিস বেশ ভালো। ওরা তিনজনে বাসে করে তিরুমালার দিকে
রওয়ানা দিল। তিরুমালা একটি ছোট্ট শহর যা কিনা পাহাড়ের উপর অবস্থিত। তিরুপতি থেকে
তিরুমালার দুরত্ব প্রায় ২৪-২৫ কিলোমিটার হবে। তিরুমালার উপরই তিরুপতি মহারাজের
আবাসস্থল। দেবু পাহাড়ি পথের ইউ টার্ন ও আঁকাবাঁকা পথ খুব পছন্দ করে। বাস যখন
পাহাড়ি পথে ইউ টার্ন নেয় তখন তার মধ্যে একটা ভয়মিশ্রিত ভাল লাগা থাকে। দেবু সেই
থ্রিলটাকেই খুব পছন্দ করে। বেশ লাগে ওর পাহাড়ি মনোরম আবহাওয়া। বাস যতই ওপরে উঠতে
শুরু করল শরীরের মধ্যে বেশ একটা শিরশিরানি ভাব অনুভূত হল দেবুর। আস্তে আস্তে
ঠাণ্ডা ভাবটা বেশ জোরাল হয়ে উঠল। সেপ্টেম্বর মাস, সেই কারণে ওরা কেউই কোন গরম
জামাকাপড় সঙ্গে আনেনি। শীত শীত ভাবটা তাই তিনজনকেই চেপে ধরল। দেবু এবং চকু দা
দুজনেরই কান যেন বন্ধ বন্ধ। দুজনেই কানে যেন কম শুনছে। একে অপরকে সে কথাই বেশ
জোরের সাথে বলল ওরা দুজনে। আসলে পাহাড়ি পথে উঠলে অক্সিজেনের তারতম্যের জন্য কানের
ভিতর একটা বদ্ধ বদ্ধ ভাব অনুভূত হয়। মনে হয় যেন কানে তালা লেগে রয়েছে। অবশ্য সেটা
খুব কম সময়ের জন্যই হয়ে ছিল। সকাল ৯টা ১০ মিনিট নাগাদ ওরা তিরুমালা বাস স্ট্যান্ডে
পৌঁছে গেল।
তিরুমালা শহরের একটি
বিশেষত্ব আছে। ওখানকার রাস্তাঘাট একদম ঝকঝকে তকতকে। নোংরা, আবর্জনা বলতে কোথাও
কিছু নেই। কাছাকাছি একটা চায়ের দোকানে গিয়ে ওরা প্রথমে চা খেল। চা খাওয়ার পর চায়ের
কাপ কু অভ্যাসবশত রাস্তায় ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারল না ওরা। দোকানি দেখিয়ে দিল পাশেই
রাখা একটি প্লাস্টিকের ডাস্টবিন। দোকানি এও বলল যে যদি কেউ ভুল করে চায়ের কাপ বা
অন্য কিছু রাস্তায় ফেলে তাহলে ওরা তাদের প্রথমে ডেকে দাড় করায় ও তীর্থযাত্রীদের
সামনেই ওরা নিজেরা সেটাকে স্বস্থানে রেখে আসে। অর্থাৎ ডাস্টবিনে ফেলে আসে ওদের
দেখিয়ে। এতে সত্যিই প্রকৃত চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিক্ষাটা দেওয়া হয়। আসলে মানুষের
প্রকৃত চেতনা বা চৈতন্যবোধ যদি সঠিক হয়ে যায়, তাহলে বোধহয় সবকিছুই আস্তে আস্তে
সঠিক পথে চলতে থাকে। চা খাওয়া শেষ হলে দেবু আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস লক্ষ্য করল
সেই দোকানির থেকে। চা শেষ করে দেবু এবং চকু দুজনেই সিগারেট কিনতে চেয়েছিল সেই
দোকানীর কাছ থেকে। তখন সেই দোকানী তার নিজের নাক ও কান দুটো ভালো করে মলা দিয়ে বলল
যে কোনপ্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্য অর্থাৎ পান, বিড়ি, গুটখাঁ, সিগারেট, মদ কিছুই
তিরুমালা শহরে পাওয়া যায় না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে শহরটা কতোটা সুন্দর হতে পারে।
দোকান থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে ওরা তিনজনে যখন মন্দিরের দিকে এগোচ্ছে, তখন পেছন থেকে
কে যেন দেবুর ডান কাঁধে হাত রেখে ডাকল ওকে।
- দেবু বাবু শুনছেন!
কিন্তু কে সেই ব্যক্তি?
নিয়ে আসব পরের পর্বে...............

Debu and Choku, Era ki imaginary character?? Naki amader e keu.
ReplyDeleteভাবো। ভাবা প্র্যাকটিস করো।
ReplyDelete