শিবুদা
এ কি ছবি দেখালে তুমি
আমায়! কি বলব বা কি লিখব তোমায় ঠিক বুঝতে পারছি না। ‘কণ্ঠ’ দেখবার পর কণ্ঠরুদ্ধ
মানে বাকরোধ হয়ে গেছে আমার। জানো এ ছবি দেখবার পর যখনই কেউ আমায় জিজ্ঞাসা করে যে
কেমন আছো, আমি তার উত্তরে বলি ‘লড়ে যাচ্ছি’। প্রকৃতি ও ঈশ্বরের কৃপায় কোনরকম
শারীরিক বা মানসিক বাধা আমার জীবনে নেই। তবুও জীবন যুদ্ধে মাঝে মাঝে যখনই মনে হয়
এই বোধহয় হেরে গেলাম, আমার দ্বারা আর বোধহয় কিছু হবে না, তখনই তোমার অর্থাৎ অর্জুন
মল্লিকের কথা মনে পড়ে। বাচিক শিল্পী অর্জুন মল্লিক। পেশায় রেডিও জকি। বউ বাচ্চা
নিয়ে এক সুন্দর মিষ্টি সংসার। কোন একদিন গলা থেকে রক্তক্ষরণের পর জানতে পারল যে
গলায় ক্যান্সার হয়েছে। কণ্ঠস্বর যার সম্পদ, সম্মান ও সম্বল তার ভয়েস বক্সটাই নাকি
বাদ দিতে হবে। ভয়েস বক্স বাদ যাওয়ার পর একজন বাচিক শিল্পীর বেঁচে থাকাটা অন্তরায়
হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়াকেই যদি বেঁচে থাকা বলা যেত তাহলে যে
জীবনটাই অন্যরকম হতো। শুনেছি তুমি এবং নন্দিতাদি এ ছবিটি তৈরি করেছ বিভূতি
চক্রবর্তী বলে একজন ক্যান্সার রোগীর কথা ভেবে। যার ভোকাল কর্ড ল্যারিঞ্জেকটমি অপারেশনের
মাধ্যমে ডাক্তার বাদ দিয়ে ছিলেন। কিন্তু ওকে থামিয়ে রাখা যায়নি, সমস্ত বাঁধা
অতিক্রম করে তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। কণ্ঠ চলে যাওয়ার পর তুমি অর্থাৎ অর্জুন
মল্লিক যেভাবে এক নিঃস্ব, রিক্ত স্বামী এবং বাবার চরিত্রে অভিনয় করলে তা এক কথায় অসাধারণ,
অভূতপূর্ব। বারবার মনে পড়ছে সেইসব দৃশ্য যখন এক কণ্ঠহীন বাবা নিজের একমাত্র সন্তান
ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছলেও(ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্যে) চিৎকার করে সতর্ক করতে
পারে না। স্ত্রী এর সঙ্গে কোনোভাবেই মানসিকভাবে একাত্ম হতে পারে না। ডিপ্রেশনের
চরম সীমায় পৌঁছে নিজেকে এক ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। খুব ভালো দেখিয়েছ কথা বলার বিকল্প
হিসাবে একটা স্লেট ও একটা মার্কার পেনকে। অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছ সেই দৃশ্য
যখন একজন বাচিক শিল্পী ঘেন্না স্বরুপ সেই স্লেট ও পেনকে বারবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
আবার সেটা বুকের কাছে তুলে ধরে সেই পেন দিয়ে লেখে ‘লিভ মি অ্যালোন’ অর্থাৎ ‘তোমরা
আমাকে একটু একা থাকতে দাও’। এরকম এক ডুবন্ত মানুষকে খুব ভালো পর্দায় এঁকেছ তোমরা
দুজনে। ভীষণ সাপোর্টিভ অভিনয় করেছে এসময় পাওলি দাম এবং অন্যান্যরা। কিন্তু বলতেই
হচ্ছে প্রথম অর্ধ যদি পাওলির হয় তো দ্বিতীয়ার্ধ জয়ার। জয়া এহসান ওরফে রোমিলা
চৌধুরী। পেশায় একজন স্পিচ থেরাপিস্ট। জয়ার উপস্থিতিতে ধীরে ধীরে কাটতে থাকে
দুঃসময়। দর্শকের দুঃখী মন ধীরে ধীরে আলোর আভাস পায় যেন। আমি নিজে তো পেয়েছি আলোয়
আলোয় ঢাকা সেই দৃশ্য। ঢেঁকুর তুলে যে জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করা যায় এ বোধহয় মানুষ সর্বপ্রথম
দেখছে কোনও সিনেমায়। ঢেঁকুর তুলে কথা বলা অর্থাৎ ইসোফেগাল ভয়েসে কথা বলা মানুষ কি
আগে কোনোদিন ভেবেছিল! আমি সাধারণ মানুষের কথা বলছি। আমরা যারা মোটামুটি ভালোভাবে
বেঁচে আছি। জানতাম না। স্পিচ থেরাপির এ দিকটাও যেন আলোয় ফেরা। মনে পড়ছে অনুপম রয়ের
আলোতে আলোতে ঢাকা গানটির কথা।
দাদা ল্যারিঞ্জেকটমি নিয়ে
আগে কোনও সিনেমা হয়েছে কি? আমার জানা নেই। তবে একটা কথা বলতে পারি এ ছবি শুধুমাত্র
বাচিক শিল্পী বা ক্যান্সার পেশেন্টদের জন্য নয়। এ ছবি সেইসব জনগণের ছবি যারা
প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে কোনও না কোনও ভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এ ছবি
অনুপ্রেরণা জোগাবে সেসব মানুষদের যারা হাল ছেড়ে না দিয়ে বরং জোরে জোরে কণ্ঠ ছাড়ার
কথা বলে। তোমার এবং নন্দিতাদির ছবিতে একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে। এতে কার কি
হয় জানিনা তবে আমার মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়। যার উদাহরণ প্রাক্তন, বেলাশেষে, পোস্ত
এর মতন ছবিগুলো। জানি হয়ত একটু মেলোড্রামাটিক, কিন্তু তবুও দিনের শেষে মানুষ সেই
ফিল গুড ফ্যাক্টরটাই বোধহয় আশা করে।
শেষমেশ একটা কথা বলে এই
চিঠিটা শেষ করছি। অর্জুনের প্রতি রোমিলার দুর্বলতা বা প্রেমে পড়া দেখানোটা খুব
জরুরী ছিল কি? না হলেও বোধহয় চলতো! জানি, বুঝি, মানুষ প্রফেশনাল হলেও আসলে তো একটা
রক্ত মাংসের, তার উপর একজন নারী, মমতাময়ী। কিন্তু আজকের নারীদের টিমস্পিরিট নাকি
খুব মজবুত। ছবির এই শেষ জায়গায় একসাথে পাওলি অর্থাৎ অর্জুনের স্ত্রী পৃথা এবং রোমিলার
ক্লোজ শটের কান্নার দৃশ্য একই সাথে ভীষণ মানবিক এবং প্রেমের।
দুর্দান্ত শিবুদা তোমাকে
এবং নন্দিতাদিকে। আগামী দিনে আবারও এরকম ফিল গুড ছবি পাবো তোমাদের কাছ থেকে এই আশা
রাখি।
ধন্যবাদান্তে,
প্রেমাংশু।

Comments
Post a Comment