অনেককাল
বাংলার বাইরে এক বাঙ্গালী। তার মনেরই কিছু সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভাবনা আজ বয়ে চলবে এই
পাতায়। কিছু না পাওয়া বেদনা বা শূন্যতা এখন বয়ে চলেছি অনেকদিন ধরে। বাংলার বাইরে
বাঙালির সুখানুভুতির সাথে সাথে কিছু দুঃখানুভুতিও আছে। বাঙালি বন্ধু রয়েছে
আশেপাশে, কিন্তু সেই চায়ের দোকানের বাঙালি আড্ডা! টানে মনটাকে ভীষণরকম। এক খুব
সুন্দর সকাল। ফুরফুরে মিঠে হাওয়া সাথে সোনালী রোদ। দোকানী মাটির উনুনে হাওয়া করে
যাচ্ছে ক্রমাগত। গরম ধোঁয়া আস্তে আস্তে মিলে যাচ্ছে রাস্তায়, শহরে, আকাশে, বাতাসে,
আশেপাশের গলিতে, বাড়িতে। মনে পড়ে মিঠে সকালের রাস্তায় আঙ্গুলের সাথে আঙ্গুল ছুঁয়ে
লম্বা হেঁটে চলা। দুধের দোকান। হরিণঘাটার দুধ, কার্ড দেখিয়ে সকাল সকাল ঘুম ঘুম
চোখে নিয়ে আসা। কখনও পড়ন্ত বিকেলে আলতো কাঁধে হাত ও ঠোঁটে নিকোটিন। গরম পোড়া ভাঁড়ে
চায়েতে আলতো চুমুক। চা, ঠোঁট, নিকোটিন সব যেন কেমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকত একসময়।
আষাঢ় মাসের হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এক ছুটে বাড়ি ফিরে আসা পাশের পাড়ার ফুটবল
মাঠটা থেকে। ‘ছাতা নিয়ে যাস না কেন’? এই বাক্য প্রায় বেদ বাক্য হয়ে যাওয়া জীবনে,
যদিও ছাতা সঙ্গী হয়েই ছিল বেশ কিছুকাল। শ্যামবাজার, বাগবাজার, উত্তর কোলকাতার
অলিগলি, সাইকেল নিয়ে দে ছুট রিকশায় বসা সুন্দরী মেয়েটাকে তাক করে। মাঝে মাঝে ওরা
ফিরে ফিরে আসে মনের গহীন পথে। স্মৃতিমেদুরতায় ভর করেই সময় কাটতে থাকে। ‘প্রাক্তন’
সিনেমার সেই লাইনটা খুব মনে পড়ে। ‘আমাদের যে দিন গেছে, শুধুই কি গেছে, কিছুই কি
বাকি নেই আর?’ কোলকাতা, কোলকাতার বাংলা গান, বাংলা ব্যান্ড, রক সঙ্গীত, অঞ্জন,
সুমন, রুপম, নচিকেতা সবকিছু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। একটা গান মনে পড়ে গেল। ‘যাচ্ছে
বদলে যাচ্ছে আমার সময়’। বোধহয় নীল দত্ত বা অঞ্জন দত্তের গান। ছবির নাম ম্যাডলি
বাঙ্গালী। সত্যিই বদলে গেছে এবং যাচ্ছে হু হু করে আমার সময়। যদি ফিরে যেতে পারতাম,
কি ভালই না হতো! গীটারের কর্ড গুলো যেমন সুর বদলাতে থাকে ঠিক সেরকম ভাবে বদলাতে
থাকি আমরাও। পার্থক্য শুধু একটাই। অন্তরার সুর বারবার মুখরায় এসে মিলিত হয়। কিন্তু
জীবনের অন্তরা ও মুখরার মিল খুব কম হয় বোধহয়। নাকি কোনোদিন হবে, আমি হয়তো এখনও
বুঝে উঠতে পারছি না। তাই মাঝে মাঝে এক দুঃখ বিলাসী মানুষ হয়ে যাই হঠাৎ হঠাৎ।
কোলকাতা
কর্পোরেশন-এর কলের জল, টালির চাল, চিলে কোঠা, চড়াইয়ের বাসা, বাড়ির মাঝখানে উঠোন,
এরা সব কোথায় যেন হারিয়ে গেল! মায়ের সেই ডাক ‘বাবু খেতে আয়, ভাত বেড়েছি’। গরম ভাত
সাথে আলু, কাঁচা লঙ্কা ও লুকিয়ে আনা পেঁয়াজ। মিটার বক্সের ঘরের চালে গজিয়ে ওঠা
মাধবীলতা গাছ, শীতের সকালে চাঁদর মুড়ি দিয়ে বারান্দার কোণে এক ফালি রোদ, সুপ্রিয়র
বাড়ির ছাদ ও সেখানে আড্ডা। শুধু নিছক আড্ডা নয়, ক্যারাম ও সেটা নিয়ে নানা মুনির
নানা ব্যারাম, কাকিমার হাতের চা, কখনও হাতে বানানো সুস্বাদু মিষ্টি, চকোলেট, কেক, পিঠে
পুলি কত কি! বান্টি জমিয়ে রাখত আমাদের সকলকে। কখনও রাজনীতি, কখনও ফুটবল, ক্রিকেট,
তাস, দাবা অথবা স্কুলের রাগী মাস্টারদের নিয়ে মস্করা। জীবনটা সত্যিই খুব অন্যরকম
ছিল। একদিন প্রযুক্তি এল আমাদের সবার ঘরে। দ্রুত বদলে দিতে থাকল সবকিছু। প্রথম
প্রথম বুঝতে পারিনি, কতোটা বদলাতে থাকছি আমরা নিজেরা, আমাদের সম্পর্কেরা। পারিনি
বুঝতে, পারিনি। যে প্রযুক্তির হাত ধরে একদিন সুপ্রিয়র বাড়িতে আমি, বান্টি, গৌতম, গীটার
নিয়ে গান করে সেই গান ওর কম্পুটারে সেভ করে রাখলাম, সেই কম্পুটার ওকে নিয়ে গেল
আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে। চলে গেল ও আমাদের ছেড়ে, কেরিয়ার তৈরি করতে। তারপর
থেকে শুধুই চাকরি, চাকরি আর চাকরি। আমরাও তাই। একে অপরের থেকে হারিয়ে গিয়ে নিজেরাও
নিজেদের থেকে হারিয়ে গেলাম। যান্ত্রিক হয়ে গেছে আজ আমাদের জীবন। খাওয়া, ঘুম, মৈথুন
ও চাকরি। সাথে আরও আরও বেশি পাওয়ার জন্য ঘোড়দৌড়। টার্গেট, টার্গেট পূরণই এখন আসল
লক্ষ্য। কি করছি, কেন করছি, কার পেছনে ছুটছি তা আমরা নিজেরাই জানিনা। কেউ হয়তো
বলবে সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্ম কে একটা ভিত তৈরি করে দিচ্ছি। কিন্তু শুধুই কি
তাই, নাকি একটা ভুল মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা প্রতিনিয়ত। ভাবায় আমাকে মাঝে মাঝে
এসব।
কোচিং
ক্লাসের সেই দিনগুলো ফিরে ফিরে আসে মাঝে মাঝে। ক্লাসে একসাথে অনেক ছেলেমেয়ের দল।
হাসি, ঠাট্টা, হইহুল্লোড়। কাউকে সাময়িক ভালো লাগলে মনে হতো এর জন্যে বোধহয় জীবন
দেওয়া যায়। আসলে মানুষ যে ভালো ও মন্দ মিশিয়ে সেটা ভাববার অবকাশ দিতাম না আমরা মনে
মনে। কোনও একজনকে ভালো লাগলে তার সবটাই ভালো লাগতে শুরু করত। কি এক মায়াবিক টান
থাকত তখন মনে মনে। নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তোলবার প্রচেষ্টাও ছিল সবসময়। সেলুন থেকে
নতুন হেয়ার কাটিং করিয়ে এনে বারবার আয়নার সামনে চলে যাওয়া, সদ্য শেখা সিগারেটে টান
লুকিয়ে লুকিয়ে। ‘দেখত ধোঁয়াটা রিং হয়ে বের হচ্ছে কিনা ওই নায়ক সিনেমার উত্তম
কুমারের মতো’ এই প্রশ্ন মাঝে মাঝেই বন্ধুদের মধ্যে ঘোরাফেরা করত। বই ও খাতার মাঝে
প্রেমপত্র এ তো হরবখত দেখতাম, অথবা শুকিয়ে আসা গোলাপের পাপড়ি, দেব দেব করেও দিয়ে
উঠতে পারল না আমারই মতন কোনও এক ক্যাবলা প্রেমিক। উপায়! তাহলে কি এ জীবনে আর বলা
হয়ে উঠবে না ওকে? উঁহু, সামনেই তো সরস্বতী পূজার ফাংশন পাড়ার ক্লাবে। সুতরাং গানের
লড়াইয়ের প্রতিযোগিতা ও তার মন জয় করবার আবারও এক শেষ চেষ্টা। কিন্তু যার জন্যে এত
আয়োজন সে হয়ত আরেকজনের ঘরণী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এই ভাবেই কখন যে কেটে গেল যৌবনের
শুরুর দিকটা। বোঝা গেল না। ভালো করে জানতে জানতে, বুঝতে বুঝতেই সময় গেল হারিয়ে।
মহাকাল
পাতা উলটাচ্ছেন। ব্যর্থ প্রেম, রাগ, অভিমান, বেকার সময় কাটানো বাড়িতে এবং রোজ রাতে
বিছানায় ফ্রাসট্রেসন বের করা। নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় পাগলের মতন আচরণ
নিজের সাথে ও আরও পাঁচজনের সাথে। এমন দিনও কেটে গেছে মহাকালের দয়ায়। কিন্তু তবুও
মাঝে মধ্যে মনে হয় ওই না পাওয়া দিনগুলি বোধহয় আজকের থেকে ভালোই ছিল। ছিল অফুরন্ত
সময়। যেমন খুশি, যা খুশি করবার স্বাধীনতা ছিল। সিনেমা, বইপড়া, বন্ধুর মেসে গিয়ে
সামান্য নেশা। বাড়ি ফেরার সময় বুকে ঢিপঢিপ, গন্ধ পাবে নাতো! বাঙ্গালীর মধ্যবিত্ত
এই সাদামাটা জীবনটা বেশ ভালোই কাটল। এখন মনে হয় এই না পাওয়া গুলো ছিল বলে আমি আজ
অনেক কিছুই পাচ্ছি। বেশ ভালোই আছি। তবে স্মৃতি কখনও সুখের কখনও বেদনার। এ থাকবে,
চলবে, চলতেই থাকবে আজীবন।
Premangshu............
Comments
Post a Comment