Skip to main content

রমিতের ডায়েরি


টেবিলের পাশে থাকা বইয়ের তাকের দিকে তাকাল ও। আজ কতদিন পর! অনেক ধুলো জমে গেছে বইয়ের খাঁজে খাঁজে। স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় এই তাকটাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল ও। বড় ভালবাসত ও এই জায়গাটাকে। টেবিল তার একপাশে খোলা জানলা, জানলা দিয়ে একচিলতে আকাশ, তার মধ্যে দিয়ে কখনও সখনও মিঠে রোদ। টেবিলটার অপর দিকে এই বইয়ের তাকটা। আজও একইরকম আছে ওরা। বইগুলো, পেনগুলো, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্স, আঁকার খাতা, বেশ কিছু পোষ্ট কার্ড সাইজের ছবি। ফিল্ম স্টারদের। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে আমীর, সল্মন, শাহরুখ, কাজল। নায়িকাদের বেশ কিছু উগ্র ছবিও তাতে ছিল। বোধহয় এখনও আছে। কিন্তু সবেতে ধুলো জমে গিয়ে সবার বয়স যেন অনেক অনেক বেড়ে গেছে। অনেক বুড়ো হয়ে গেছে ওরা। বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, ছবি এবং বেশ কিছু হাতে লেখা চিঠি, ওরা এখন শুধুই স্মৃতি বহন করে চলেছে। সত্যিই সময় একটা জড় বস্তুর উপরও কতখানি প্রভাব বিস্তার করে। যখন কোনও জড় বস্তু ধরে নেওয়া যাক একটা কলম, কিনে আনা হল, তারপর সেটি দিয়ে লেখা হল এবং কিছুদিন পর সেটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রইল। বেশ কিছুদিন অতিক্রান্ত হলে তারপর সেই কলমটির দিকে তাকালে মনে হয়, আমি একদিন এই কলমটি দিয়ে কত কি’না লিখেছি। ঠিক আজ যেমন মনে হচ্ছে ওর। আজ যখন মাঝে মাঝে ও যায় সেই টেবিলের পাশে থাকা বইয়ের তাকের দিকে তখন পুরনো অনেক স্মৃতি ওর মনে ভিড় করে আসে। বইয়ের তাকে খুঁজে পায় সেই লাল রঙের ডায়েরিটা। সেই ডায়েরিটা নিয়ে ওর বাবা মা কত কি ভেবেছিল কে জানে! হয়ত ভেবেছিল ছেলে বোধহয় প্রেম ট্রেম করছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। বয়স মোটে ২০ কি ২১, এই বয়সে কোথায় মন দিয়ে লেখাপড়া করে কেরিয়ার গড়ার কথা ভাববে, তা না করে প্রেম করা! হয়ত এরকমই কিছু ভেবেছিল। সেইজন্যেই না রবিবার করে ওর ডায়েরি হাতে নিয়ে ঘুরতে বেরনো বন্ধ করেছিল। বলেছিল বিকেলে বেরিয়ে অত রাত করে না ফিরতে। না বেরোলেই তো হয়। এই গানের দল কি ভবিষ্যতের অন্নসংস্থান করবে। এইসব তো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। গরীব বাড়িতে এইসব স্বপ্ন দেখা পাপ। আখেরে লাভ কিছুই হয় না। বৃথাই সময় নষ্ট। 

আসলে এই লাল ডায়েরিটায় ছিল বেশ কিছু প্রেমের গান, বিপ্লবের গান, উত্তরণের গান, জীবনের গান। ওর বাবা মা তখন বোঝেননি। পুরুষ মানুষের গানবাজনা শিখে কি হবে! মেয়ে হলে না হয় কথা ছিল। একটু আধটু গানবাজনা শিখে রাখলে বিয়ের সম্মন্ধের সময় সুবিধে হয়। ছেলেদেরতো সে সমস্যা নেই। আর তাছাড়া ছেলেরা বিয়ে করে। মেয়েদের বিয়ে হয়, মানে মেয়েদের বিয়ে দিতে হয়। এই ছিল ওর পরিবারের ধ্যানধারণা। প্রাচীন, গোঁড়া ও রক্ষনাত্বক এই প্রচলিত ধ্যানধারণাকে পছন্দ করত না ও। কিন্তু চেষ্টা করে ভাঙতেও পারেনি। বলা যেতে পারে চায়নি। স্বভাবে নির্বিবাদী হলে আখেরে তার দাম যে ভবিষ্যতে গিয়ে দিতে হয় তা আজ বেশ বুঝতে পারছে রমিত। আজ্ঞে হ্যাঁ রমিত। এটা রমিতের গল্প।


                                  (২)

ছোটবেলা থেকেই গানবাজনা বেশ পছন্দ করত রমিত। রেডিও, টিভি, টেপরেকর্ডারে গান শুনলে ওর গলা দিয়েও গুনগুণ করে সুর বেজে উঠত। সেই অর্থে গানবাজনা না শিখলেও ওদের একান্নবর্তী পরিবারে একটা গানবাজনার পরিবেশ খুব সামান্য হলেও ছিল। পিসির ছিল একটা হারমোনিয়াম, কাকার ছিল তবলা। এছাড়া বাড়িতে মাঝে মাঝে কীর্তন গানের আসর বসতো বলে শ্রীখোল, করতাল, বাঁশি ইত্যাদিও ছিল। এছাড়া আর একটা চড়া সুরের হারমোনিয়ামও ছিল।
সাত সুর অর্থাৎ সা রে গা মা পা ধা নি সা এটা মাঝে মাঝে বাজিয়ে গলা সাধত রমিত। কখনও বা পিসির সরগমের খাতা দেখে কোনও গান হারমোনিয়ামে তোলার চেষ্টা করত। কিন্তু যেকোনো শিক্ষাগ্রহণ করতে গেলে প্রথমেই দরকার এক সঠিক গুরু, তারপর প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ। পরিবেশ সঠিক হলে ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় মানুষকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করে। তবলার বোলগুলোও ভালোই আয়ত্ত করেছিল রমিত। দাদরা, কাহারবা, ত্রিতাল, ঝাঁপতাল ইত্যাদি তালগুলো বেশ ভালোই বাজাত। কোন গান যা কিনা দাদরা তালে বাজবে সেটা আগে থেকে একটু বলে দিলে দিব্যি গানের সাথে বাজাতেও পারত। কিন্তু কোন শিক্ষাই যে ঠিক মতো শুরু করতে পারেনি। গাইয়ে বাজিয়ে হওয়াটাও তো আর মুখের কথা নয়। এ যে সাধনা। দেবী সরস্বতীর বন্দনা, আরাধনা। কসরত না করলে ফল আসবেই বা কোথা থেকে। ছোটবেলায় ফটোতে দেবী সরস্বতীর ছবি দেখত। বীণাবাদনরত দেবী। অথবা একটু আধুনিক আঙ্গিকে তানপুরা নিয়ে দেবী। খুব পছন্দ করত তানপুরা নিয়ে ভৈরবী সুরের সাধনা। টিভি রেডিওতে বেশ কয়েকবার শুনেওছে তানপুরার সাথে শিল্পীর গলা সাধবার ব্যাপারটা। যে কোন শিল্পী তানপুরার সাথে গলা সাধলে কেমন যেন মগ্ন হয়ে শুনত রমিত। শিল্পীর কণ্ঠস্বরের সাথে তানপুরার সুর যেন এক অপূর্ব মূর্ছনা তৈরি করত রমিতের মনকে। ওর বাড়িতে একটা তানপুরাও ছিল। ঘরের এক কোণে সেটা ঝুলকালি মেখে ধূলিধূসরিত অবস্থায় অপাঙতেও হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছে অনেক অনেকদিন। ছোটবেলায় একদিন সাহস করে রমিত তানপুরাটাকে একটা ঘরের মধ্যিখানে নিয়ে এসে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে সুন্দর করে পরিস্কার করে। ঝুলকালিগুলো পরিস্কার করায় খুব সুন্দর দেখায় তানপুরাটা। কিন্তু বুঝতে পারে ও যে তানপুরার তার যেন সঠিক সুরে নেই। তারের বাঁধনও বেশ আলগা হয়ে গেছে। ঠিক যেমন ওদের পরিবারের বাঁধন বেশ আলগা লাগত ওর। সেইসময় হঠাৎ করেই ওর ঠাকুমা বৌমা ও বৌমা বলে সারা বাড়ি ঘুরে চিৎকার শুরু করে। এই আচরণে বেশ ভয় পেয়ে যায় রমিতের নির্ঝঞ্ঝাট, নির্বিবাদী ও সুমিষ্ট স্বরের অধিকারিণী মা।
‘রমা কেন হাত দিয়েছিস তানপুরাতে? আমি না তোকে বারণ করেছি কতবার!’ মায়ের সামনে মাথা নিচু করে চুপটি করে দাড়িয়েছিল ছোট্ট রমা। মায়ের আদরের রমা। কখনও কখনও রমি। তারপর থেকে আর কোনোদিন হাত দেয়নি রমিত ওই তানপুরাতে। শুধু জানলা দিয়ে তানপুরাটাকে খুব করুন ভাবে দেখত। মা পরে বলেছিল – ‘যদি তোর বাবা কোনোদিন তোকে এসব গানবাজনার যন্ত্রপাতি কিনে দিতে পারে তাহলে বাজাস, না হলে নয়’।
‘না হলে নয়?’ এই চিন্তাতে রমিত একটু বড় হয়ে ভেবেছিল যে সে নিজেই না হয় সামান্য কিছু কিছু করে পয়সাকড়ি জমিয়ে একটা হারমোনিয়াম বা তবলা বা তানপুরা কিনে ফেলবে। তারপর না হয় ভালো কোন গুরুর থেকে তালিমও নেবে। কিন্তু বিধি বাম।
                                  (৩)

কথায় আছে সময় বহিয়া যায় স্রোতের ন্যায়। রমিতের জীবনেও অনেক সময় হু হু করে বয়ে যায়। কখনও সখনও দমকা বাতাসও আসে জীবনে। আসে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত। কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও একটা সুপ্ত বাসনা ছিল সৃষ্টিশৈলী কাজের উপর। যে কোনরকম সৃষ্টিশীল কাজই ওর খুব পছন্দের। হতে পারে তা গানবাজনা, অভিনয়, নাঁচ বা অঙ্কন। ছোটবেলায় বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন ক্লাব থেকে অনেক অনেক পুরস্কার জিতেছিল রমিত। স্কুলের কর্মশিক্ষা ক্লাসে কাগজের ফুল, মাটির তৈরি আম বা মোমের পুতুল এসব নিজে নিজে বানিয়েওছে প্রচুর। সায়েন্স একজিবিসনে বালি দিয়ে বানানো পিরামিড তার পাশে রাখা মমি, হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার নকশা এগুলো ছিল ওর সখের কারুকাজ। একবার একটা পুরনো ইটকে ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কেটে কেটে এক মুখাবয়ব তৈরি করবার চেষ্টা করেছিল। তবে তা মানুষের মুখের বদলে কোন এক কিম্ভুতকিমাকার প্রাণীর মুখ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

মানুষের মুখ। মানুষের মুখের প্রতি এক সুতীব্র আকর্ষণ বোধ করত রমিত। মুখ আর মুখোশের পার্থক্য প্রথম প্রথম বুঝত না বলেই, মানুষকে চেনার জন্য, মানুষকে বোঝার জন্য মানুষের চিন্তাকে মাঝে মাঝে পড়বার চেষ্টা করত। নিজেকে মাঝে মধ্যে থট রিডার মনে করত। যার জন্য একটা সময় প্রচুর পোর্টেট বানাবার নেশা চেপে গিয়েছিল ওর মধ্যে। বিভিন্ন মানুষের পোর্টেট বানিয়ে তার সম্পর্কে চিন্তা করা। সেই মানুষটার ভাবনা কি সেটা সম্পর্কে ভাবতে খুব ভালবাসত রমিত। যেমন ধরা যাক নেতাজী সুভাষের মুখটা একদিন এঁকে ফেলল রমিত। এবার সেই ছবি দেখে নেতাজির মনের অবস্থাটা বোঝবার চেষ্টা করত। কখনও সখনও লিখেও ফেলত সেগুলো।  
গল্পের বই পড়বার পর সেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের ছাপ পড়ত ওর নিজের চরিত্রের মধ্যে। রমিত এ নিয়ে পরবর্তী কালে বহুবার ভেবেওছে। এটা কি ওর কোন মানসিক ব্যাধি!  গল্প বা সিনেমার চরিত্রগুলো ওকে মাঝে মাঝে ভীষণ আচ্ছন্ন করে ফেলত। তা সে ফেলুদাই হোক বা ব্যোমকেশ বা শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত। সেই চরিত্রগুলো দেখবার পর বা জানবার পর সেটা হয়ে ওঠা ছিল ওর মধ্যেকার একটা অভ্যাস। মনে মনে যেন সেই ব্যক্তি হয়ে ওঠা।

শিল্পসত্তা মানুষের ভেতর থাকলে তা যেন তেন প্রকারেন প্রকাশ হতে চায়। সেই কারণেই হয়ত স্নাতক প্রথম বর্ষ পড়বার সময়ে ওর এক বান্ধবী ওকে সেই গানের দলের সন্ধান দেয়। রমিতের সেই বান্ধবী মধুমিতা রমিতকে বেশ কয়েকবার গান করতে দেখেছে পাড়ার সরস্বতী পুজোর  অনুষ্ঠানে। দু একবার কোচিং ক্লাসের আড্ডায় গান গেয়ে মাতও করে দেয় রমিত। তখনই মধুমিতা একদিন রমিতকে অনুরোধ করে সুমনকাকুর গানের দলে যাওয়ার ব্যাপারে। রমিত জিজ্ঞাসা করেছিল –

‘তা তোদের এই সুমন কাকু বিনা পারিশ্রমিকে গান শেখাবেন কেন?’
‘আসলে গান শেখানো ঠিক নয় জানিস। ব্যাপারটা হল সমবেত সঙ্গীতে ওর কিছু কচিকাঁচা ছেলেমেয়েদের দরকার। এই আমাদের মতো যাদের গলায় গানের সুর টুর আছে। তোর তো রয়েইছে। কাকুর হয়ত তোর গান ভালো লাগতেও পারে। তাই বলছি একবার না হয় চল’।
‘আচ্ছা এই সমবেত সঙ্গীত যেটা বললি সেটা ঠিক কি?’
‘তুই ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ারের নাম শুনেছিস?
‘না’।
‘মূলত রুমা গুহ ঠাকুরতাই এর প্রধান। তবে উনি সলিল চৌধুরি এবং সত্যজিৎ রায়ের সাহায্য নিয়েছিলেন এই ইয়ুথ কয়ার প্রতিষ্ঠা করবার সময়। কয়ারের বাংলা অর্থ হল সমবেত। মানে যেকোনো একটা গান সেটা প্রেমের গান হতে পারে, গণনাট্য সঙ্ঘের বিপ্লবের গান হতে পারে, কিংবা রবি ঠাকুরের গানও হতে পারে। সেই গানে একজন হারমোনিয়াম বা পিয়ানো বাজিয়ে লিড করবেন আর বাকিরা তার সাথে গলা মেলাবেন। সেই জন্য সুর, তাল, লয়ের একটু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন’।
‘আমার তো ওসব জ্ঞান নেই। আমি কোন যন্ত্র বাজাতেও জানি না’।
‘তোর গলায় সুর তো আছে। চল না একবার। ভালো লাগলে থাকবি, না হলে চলে আসবি’।
‘সপ্তাহে কতদিন করে তোরা যাস ওখানে?’
‘একদিন, রবিবার করে। সন্ধ্যাবেলা। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। চল চল নতুন কোনও ভালো বান্ধবীও জুটে যেতে পারে। ও আচ্ছা, ভালো কথা তোকে তো বলা হয়নি, তোর সেই প্রথম ক্রাশ শর্মিষ্ঠা সেও কিন্তু আছে ওখানে’।

‘উপরি পাওনার লোভ দেখাচ্ছিস বল?’ 


                                  (৪)

বলেছিল বটে রমিত। কিন্তু, শর্মিষ্ঠার প্রতি সেই টানটা ওর মনে হয় আজও আছে। তখন তো ছিলই। প্রচুর প্রচুর পরিমাণে। উচ্চমাধ্যমিক পড়বার সময়ে ইংলিশ কোচিং ক্লাসে রমিত শর্মিষ্ঠাকে প্রপোজ করে বসে। একটা নিউ ইয়ারের গ্রিটিংস কার্ডের মধ্যে একটা ছোট্ট চিঠিতে নিজের মনের কথা লিখে পরিশেষে লিখেছিল
-------- ইতি তোমার পাগলপ্রেমী।।

‘এসব কি লিখেছিস তুই? পাগলপ্রেমী?’ এই বলে সেই গ্রিটিংস কার্ড সমেত চিঠিটা ফেরত দিয়েছিল শর্মিষ্ঠা। রমিতের হাতে। একদম হতচকিত হয়ে গিয়েছিল রমিত সেই মুহূর্তে। ‘আর কখনও কোনোদিন আমাকে এমন ধরণের প্রস্তাব দিবি না কিন্তু, এই আমি বলেদিলাম’। বড় ব্যাথিত হয়েছিল সেদিন রমিত। ভগ্নহৃদয়ে নিঃস্ব হয়ে গঙ্গার ঘাঁটে গিয়ে একা একা চুপচাপ বসে ছিল অনেকক্ষণ। তারপর সেই কার্ড সমেত চিঠি গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে আর কোনোদিন ও নিজে থেকে শর্মিষ্ঠার সঙ্গে কোনও কথাই বলবে না। বলেওনি কোনও কথা তারপর থেকে প্রায় একবছর।

একবছর পর স্যার একবার ওনার জন্মদিনে ওদের ব্যাচের প্রত্যেককে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। ততদিনে ওরা পাশ টাস করে গেছে, কোচিং এর পাটও চুকে গেছে।  গিয়েছিল রমিত সেখানে আর ঘরে ঢোকবার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে থেকে ‘ভালো আছিস’ বলে সম্বোধন। এবারেও সেই হঠাৎ করে হতচকিত অবস্থা রমিতের। তবে একটা সূক্ষ্ম হাসির ঝলক দিয়েছিল দুপক্ষই একে অপরকে। বেশ কিছুক্ষণ আবেগঘন অবস্থায় তাকিয়েছিল শর্মিষ্ঠা রমিতের দিকে একদম সরাসরি। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল রমিত। কি যে হচ্ছিল তখন ওর মনের ভেতর। একটা আনন্দের ঝড় বয়ে চলছিল যেন। কিছুতেই তাকাতে পারছিল না শর্মিষ্ঠার দিকে সরাসরি। অথচ ও জানত শর্মিষ্ঠা মাঝে মাঝেই ওর দিকে তাকাচ্ছে। কিছু কি বলতে চেয়েছিল ও রমিতকে। তা আজও জানে না রমিত। হয়ত কিছুই নয়। সেদিনকার এই ব্যবহারটা নিয়ে শর্মিষ্ঠার মনে হয়ত কোনরকম অনুশোচনা হয়ে থাকতে পারে। অভিমানী রমিত অনেকবার ভেবেছে কেন, কেন একবারের জন্য শর্মিষ্ঠা নিজে থেকে এসে কিছু বলল না। কিছু তো একটা বলতে পারত! পরে বুঝেছিল যে ওর নিজেরই এগোনো উচিত ছিল। ‘ভালো আছিস’ কথাটাই যে একটা ইঙ্গিত। এটা বুঝতেও কি অনেক সময় নিয়েছিল রমিত?

এরপর কালের নিয়মে অনেক সময়ই এগিয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে, দোকানে কখনও সখনও দেখা হয়েছে দুজনের কিন্তু খুব সাধারণ সৌজন্য বিনিময় ছাড়া আর কোনও কথা এগোয়নি।

মধুমিতার সাথে একদিন সুমনকাকুর বাড়ি গিয়েছিল রমিত। পরিচয় হয়েছিল সবার সঙ্গে। নতুন করে আবার সাক্ষাৎ হয়েছিল শর্মিষ্ঠার সঙ্গে। গানের ক্লাসে এক কোণে বসে আছে রমিত। একবার দেখতে পেল মধুমিতা আর শর্মিষ্ঠা দুজনে মিলে খুব হাসাহাসি করছে। ওর দিকে তাকিয়ে। আচ্ছা শর্মিষ্ঠাই কি মধুমিতাকে বলে এই গানের ক্লাসের সন্ধান দিয়েছে রমিতকে! হতেও পারে। তবে এর সদুত্তর রমিত আজও পায়নি। বেশ কয়েকটা সপ্তাহ বলা যেতে পারে বেশ কয়েকটা মাস রমিত সেই গানের দলে যুক্ত থেকে গানগুলো ভালোই আয়ত্ত করেছিল। কবি নজরুলের গান, সলিল চৌধুরীর বেশ কয়েকটি কালজয়ী বাংলা গান, রবি ঠাকুরের গান, গণনাট্য সঙ্ঘের গান সব বেশ ভালোই রপ্ত করেছিল। সমবেত সঙ্গীতে গলার স্কেল চেঞ্জ করে গাইবার একটা প্রবণতা তৈরি হয় সবার মধ্যে। রমিত সেটাতেও বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছিল। সুর এক রেখে স্কেল চেঞ্জ করে অনেক গানই গাইতে পারত রমিত। গলার মডিউলেশন কি ভাবে করতে হয় তাও আস্তে আস্তে শিখে নিয়েছিল। মডিউলেশন অর্থাৎ গলার স্বর নিয়ে খেলা করা যা কিনা মিমিক্রি আর্টিস্টরা করে থাকেন। রমিত মাঝে মাঝে মিমিক্রিও করত। বেশ ভালোই করত। পরবর্তী সময়ে রেডিওতে দুপুরে ও রাতে RJ  মীরের ভাষণ শুনত। মাঝে মাঝে চেষ্টা করত বিভিন্ন আর্টিস্টদের গলা নকল করবার। বেশ কয়েকজনের গলা ভালোই নকল করেছিল।
মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভূত। বিধাতা সবার কপালে সব কিছু দেন না। বেশ কয়েকটা মাস অতিক্রান্ত হবার পর সুমনকাকু ওনার ওই পাড়া ছেড়ে দূরে অনেক দূরে চলে গেলেন। নতুন বড় একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। উত্তর কোলকাতার গলিঘুঁজি ছেড়ে দক্ষিণ কোলকাতার এক বৃহৎ আবাসনে ঠাঁই নিয়েছিলেন পরিবার নিয়ে। রমিত এবং আরও অনেকের পক্ষে উত্তর কোলকাতা থেকে ডিঙিয়ে দক্ষিণ কোলকাতা গিয়ে এই ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছিল। তবে ও শুনেছিল যে শর্মিষ্ঠা নাকি অনেকদিন ওই কাকুর বাড়িতে যাতায়াত করত। অনেক প্রোগ্রামও করেছিল। রমিতের ভাগ্যে কোনও ফাংশন বা প্রোগ্রাম করা হয়ে ওঠেনি। তথাকথিত মঞ্চে উঠে কিভাবে একজন শিল্পী নিজের কলা প্রদর্শন করেন তা আর রমিতের বোঝা হয়ে ওঠেনি। স্বপ্ন ছিল একদিন ষ্টেজ পারফরম্যান্স করবে। সামনে অনেক স্রোতা, দর্শক। অগণিত ভক্তবৃন্দ ওর গানের সাথে সাথে হাততালি দিচ্ছে। সেটা স্বপ্নই থেকে গেছে। বাস্তবায়িত হয়নি আজও। পাড়ায় ছোটখাটো মঞ্চ তৈরি করে সেখানে নিজেকে প্রদর্শন করা হলেও ওর এই বৃহৎ স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। 

                                 (৫)

ক্রিং ক্রিং করে ঘড়িতে এলার্ম দেওয়ার শব্দ। না ঘড়িতে নয়। বাজারে এখন মোবাইল এসেছে। নোকিয়া ১১১০, ১১০৮, ৩৩১০ আরও কত কি! ২০০০ সালের পর থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে যেন এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। আজ ২০০৫ সাল। রমিত খুচরো খাচরা কাজ করে একটা নোকিয়া ১১১০ মোবাইল কিনে ফেলেছে। সেই মোবাইলেই সকাল সাতটার এলার্ম বাজছে। আজ রমিতের এক জায়গায় যাওয়ার কথা। কাজের জন্য রমিত এখন হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। ২০০৩ সালে স্নাতক পর্ব শেষ করবার পর ছোটখাটো সার্টিফিকেট কোর্স, কম্পিউটারের কোর্স, বিভিন্ন টিউশানি এসব করেই দিন গুজরান করে ও। চাকরীর চেষ্টাও করছে বিস্তর। কিন্তু যোগাযোগ, সুপারিশ বা অসম্ভব মেধার অনুপস্থিতির কারণে এখনও সেরকম ভালো চাকরি কপালে জোটে নি। ছোটখাটো দু-এক জায়গায় কাজে ঢুকেছিল বটে রমিত তবে সেরকম ভালো কোনও সম্ভাবনা না থাকার দরুন কাজ ছেড়ে দিয়েছিল। এখন বেশ কয়েকটা টিউশানি, কম্পিউটার কোর্স, এপাড়ায় সেপাড়ায় একটু আড্ডা, কারো বিপদে-আপদে নিজের সাধ্যমত সাহায্য করা, এসব করেই দিন কাটছে ওর।

মোবাইলে এলার্মের আওয়াজে তড়াক করে জেগে উঠল ও। আজ একটু এসপ্ল্যানেড, চাঁদনী চক মার্কেট এসব জায়গায় যেতে হতে পারে। সুরঞ্জন দা’র সাথে এসপ্ল্যানেডে দেখা করার কথা। সুরঞ্জন দা একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। বিভিন্ন ছোটখাটো অর্গানাইজেশনের সাথে যুক্ত যারা মূলত প্যারামেডিকেল এবং বাওমেডিকেল কোচিং দিয়ে থাকেন। রমিত মানিকতলায় এরকম একটি প্যারামেডিকেল সেন্টার থেকে মাস ছয়েকের সার্টিফিকেট কোর্স করেছিল। অর্থোপেডিক ইকুইপমেন্টের কার্যকারিতার উপর। গভঃ অ্যাফিলিয়েটেড কোর্স কত যে বেড়িয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সবাই ডিগ্রি নিয়ে, সার্টিফিকেট নিয়ে বসে আছে। কিন্তু দেশে বা রাজ্যে চাকরি বাকরি কিচ্ছু নেই। বিভিন্ন জায়গায় টো টো করে ঘুরে বেরোনোর ফলে রমিত এটুকু অনুভব করেছে যে এই ছোটখাটো কোর্স করে চাকরীর বাজারে কোন লাভ হয় না। তাই ও এই অর্থোপেডিক ইকুইপমেন্টগুলো নিয়ে একটা অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করবে বলে মনস্থির করেছে। পুঁজি খুবই কম। শুধু যার দরকার তার থেকে অর্ডার নিয়ে জায়গামতো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে খোঁজ করা এবং কমিশন সমেত সেই জিনিসগুলো প্রথম পার্টির কাছে পৌঁছে দেওয়া। এসব ব্যাপারে সুরঞ্জন দা’র বিভিন্ন অর্থোপেডিক এবং প্যারামেডিকেল স্টোরগুলোর জানাশোনা আছে। তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে উনি কোচিং করেন সেখানেও বিস্তর জানাশোনা। তাই রমিত সুরঞ্জন দা’কে একটু খাতির যত্ন করে চলে। কাজগুলো যদি পাওয়া যায় তার চেষ্টা করে। ওরা প্রথমে এসপ্ল্যানেডে একটা পার্টির থেকে অর্ডার নিয়ে মেডিকেল কলেজ, বইপাড়া এসব অঞ্চলে যাবে। সুরঞ্জন দা লোকটা এমনিতে ভালোই। সাহায্য-টাহাজ্য করে। বিনিময়ে কোনোদিন কিছু চায়নি। তবে রমিত ভেবে রেখেছে আজ যদি কিছু অর্ডার পাওয়া যায় ও যোগাযোগটাও যদি ঠিকঠাক হয় তাহলে ও সুরঞ্জন দা’কে এসপ্ল্যানেডের ভালো কোন রেস্তরাঁতে গিয়ে বিরিয়ানি খাওয়াবে।

‘কি রে কতক্ষন?’
‘এই তো, জাস্ট দশ মিনিট হয়েছে’।
‘এই থেরাপিউটিক মেশিনারিগুলো ইউজ করতে পারিস তো সব, কারণ এগুলো সম্পর্কে যত জানবি পার্টিকে বোঝাতে তত সুবিধে হবে। ঘরে ফাঁকা সময়ে একটু পড়াশোনা করে নিবি’।
‘হ্যাঁ ঘাঁটাঘাঁটি করি তো। প্রতিটা যন্ত্রপাতি নিয়েই নাড়াচাড়া চলছে’।
‘শোন আমাকে একজন ফিজিওথেরাপির মেশিন আলট্রা সাউন্ড এবং টেন্সের কথা বলেছে। তুই এক কাজ কর, এই মোবাইল নম্বরটা রাখ। সময় মতো কল করে নিস।
‘আচ্ছা’।
‘এখন চল’।

অর্ডারটা পেয়েছিল রমিত। পার্টিকে মাল দিয়েও এসেছে। কিছু কমিশনও পেয়েছে। কিন্তু এই ধরণের ব্যবসায় একটা গাড়ি সবসময়ের জন্য পেলে খুব সুবিধে হয়। ট্যাক্সি করে মাল আনা নেওয়ায় অনেক টাকা এক্সট্রা নিজের পকেট থেকে বেরিয়ে যায়। এই তো সেদিন একটা ফিজিওথেরাপি সেন্টার থেকে প্রায় ১৫ পিস ট্র্যাকশন সেট অর্ডার পেল। সেইসব মাল একটা একটা করে উঠিয়ে ভাড়ার গাড়ি ঠিক করে পার্টির কাছে পৌঁছিয়েও দিল। কিন্তু পার্টি শুধুমাত্র অর্ধেক টাকা পেমেন্ট করে রমিতকে বেশ কয়েকদিন ধরে ঘোরাতে লাগল। এরকমভাবে বেশ অনেক জায়গাতেই রমিতের টাকা ফেঁসে যেতে লাগল। বাজারে বেশ খানিক ধার দেনাও হয়ে গেল। ব্যক্তিগতভাবে রমিত ধারে কাজকর্ম একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু এই লাইনে নগদের থেকে ধারে লেনদেনই অনেক বেশি। কখনও সখনও অর্ডার পাওয়ার জন্য পার্টিকে বিশেষ খাতিরও করতে হয়। তাতে কখনও কাজ হয় কখনও বা হয় না। কে যে কখন কার পায়ে লেঙ্গি মারে চট করে বোঝাও যায় না। বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক পার্টির টাকা ফেঁসে থাকে রমিতের। প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেকেই সময়মতো টাকা পেমেন্ট করে না। ফলে রমিতের ধারের পরিমাণ বাড়তেই থাকে। কিছু টিউশানি করে ও দু চারজন বন্ধুবান্ধবের থেকে টাকা ধার করে পুরনো ধার শোধ করে রমিত। ফলত আস্তে আস্তে ব্যবসাটাও ছোট হয়ে আসে। উদ্যোগটাও যেন কমে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। দুনম্বরি, ঘুস, তোষামোদ এগুলো যে ব্যবসার অঙ্গ সেটা বুঝতে পেরেও মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না রমিত। নিজের আদর্শ থেকে চ্যুত হতে পারে না কিছুতেই। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় একদিন এই লাইন পুরোপুরি ছেঁড়ে দেবে।    
          
          

Comments

Popular posts from this blog

মিশন সান্দাকফু

MISSION SANDAKFU লেখক : - প্রেমাংশু দেবনাথ মিশন সান্দাকফু - প্রথম পর্ব পরিচয় - ট্রেন টা এক ঘণ্টার উপর লেট আছে । - তো , কি হয়েছে ? এই সুযোগে বরং ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নে। - ওরে তুই জুতো টা পর রে। - এই শত হাত মুখ টা ধুয়ে নে এবার। - দ্যাখ্ শতদল টা এখনও ঘুমোচ্ছে । - ওর পেছনে একটা ক্যাত করে লাগা দেখবি তিরিং করে উঠবে। - ওরে শতদল নিউ জলপাইগুড়ি আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঢুকবে। -Get ready boys. এই ভাবেই শুরু হয়েছিল মিশন সান্দাকফু। ট্রেকিংয়ের সময়ে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি । তাই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে লেখাটি আবার শুরু করলাম । সেদিনটা ছিল 18/12/16 । সকাল সাড়ে আটটা কি নটা হবে । সেদিন সকালে সবচেয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠল আমাদের শত। মানে শতদল জানা। কিন্তু সান্দাকফু পৌঁছাল সবার প্রথমে। শতদল কে বলা যেতে পারে আমাদের কাণ্ডারী বা পথের দিশারী । ওই হল আমাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ছিপছিপে চেহারা । অ্যাথলেটিক ফিগার । হাইট আন্দাজ 5'8" । মনে হচ্ছিল এই ...

ভাইজ্যাগ ২০৪০

ভাইজ্যাগ ২০৪০ অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ। সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদ...

ভগবান ও শয়তানের লড়াই

ভগবান ও শয়তানের লড়াই ভগবানঃ- পৃথিবীটাকে কেন ধীরে ধীরে শেষ করে দিতে চাইছিস? আর কত! থামা এবার! প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির উপর নিজের প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করছিস ক্রমাগত। ওরে শয়তান কবে শেষ হবে তোর এই লীলা খেলা? শয়তানঃ- তুই শালা নিজেকে কি ভাবিস বে? শালা উদগান্ডু। অনেক ক্ষমতাবান না তুই! আর আমি পৃথিবীটাকে শেষ করে দিতে চাইছি? ঠিক আছে, তাহলে তাই। বেশ করেছি। এই পৃথিবী, এই জগৎ, এই মহাজাগতিক সব কিছুকে সৃষ্টি করতে কে বলেছিল? জানিস না যেই মুহূর্তে সৃষ্টির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকেই ধ্বংসের দিন, ক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। আর এই কাজটি করি আমি। করছি এবং করতেই থাকব। তোর যখন এত ক্ষমতা, মানুষ যখন তোকে এত পুজো করে, তখন আটকে দেখা দেখি। কিভাবে পারিস দেখি ধ্বংসকে রুখতে। ভগবানঃ- ভুল বলছিস। সৃষ্টি অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যু, দুটোই আমার নিয়ন্ত্রণে। একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টির কাজ করে থাকি আমি। আমার কাজ মানুষকে চিন্তা, ভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক কাজে প্রয়োগ করা। আমি চাই না যে মানুষ আমাকে অন্ধ বিশ্বাসের মতো পুজো করুক। আমি চাই সঠিক আলো, সঠিক পথ অবলম্বন করে এক মানুষ অপর মানুষকে সাহায্য করুক, দুস্থদের...

আমার জীবনে তিন নারী

আমার জীবনে তিন নারী যে কোনও পুরুষের জীবনেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যে কোনও মানুষের জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা ...

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব -        দেবু বাবু শুনছেন! দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না। তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন আছেন য...

মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব

MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব টোংলুর পথে ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো? - দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল। - ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল। - জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল। ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় । - তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম । এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু কর...

প্রেমের কিছু কথা ও গান

প্রেমের কিছু কথা ও গান আজ হঠাৎ করেই যেন তোমাকে দেখতে পেলাম। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। তুমি একটা দরজার সামনে দাড়িয়ে আছ। বাইরে থেকে আলো এসে তোমার মুখেতে পড়েছে। দুলছে হাওয়ায় তোমার খোলা চুল। আমার ঘর আলো করে দাড়িয়ে রয়েছ তুমি। হাল্কা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি দেখছিলে আমাকে। তোমার সেই প্রাণভোলানো, মনজুড়ানো, সারল্যমাখা হাসি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। যা আজও দিচ্ছে। অনেকসময়েই। মনে হচ্ছিল এক ছুটে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু কেমন করে যাই। আমি যে অথর্ব। এক জড়ভরত। দেখলাম সারা ঘরময় তুমি হেঁটে বেড়াচ্ছ। শিশুর মতো খেলে বেড়াচ্ছ। কি এক অপার্থিব সুখ যেন আমার শরীরে অনুভূত হচ্ছে তোমাকে দেখতে পেয়ে। “হামেশা তুমকো চাহা, অউর চাহা, চাহা, চাহাআআআ...............” গুনগুণ করে গাইতেই থাকছি দেবদাস সিনেমার এই গানটি। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। দেখছি আরশির মধ্যে দিয়ে তুমি আমার দিকে মিটিমিটি হাসছ। সেই তোমার মুক্ত ঝরানো হাসি। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছ তুমি। জানি তা আমারই উদ্দেশ্যে। খুবই ইচ্ছে করছিল জানো তোমার পরশ পেতে। কিন্তু যখনই আরশির কাছে গেলাম ও হাতটা বাড়ালাম, তুমি কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেলে।...

মরীচিকা

মরীচিকা উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক রাখেনি। গার্গীও চায় না। ...

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ হায়দ্রাবাদের  MGBS STOPPAGE পৌঁছানোর পর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম নেক্সট বাসের জন্য যেটা কিনা  হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট পৌছবে। তার মধ্যে নয় নয় করে প্রায় 10/12 বার অটোয়ালারা আমার সাথে দরদাম করে গেছে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে 200 তো কেউ 150 তো কেউ আবার 300 ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখার্জি দা , চক্রবর্তী দা বলেই রেখেছিলেন যে ভুল করে কক্ষনো অটোতে চাপতে যাবে না। তোমার ফ্লাইট যখন সকাল আটটার পর তখন তুমি ভোর চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত MGBS এ অপেক্ষা করবে পরের বাসের জন্য। বাস এসে পড়লে তাতে উঠে পড়বে। ভাড়া হয়তো নেবে পঁচিশ থেকে তিরিশ টাকা কিংবা বড়জোর চল্লিশ টাকা। তাছাড়া অটোর থেকে অনেকগুণ আগেই গন্তব্যে পৌছে যাবে। আমিও তাই করলুম। বাস আসলো পাঁচটা দশ নাগাদ ভোরবেলায়। ভোরবেলার সদ্য প্রস্ফুটিত আলোয়  হায়দ্রাবাদ  শহরটিকে দেখতে দেখতে , খানিক ঢুলু ঢুলু চাহনিতে , ঝিমোতে ঝিমোতে পৌছে গেলাম হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট সকাল ছটা পনেরো নাগাদ। মুখার্জি দা বলেছিলেন :- - এয়ারপোর্ট গিয়ে দেখবে লোকাল কিছু বাস দাড়িয়ে আছে। সেগুলো তোমাকে ড...

মুঠো ফোন

মুঠো ফোন ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি । তার পাশে কমন স্পেস দিয়ে ঘরে যাওয়ার রাস্তা । দোতলায় উঠে সিঁড়ির ঠিক দ্বিতীয় কি তৃতীয় ধাপে বসে থাকে ও। মানে অসীম , আমাদের অসীম কুমার । হাতে একখানা স্মার্ট ফোন সঙ্গে একটা হেডফোন , কানে গোঁজা ।রোজ রাত দশটার পর থেকে চলে গল্প কথন , মন দেওয়া নেওয়ার খেলা , হাসি , ঠাট্টা , মুখ ভেংচানো , দূরভাষ যন্ত্রে একে অপরের চলচ্ছবি দেখা । স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন তো শুধু শোনা নয় বরং একে অপরকে বেশ ভালভাবেই কাছে পান প্রেমিক যুগল বা আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , বাবা মা ইত্যাদি ইত্যাদি । একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলায় আসবার সময় কোন একজনের পদচারণার শব্দ । রমিত চাটুজ্জের প্রবেশ ।দোতলায় অসীম কুমারের সামনে আসে রমিত ।ওকে জিজ্ঞাসা করে .........."বলি হ্যাঁরে হতভাগা , আর কত কষ্ট দিবি ক তো ওই যন্তরটারে ? " " রমিত দা আবার এসে শুরু করলে ? খাওয়া হয়ে গেছে যখন , যাওনা গিয়ে শুয়ে পর এবার।" - অসীম বলল। রমিত - " হ্যাঁরে পোড়ারমুখো আমারে দেইখ্যা জ্বলন তো হইবই। অহন তুই চাইনার মাইয়াটার লগে প্রেম করতাছস্ , আমি হইলাম গিয়া কাবাব মে হাড্ডি , জ্বলন তো হইবই।...