০৫.০৭.২০২০
প্রিয় খুকী
(মামনি)
শুনলাম তুই
নাকি ভীষণ দুষ্টু হয়েছিস! নানারকম বায়নাক্কা হয়েছে নাকি তোর! ভিডিও কলে একটু ছটফট
করিস দেখতে পাই। কিন্তু দুরন্তপানা কতটা বেড়েছে, সেটা সামনাসামনি না দেখলে অতটা
বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দুষ্টুমি কর, ক্ষতি নেই। কিন্তু খুব বেশি করিস না। বাড়ির
সবাইকে অতিষ্ঠ করে রাখিস না। তাহলে কিন্তু কেউ আর সেরকম ভালো বাসবে না। এই আমি বলে
দিলাম। শুনলাম তোর মা নাকি তোকে একটু আধটু বকা ঝকা করে! আর তা শুনে তুইও নাকি
‘পাপ্প’ করে বকে দিস! তা একটু আধটু কর। তোর এই আদো আদো কথাগুলোই তো বাকিদের তৃপ্তি
দেয়। আমাকেও খুব আনন্দ দেয় মনে মনে। ছবিতে দেখলাম দাড়িয়ে আছিস তুই। একটা নতুন জামা
পড়ে। অনেক বড় হয়ে গেলি। একা একা দেয়াল ধরে দাড়াতেও শিখে গেলি। তুই যখন ছ দিন, তখন
তোকে কোলে করে নিয়ে বেড়িয়েছিলাম রাস্তায়। একটা ভ্যাকসিন তোর শরীরে ইঞ্জেক্ট করবার
জন্য। এই একবছরের কাছাকাছি এসে কত বদলে যাচ্ছিস তুই। তোর বড় হওয়াটা যদি সামনে থেকে
দেখতে পেতাম! কি আর করব বল! মন খারাপ করিস না। আমায় মাফ করিস। তোর মা ও তুই, তোরা
দুজনে প্রতি মুহূর্তে আমার অনুপস্থিতিতে খুব ব্যথিত। আমি জানি, আমি বুঝি, কিন্তু
কিছু করতে পারি না। আমি নিরুপায়। আর শুধু আমি কেন, সারা দেশ নিরুপায়। করোনা এসে
সবকিছুর হিসাবনিকাশ যে বদলে দিল। এই চরম উত্তাল সময়ের যে কখন অবসান হবে কিছুই
জানিনা, বুঝিনা। তবে দেখা তো হবেই, হয়তো খুব শিগগির। হাসি হবে, কথা হবে। ভালোবাসা
হবে, খুনসুটি হবে। কিন্তু একটা চিন্তা মাঝে মাঝে খুব গ্রাস করে আমায়। আমি কি তোকে
কোলে নিয়ে আদর করতে পারব? তোর নরম তুলতুলে গালে চুমু খেতে পারব? ভয় হয়। কি জানি,
যদি ট্রেনে বাসে আসার পর এই করোনা রোগ আমাকেও ভেতরে ভেতরে আক্রমণ করে! এই রোগ অনেক
সময় টেস্ট না করলে তো ধরাও পরে না। থার্মাল চেকিং করলে আজকাল করোনা বোঝা যাচ্ছে
না। সেক্ষেত্রে আমি যদি এই রোগের ‘বাহক’ হয়ে আসি। তাহলে যে সবচেয়ে ক্ষতি হবে তোর।
বাবা হয়ে কি করে আমি এ সহ্য করব। মানুষের জীবনে এরকম কঠিন পরিস্থিতি সত্যি খুব কম
এসেছে হয়ত। যাক গে, ভয় পাস না। মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। পরিস্থিতির বদল হবেই।
হয়তো একটু বেশি সময় লাগবে। ধৈর্য ধরতে হবে আমাদের সবাইকে অনেক, অনেক। অধৈর্য হলে
চলবে না।
তোর নাকি খুব
জেদ হয়েছে। মোবাইলে ভিডিও না চালিয়ে দিলে নাকি খেতে পারিস না? এটা কেন হবে মা!
কোনও কাজের জন্য যদি তুই অন্য কিছুর প্রতি ‘নির্ভর’ হয়ে পরিস তাহলে কিন্তু
ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে খুব। শুনছিস না টিভিতে সরকার সবসময় আত্মনির্ভর হবার কথা
বলছে! আত্মনির্ভর হও মা। নাহলে যে সত্যিই কোনও উপায় নেই। জেদ করিস না কিন্তু। কোনও
কিছু শিখবার জন্য জেদ করতে পারিস। সেটা দরকার আছে। নিজের মনের ভালোলাগাগুলো,
ভালোবাসাগুলো ধরে রাখিস। সেগুলো সার্থক হোক জীবনে এই কামনা করি। পরিবার, পরিজন,
আত্মীয়স্বজন এদের পরিস্থিতিগুলোকে কখনও ভুলিস না। মনে রাখিস আশেপাশের এই
পরিস্থিতিগুলোই কিন্তু তোকে বাড়তে সাহায্য করছে। মানুষ জীবনে একা একা কিছু করতে
পারে না। আশেপাশের পরিস্থিতি তাকে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। জীবনে অনেক বড়
হয়ে গেলে ইতিহাসকে কখনও ভুলে যাস না। তাহলে একদিন খুব কষ্ট পাবি রে মা। বড় হয়ে তুই
কি শিখবি, কি পড়বি, কোথায় ঘুরতে যাবি তা একমাত্র তোর ইচ্ছের উপরই হোক এটাই আমি
চাই। কিন্তু তার সাথে এটাও চাই যাতে অন্তত একটা যেকোনো শিল্পমাধ্যম তুই আয়ত্ত
করিস। তা সে গান হোক, নাচ হোক, অভিনয় হোক, আঁকা হোক, বাজনা হোক। কিন্তু যেকোনো
একটা শিল্পের সাথে যুক্ত থাকিস আজীবন। কারণ শিল্প মানুষের জীবনে চেতনা বোধের
উন্মেষ ঘটায়। মানুষ হিসাবে এক ধাপ এগিয়ে রাখে।
ভালো থাকিস মা।
ইতি তোর
দাড়িবাবা।

Comments
Post a Comment