#আমি_মানুষ_নই
কলমে প্রেমাংশু দেবনাথ
কাল সন্ধ্যাবেলা থেকে
খবরটা শোনার পর জগদীশের মনটা খুব খারাপ। আজকেই চলে যেতে হবে ওকে। বাক্স প্যাঁটরা
বগলদাবা করে। প্রায় তিনমাস হয়েছিল কোম্পানির এই বাবুদের মেসে কুক অর্থাৎ রাঁধুনির
কাজ করছিল। আজ রাজেশ বলে এক বিহারী লেড়কা কাজে যোগ দেবে। রাজেশের বয়স খুব কম। এই
ষোল সতের হবে। মেসের বাবুরা বলে আঠার বছর পুরো হয়েছে রাজেশের। জগদীশের নিজের বয়স
পঁয়ত্রিশ। গাঁয়ে দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে ওর পরিবার। আজ হঠাৎ করে কেন যে ওর চাকরীটা
চলে গেল তাই নিয়েই ও খুব ভাবছে সকাল থেকে। জগদীশের রান্নার খুব তারিফ করতো বাবুরা।
উংলি চাটতে চাটতে মটন কারি, চিকেন চাপ, বিরিয়ানি এইসব খেতো বাবুরা। তাহলে হঠাৎ কি
যে হল কে জানে! মনটা ভেঙে পড়ে জগদীশের। গাঁয়ে পরিবারের কাছে কি জবাব দেবে ও!
ছেলেপুলেদের মুখে দুটো ভাতের জোগাড় কি করে করবে ও! গাঁয়ে জমিন জায়দাদ যা ছিল সব
গেছে। কর্জ না চুকাতে পারবার জন্য। এখন পেটের ভাত কিভাবে জোগাড় হবে তা উপরওয়ালাই
জানে। লকডাউনে কোথাও কাজ পাওয়া যে কি দুরুহ। জগদীশ তাই সাহস করে ম্যানেজার বাবুকে
জিজ্ঞাসা করল – ‘বাবুজি, অচানক ক্যায়া হো গয়া, আপলোগ তো মেরা বনা হুয়া খানা বহুত
পসন্দ করতে থে। উংলিয়া ভি চাটতে রহেতে থে। ফির মেরা নউক্রি কিউ খা রহে হ্যায়?
ম্যানেজার - তুমহারে নাম
ক্যায়া হ্যায় জগদীশ?
জগদীশ - জী (সামান্য
ঘাবড়ে গিয়ে) আপকো তো পতা হি হ্যায়।
ম্যানেজার – নেহি। পতা
নেহি থা। বহুত কুছ পতা নেহি থা। লেকিন অভি সবকো সবকুছ পতা চল গয়া হ্যায়। ইসলিয়ে তো
পুছ রহা হু, তুমহারে নাম ক্যায়া হ্যায়? পুরা নাম বাতাও। (বেশ উত্তেজিত হয়ে)
জগদীশ – জী, জগদীশ কুমার।
ম্যানেজার – ফির ওহি বাত!
ফির সে ঝুট বোল রহে হো! ইয়ে তুমহারা পুরা নাম হ্যায়? শুরু সে আজ তক অভি ভি ঝুট
বলতে আ রহে হো। (প্রচণ্ড রেগে গিয়ে)
জগদীশ – জী স্যার, মেরা
নাম জগদীশ কুমার ব্যারওয়া হ্যায়। লেকিন পরদাদা সে লেকড় পিতাজি, ম্যায়, হম সব নাম
লিখতে সময় সারনেম ইউজ নেহি করতে হ্যায়। বচপন সে হি স্যার!
ম্যানেজার – সারনেম নেহি
লিখনেসে ক্যায়া তুম উচে জাতকে বন জাওগে। শালা নিচি জাতকে লোগ। ইয়ে জো ‘ব্যারওয়া’
তুমহারে সারনেম হ্যায়, তুমলোগ কউন সি জাতকে হো? বাতাও সবকো আজ! (খুব উত্তেজিত হয়ে)
জগদীশ – স্যার ম্যায়
‘চামার’ হু। হা সমাজকে নিচি জাত। দলিত। লেকিন খানা তো বহুত আচ্ছা বনাতা হু। বড়া
হোটেল মে ভি কাম কিয়া থা। লকডাউন কি বজে সে হোটেল বন্ধ হো গয়া। ফির ইহা আয়া। খানা
বনাতা রাহা। শুরু কে দিন সে কাল তক আপ সব বাবুলোগ মেরা বনা হুয়া খানা কা তারিফ
করতে থে। আপলোগ তো বোলতে ভি থে কি তুমহারা কাম তুমকো বহুত হি আগে লেকে জায়েগা
জিন্দেগী মে। তো ফির স্যার ক্যায়া হো গয়া? আদমি কে কাম হি তো ঊনকে ঈশ্বর হ্যায়।
সারনেম, জাতপাত সে উসকো ক্যায়া লেনা দেনা!
ম্যানেজার – চুপ কর শালা,
শুয়োরের বাচ্চা। জাদা বকবক করেগা তো শালা অভি ধাক্কা মারকে ভাগা দেগা ইহাসে।
জগদীশ – স্যার গালি মত
দিজিয়ে। (ম্যানেজারের চোখে চোখ রেখে) হম আপ সবকে ইজ্জত করতে হ্যায়।
এই কথা শোনার পর মেসের
বাবুরা একসঙ্গে সবাই মিলে জগদীশকে চড়, থাপ্পর, কিল, ঘুষি মারতে থাকে। জামার কলার
ধরে ঘেঁসটাতে ঘেঁসটাতে মেসের বাইরে মাঝ রাস্তায় নিয়ে এসে ফেলে। চিৎকার করে
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে থাকে জগদীশ। কিন্তু বাবুরা ছাড়বে কেন! ও যে নিচু জাত। ওর
যে পদদলিত হয়ে থাকাই নিয়ম। বেশ কয়েকটা ঘুষি, লাথি খাবার পর জগদীশ মাথা ঘুরে পড়ে
যায়। কেউ যেন ওর গায়ের উপর ‘থু থু শালা চামার জাত, ইনহিকে হাতো কা খানা হামসব খাতে
আ রহে থে ইতনে দিন’ বলে থুতু ছিটিয়ে চলে যায়।
ঘোলাটে চোখে এক অদ্ভুত
ভারতবর্ষকে দেখতে পায় জগদীশ। এই কোম্পানির মেসে বহু ভাষাভাষীর লোকজন একসঙ্গে থাকত।
কেউ বাঙালী, কেউ উড়িয়া, কেউ আসামী, কেউ তেলেগু, কিংবা পাঞ্জাব বা উত্তর ভারতের
লোক। জগদীশ মাঝে মাঝে গোটা ভারতবর্ষের লোকজনকে নিজের তৈরি করা রান্না খাওয়ানোর কথা
বলত। এই মেসে এই এতোগুলো বিভিন্ন প্রদেশের লোককে নিজের হাতের রান্না খাওয়াতে পেরে
খুব খুশিও ছিল। মনে মনে ভাবত একদিন মানুষ জাতপাতের উর্ধে গিয়ে তার রান্নার কাজের
কদর দেবে। কর্মই যে পরম ধর্ম এরকম কথা শুনেওছে যে অনেকবার। আজ সত্যি সত্যিই ওর
কাজের কদর ও পেল।

Comments
Post a Comment