সঞ্জু – কয়েকটি প্রশ্নচিহ্ন
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ‘জাদু
কি ঝাপ্পি, আল ইজ ওয়েল, গেট ওয়েল সুন এবং রাঙ নাম্বার’। মনে থাকারই কথা। কে ভুলতে
পারে মুন্নাভাই এম বি বি এস, থ্রি ইডিয়টস, লগে রহো মুন্নাভাই এবং পিকে সিনেমার কথা।
ঠিক সেরকমই এবারের মুভি ‘সঞ্জু’ তে ‘ঘপাঘপ’। এই ঘপাঘপ কি জিনিস সেটা না হয় সিনেমা
দেখে বুঝে নেবেন। বাজারে সঞ্জুবাবা রমরমিয়ে চলছে। পরিচালক রাজু হিরানি ও
চিত্রনাট্যকার অভিজাত জোশির নেতৃত্বে সঞ্জয় দত্ত’র বাওপিক ‘সঞ্জু’ প্রায়
প্রত্যেকেরই মনে দাগ কেটেছে এমনই মনে করা হচ্ছে সিনেমহল থেকে।
সম্প্রতি আমিও ছবিটি
দেখলাম। ছবিটির দুটো দিক মূলত আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সেটা নিয়েই আমার এই
প্রতিবেদন ‘সঞ্জু – কয়েকটি প্রশ্নচিহ্ন’। এবার প্রশ্নচিহ্নগুলো কোথায়, কিভাবে বসবে
সেটা আলোচনার আগে হিরানিবাবুর সম্পর্কে বরং কিছু বলি। রাজকুমার হিরানি হলেন এই
ছবির জাদুকর। ওনার হাতে একটি অদৃশ্য জাদুকাঠি রয়েছে যা দিয়ে উনি দর্শকদের মগজধোলাই
করে গেলেন পুরো ছবিতে। এ ছবির প্রথম চমক সঞ্জয় দত্তের চরিত্রে রণবীর কাপুর।
অসামান্য অভিনয় করেছেন রণবীর এই ছবিতে। দর্শকের মনে অনেকদিন পর্যন্ত জায়গা করে
থাকবেন এই অভিনীত চরিত্রের জন্য। রাজু হিরানির প্রথম চমক বা প্রথম ম্যাজিকটাই হলো
সঞ্জয়ের চরিত্রে রণবীরকে নির্বাচন করা। দ্বিতীয় ম্যাজিকটা যেটা হিরানি দেখিয়েছেন
ছবিটিতে সেটা হল একটা টানটান চিত্রনাট্য এবং সচল গতির এক গল্প। যে গল্প দর্শকদের
মনকে ব্যাথিত করে, হাসায়, কাঁদায় এবং মোহিত করে রাখে। প্রায় প্রতিটি দর্শকের মনের
মধ্যেই বেশ একটা দয়াপরবশ ভাব লক্ষ্য করা যায়। দর্শকগণ সঞ্জয়ের কষ্টে কষ্ট পায়,
সঞ্জয়ের আনন্দে আনন্দ উপভোগ করে, সঞ্জয়ের প্রতি সরকারী আইনকানুনের প্রয়োগ দেখে
কখনও সখনও দর্শকের একাংশ আইনের বিরুদ্ধে গিয়েও কথা বলতে থাকে। সেই মুহূর্তে মনে হয়
সঞ্জয়ের দ্বারা অবৈধ কর্মগুলো বোধহয় সঞ্জয় ভুলবশত করে ফেলেছে। যেন যে কেউ এরকম ভুল
করতেই পারেন। বেচারা সঞ্জু। এতটাও খারাপ ছেলে নয়। ভাল মনের একটা ছেলে। জাস্ট ফেঁসে
গেছে। উঠতি বয়েসে হয়তো অনেকেই এরকম করে থাকে। সিগারেট, মদ, গাঞ্জা থেকে শুরু করে
চরস, LSD, হেরোইন আরও
নানা ধরণের ড্রাগস ব্যবহার করাকেও যেন দর্শক অনেকটা ক্ষমার চোখ দিয়ে দেখে। আহা রে
বেচারা ছেলেটা তো আর ইচ্ছে করে নেশা ধরেনি, হঠাৎ করেই করে ফেলেছে। তাছাড়া মনের
দুঃখটাও কি কম। প্রথম গার্লফ্রেন্ড ছেড়ে চলে গেল, ক্যান্সারে ভুগতে থাকা মা প্রথম
সিনেমা ‘রকি’ রিলিজ করবার আগেই চলে গেলেন। একটা ওইটুকু একরত্তি ছেলে কি পারে এত
চাপ নিতে? তাহলে উপায়? উপায় আছে। গাঞ্জার ধোঁয়ায় বা চরসের টানে নিজেকে যুক্ত করলে
এই সব মানসিক কষ্ট থেকে তো ভাল থাকা যায়। এখানেই প্রশ্নচিহ্ন আমাকে তাড়া করে
বেরাচ্ছে হিরানি বাবু। কষ্টের থেকে মুক্তি পেতেই কি নেশার আশ্রয়? এই প্রশ্নটা যখনই
মনের মধ্যে কিড়কিড় করতে শুরু করল ঠিক তখনই হিরানিবাবু আবার একটা নতুন ঢঙে চাল
দিলেন। সঞ্জু ড্রাগের নেশা থেকে মুক্তি খুঁজতে লাগল সেই সময়। নেশার ঘোরে বাস্তব ও
কল্পনার জগৎকে এক করে ফেলছিল ও সেসময়। আমেরিকায় গিয়ে অনেক কষ্ট করে ধীরে ধীরে এই
নেশার কবল থেকে বেরিয়ে আসলো সঞ্জু। এখানে রাজু হিরানি কি যুবসমাজকে একটি মেসেজ
দিলেন যে এভাবেও নেশার কবল থেকে ফিরে আশা যায়?
যাইহোক গল্পের গতির সাথে
সাথে আমরা দর্শকেরা দেখি সঞ্জুর ভাগ্যটাই খুব খারাপ। নেশার কবল থেকে ছাড়া পেলেও
ঘরেতে বেআইনি অস্ত্র ও আর ডি এক্স মজুত করে রাখার অপরাধে জেল হল ওর। দর্শকেরা
আবারও বললেন বেচারা। ভাল ছেলেটা আবারও গেল ফেঁসে। রাজু হিরানি সঞ্জুকে বার বার ভাল
ছেলে প্রমাণ করবার জন্য কমলেশ নামক এক বন্ধুকে আমদানি করেন। দর্শকগণ ও পাঠকগণ আমাকে
মাফ করবেন। সঞ্জয় দত্তের ‘কমলেশ’ বলে খুব ভাল বন্ধু ছিল কিনা আমার জানা নেই। তাই ‘আমদানি’
শব্দটা ব্যবহার করলাম। হিরানি পারিবারিক দিকটাতেও বেশ ভাল চমক দিয়েছেন দর্শককে।
খুব সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন বাবা সুনীল দত্তের সঙ্গে ছেলে সঞ্জয়ের সম্পর্ক,
দেখিয়েছেন বন্ধুত্বের সম্পর্ক। খুব ভাল ভাবে দেখিয়েছেন অপরাধী তকমা মুছে ফেলার
জন্য এক অদম্য লড়াইয়ের গল্প। যে গল্প সিনেমাটির শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দর্শককে অভিভূত
করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে তো করেইছে। রণবীর ছাড়াও এ ছবিতে কমলেশের চরিত্রে ভিকি
কৌশল অসাধারণ। কখনও কখনও যেন রণবীরকে ছাপিয়ে ক্যমেরার লেন্সকে নিজের দিকে টেনে
ধরেছেন। পিতা সুনীল দত্তের ভূমিকায় পরেশ রাওয়াল উতরে গিয়েছেন। কিছু কিছু দৃশ্যে
বেশ নজরকাড়া অভিনয় করলেও ওনার নিজস্ব ম্যানারিজম থেকে কখনও কখনও যেন বেরিয়ে আসতে
পারছিলেন না। ওনাকে সুনীল দত্ত কম বরং পরেশ রাওয়াল বেশি মনে হচ্ছিল কিছু দৃশ্যে।
নার্গিস ওরফে মনীষা কইরালা ছোট চরিত্রে ঠিকঠাক। বাকিরা ঠিক ঠাক টাইমে পর্দায়
এসেছেন এবং গেছেন।
এবারে যেটা আলোচ্য বিষয়
তা হল প্রশ্নচিহ্ন কোথায় এবং কেন? সঞ্জু, সিনেমায় নিজ মুখে কবুল করেছেন যে ও ৩৫০
এর থেকেও বেশি সংখ্যক মহিলার সাথে রাত কাটিয়েছেন বা শুয়েছেন। তা এক্ষেত্রে প্রশ্ন
আসতেই পারে কোনও মহিলাকেই কি উনি জোর করেননি? সব মহিলাই কি ওনার কাছে স্বেচ্ছায়
দেহ দান করতেন? ব্যক্তিগত জীবনে সঞ্জয় দত্তের অনেক মহিলার সাথেই খুব ঘনিষ্ঠ
সম্পর্ক ছিল এবং তা খবরে ও মিডিয়ায় উঠে এসেছে বারংবার। কিন্তু হিরানিবাবু এই
ব্যাপারটা খুব সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। এমনকি সঞ্জয় দত্তের প্রথম বিয়ের ব্যাপারটাও
এই ছবিতে দেখান হয়নি। ছবিতে দেখানো হয়েছে বাবার সিকিওরিটির জন্য সঞ্জু বাড়িতে
বেআইনি অস্ত্র মজুত করে রেখেছে। আদপেই কি তাই হয়েছিল হিরানিবাবু? মানে একটা বাওপিক
বানাতে গিয়ে বেশ কিছু সত্য গোপন করেছেন বা অর্ধসত্য দেখিয়েছেন। সিনেমাতে সঞ্জু ওর
প্রিয় বন্ধু কমলেশের গার্লফ্রেন্ডের সাথে হঠাৎ করেই রাত কাটালেন। খুবই অবলীলাক্রমে
মানে সব কিছু জেনেশুনেই। বন্ধু কমলেশ সবকিছু জানার পরেও কি করে খুব যৎসামান্য
প্রতিবাদ করেই সঞ্জুর সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইলেন? ব্যাপারটা এরকম ঘটল, আজ তুই আমার
গার্লফ্রেন্ডের সাথে শুয়েছিস, কাল দেখিস আমি তোর গার্লফ্রেন্ডের সাথে শোব।
ব্যক্তিগত জীবনে সঞ্জয়ের বন্ধু কুমার গৌরব ও বোন প্রিয়া দত্তের বেশ অনেকটাই ভূমিকা
ছিল যা হিরানি এখানে উল্লেখই করেননি। কেন? বিতর্কিত কোন ব্যাপার ঘটতে পারে বলে?
কিন্তু এটা তো একটা বাওপিক। আপনি নিজেই ক্লেম করেছেন হিরানিবাবু। তাহলে কেন এত
সত্য গোপন? এই ছবিতে সঞ্জু চরিত্রটি তৈরি হয়েছে খুবই কোমল হৃদয়ের, বেচারা টাইপের,
একটা ভালমানুষের মতন। আদপে এতটাই কি ভালমানুষ ছিলেন সঞ্জয়? ছবি শেষ হওয়ার পর মনে
হতে থাকে গল্পটা যেন কেমন খাপে খাপ গোছের। একটা বেচারা ছেলে পাকে চক্রে ফেঁসে
গিয়েছিল কিন্তু নিজের জীবনে লড়াই করে আবার মুলস্রোতে ফিরে এসেছে। হিরানি বাবু
আপনাকে বলি এটা বায়োপিক কম ও বাণিজ্যিক মনোরঞ্জক ছবি হয়েছে অনেক বেশিমাত্রায়।
ছবিটিকে সাধারণ দর্শকেরা খুব এঞ্জয় করেছেন, কিন্তু প্রকৃত বায়োপিক হলে হয়তো
দর্শকেরা এতটা আনন্দ পেতেন না। সেই কারনেই কি সত্যগোপন? সেই কারণেই কি বিতর্কিত
বিষয়গুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া? এখানেই আমার প্রশ্নচিহ্ন। ফুলস্টপ নয়।

কেমন লাগল সঞ্জু ? সিনেমা এবং আমার লেখাটি দুটোই?
ReplyDeleteI Enjoyed the movie. I really don't know whether Sanjay dutt was a hooligan or not. I enjoyed the movie just like other movies.
ReplyDeleteCertainly...........it's a enjoyable movie after all.......but it is not a real biopic which I mean in my article............
Delete