Skip to main content

বেনীমাধব


বেনীমাধব – কেবলমাত্র প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

হঠাৎ করেই মাঝরাত্রে ফোনটা আসে অপুর কাছে। নার্সিংহোম থেকে। হন্তদন্ত হয়ে কোনোরকমে একটা বন্ধুর বাইক জোগাড় করে নার্সিং হোমে পৌঁছায় অপু। রাত দেড়টা। নার্সিং হোমে ছোট্ট রিসেপ্সন কাম ভিজিটরস রুমে লোকজন এখন অনেকটাই কম। রিসেপ্সনে পেশেন্টের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবার জন্য অপু জাস্ট একটু এগিয়েছে এমন সময় ওদের চারজনকে দেখল ও। হ্যাঁ মুখগুলো চেনা চেনা লাগছে অপুর। ওরা এক এক করে অপুর দিকে এগিয়ে এল। এই চারজনের মধ্যে একজনের নাম তন্ময়। তন্ময়ই পুরো ঘটনাটা অপুকে বুঝিয়ে বলল। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে কোনও এক সময়ে বেনীমাধব অত্যধিক পরিমাণে ড্রিংক করে মেসবাড়ির চারতলার ছাদে যায় ও সেখান থেকে নীচে পাশের বাগানটায় ঝাঁপ মারে। আত্মহত্যার চেষ্টা। মেসের বেশ কিছু ছেলে জেগে থাকায় ওরাই পাশের বাগানটায় দৌড়ে আসে ও বেনীমাধবকে রক্তাক্ত ও অচৈতন্য অবস্থায় দেখতে পায়। তারপর তড়িঘড়ি করে কাছাকাছি এই নার্সিং হোমে ভর্তি করে ওকে। তন্ময় ছেলেটিই উদ্যোগ নিয়ে এই কাজগুলো করেছে। এছাড়া ফোন করে বেনীমাধবের বাড়ির লোকজন ও কাছাকাছি বন্ধুবান্ধবকে জানায় এই খবরটা। অপু জিজ্ঞাসা করে – “কাকু কাকিমাকে কি খবরটা জানিয়েছ?”

“হ্যাঁ জানিয়েছি। ওনারা অলরেডি রওনা হয়ে গিয়েছেন শ্রীরামপুর থেকে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত এসে পড়বেন। শ্রীরামপুর থেকে বেলঘরিয়া খুব বেশিক্ষণ তো লাগবার কথা নয়”।

একা বসে ভাবতে থাকে অপু। কানের কাছে যেন স্পষ্ট শুনতে পায় বেনীমাধবের সামান্য মেয়েলী কণ্ঠস্বর। “তোর নামটা না খুব সুন্দর জানিস, অপু। ভালনামটাও। অপূর্ব ব্যানার্জি। I love this name. কেন জানিস?”

“কেন?”

“আরে বিভুতিভূষণ পড়িসনি? পথের পাঁচালী, দেখিসনি? সত্যজিতের অপু ট্রিলজি।
“হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক। বাঙালির কাছে অপু একটা ফেমাস নাম বটে”।
“অপুকে নিয়ে কত রিসার্চ হচ্ছে আজকাল জানিস তো। কৌশিক গাঙ্গুলি তো ‘অপুর পাঁচালী’ বলে একটি ছবিই বানিয়েছেন অপুকে নিয়ে”।

“হ্যাঁ দেখেছি সিনেমাটা। পথের পাঁচালীর অপু অর্থাৎ সুবীর ব্যানার্জির লাইফ নিয়ে ছবি। বেশ ভালো লেগেছে আমার”।

“সত্যি? তুই আমার বুকে আয় রে অপু”।

এমন করেই হঠাৎ হঠাৎ বুকে জড়িয়ে ধরত বেনীমাধব অপুকে। ভীষণ ইমোশনাল ছিল। খানিকটা সেন্টিমেন্টালও বোধহয়। অনেক গুণ ছিল বেনীমাধবের। তা সে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে কবিতা লেখা, গান করা, ভালো ভালো বিদেশী সিনেমা দেখা বা বইপড়া, যাই হোক না কেন। মাঝে মাঝে মেসেতে নিজেই রান্না করত বেনীমাধব। সেইসময় অপু আসত নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। দারুণ ছিল রান্নার হাত বেনীমাধবের। মাংস রান্না হলে আঙ্গুল চাটতেই থাকত সবাই। বেনীমাধবের সবচেয়ে বেশি শখ ছিল ফটোগ্রাফি ও ফিল্মের প্রতি। খুবই ভালবাসত ও সত্যজিত রায় ও ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি। ঋতুপর্ণকে নিজের আইডল মনে করত বেণী। ওর চলন-বলন ও আদবকায়দাও ছিল একটু মেয়েলী। বেনীমাধবকে এফিমিনেট অর্থাৎ মেয়েলী পুরুষ বলা যেতেই পারে। তবে একটা বিষয়ে অপু কোনদিনই দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বেনীমাধবের ব্যাপারে। অপুর অনেকবারই মনে হয়েছে বেনীমাধব কি আদৌ স্বাভাবিক নাকি হোমো সেক্সুয়াল। কিন্তু বেণীর সাথে মিশে সেরকম কোনও আচরণ ওর চোখে পড়েনি। বেণী কোনদিনই অপূর্বর সাথে এমন কোনও আচরণ করেনি যা দেখে ওকে হোমো সেক্সুয়াল মনে হতে পারে। কিন্তু বেণীর পছন্দ, অপছন্দ ওর চলাফেরা সব কিছুর মধ্যে কিরকম যেন রহস্য রয়েই গেছে। মাথায় বড় চুল রাখত বেণী। মাঝখানে চেরা সিঁথি। মাথার পেছনে ছোট করে পনিটেল। রোজ সকালে উঠে যোগাসন করত বেণী। সুঠাম চেহারা ছিল ওর। হাইট ও তো বেশ ভাল। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। তাই বেণীর সম্পর্কে অপুর ধারণা আবছা এক আলোছায়ার মধ্যেই যেন রয়ে গিয়েছে। বেণীর ল্যাপটপে গে সেক্সের পর্ণগ্রাফিও নজরে পড়েছে অপুর। অপু সরাসরি একদিন জিজ্ঞাসাও করেছিল ‘তুমি এইসব দেখ? একটা ছেলের সাথে আরেকটি ছেলের শারীরিক সঙ্গম দেখতে ভালো লাগে তোমার?’

“আরে না। এক বন্ধু বেশ কিছু বিদেশী সিনেমা দিয়েছিল সিডিতে। সেখান থেকেই কপি পেস্ট হয়েছে বোধহয়। রাখ না ওসব। তোদের নর্মাল সেক্সের ভিডিও দেখলে দেখতে পারিস। I don’t mind. যদিও আমি তোর থেকে বছর পাঁচেকের বড়। দাদার মতো। তবুও এক্ষেত্রে ছাড় দিলাম তোকে”।

‘তোদের নর্মাল সেক্সের’ এই কথাটাতে কি এক তীব্র শ্লেষের চিহ্ন ছিল না সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে, যা অপুকে ভাবিয়েছে অনেক কিছু কিন্তু কোনও সদুত্তর পায়নি কখনও। ঠিক যেমন করে আজও কোনও সদুত্তর পাচ্ছে না অপু এই আত্মহত্যার চেষ্টার কারণ কি হতে পারে সেই নিয়ে। মাস ছয়েক হয়েছিল কোলকাতার এক নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় ফটোগ্রাফার হয়ে কাজ শুরু করেছিল বেনীমাধব। এছাড়া বিভিন্ন ছোটখাটো ফার্মের সঙ্গে ফ্রিল্যান্সার হয়ে কাজ করত বেণী। নিজের নামটাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সামনে বেশ রসিকতাও করত। কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে অনেকটা মেয়েলী ঢঙে হেঁটে বেড়াত আর গুনগুণ করে গান করত “আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভেজাব না”। বেণীমাধবের চেহারাটা ছিল প্রচণ্ড পেটাই। ভগবান যেন ছেনিহাতুড়ি সহযোগে একটি পাথরের টুকরোকে কেটে কেটে তৈরি করেছে ওর চেহারাটাকে। একদম সুঠাম, নির্মেদ, ঝরঝরে। যা যেকোনো সুন্দরী মহিলাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মেয়েদের সাথে খুব সহজে মিশে যেত বেণীমাধব। কোন পোশাকের সাথে কোন লিপস্টিক চলবে বা কোন জিন্সের সাথে কোন টপ পড়তে হবে তা বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে মেয়েদের বুঝিয়ে বলত বেণী।

ইদানীং একটা ঘটনা ঘটেছিল বেণীর জীবনে। অপুর কাছে ও স্বীকার করেছিল। - 

“জানিস অপু, তোদের এই বেণীমাধবের প্রেমে পড়েছে ভ্রমর”।

“তাই নাকি। এ তো খুব ভাল খবর। তাহলে তোমার প্রাণভোমরা কি এখন তার হাতে?”

“উহু ব্যাপারটা সেরকম নয়। আমি বিয়েটিয়ে, সংসার করে আমার জীবনটা নষ্ট করতে পারব না”।

“বিয়ে করলে তোমার জীবন নষ্ট হতে যাবে কেন?”

“তুই বুজঝিস না। ও ঠিক আছে, ভালো চাকরি করে। ওর যেহেতু একটা নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে হয়তো ও আমাকে আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। তুই তো জানিস আমি একটু একা একা, নিজের মতো থাকতে ভালবাসি”।

“তা কোথায় চাকরি করে ভ্রমর?”

“একটা নিউজ চ্যানেলের হয়ে জার্নালিস্টের জব করে ও। স্পটে গিয়ে নিউজ কভার করাই ওর কাজ। বেশ ঝক্কি ঝামেলার। কিন্তু ও পারে। মিনমিনে তো নয়। বরং একটু ডাকাবুকো টাইপের”।  

“তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? তুমি তোমার মতো থাকবে, উনি ওনার মতো। মাঝে মধ্যে একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে টুরতে গেলে, একটু খুনসুটি করলে। ব্যস আর কি! একে অপরকে নিজেদের খুশি রাখতে পারাটাই তো জীবন, নাকি?”

অপু কথাগুলো বলেছিল ঠিকই, কিন্তু বেণী অপুকে একটা সত্য গোপন করেছিল। ও একটা কাণ্ড করে বসে। ভ্রমরের সাথে এক রাতের লিভ ইন রিলেশনশিপে যুক্ত হয়। তাও সেই বেলঘড়িয়ার মেসের রুমে। যা মেসের বাকি ছেলেদের কাছে খুবই দৃষ্টিকটু হয়ে দাড়ায়। কারণ আমাদের সমাজে আজও দুটি পুরুষ বন্ধ দরজার মধ্যে যদি কোনও ব্যক্তিগত(সেক্সুয়াল হতেও পারে নাও পারে) সম্পর্কে লিপ্ত হয় তবে তা আজও অপরাধ বলেই গণ্য হয়। ভ্রমর কোন মহিলা নয়, একজন পুরুষ। যা কিনা বেণী অপুকে গোপন করেছিল। তন্ময়ই সব কিছু বলে অপুকে। বন্ধ দরজার মধ্যে ওরা দুজন মানে বেণী ও ভ্রমর (যা কিনা বেণীর দেওয়া আদুরে নাম) একে অপরকে লিপ কিস করছিল।

“তোমরা কি করে জানলে ওরা দুজন লিপ কিস করছিল?

“আমাদের মেসের দুজন ছেলে বেণীর ঘরের জানলা দিয়ে ওদের ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখছে”।

“তোমরা ওদের পার্সোনাল লাইফে ইনটারফেয়ার করবার কে?”

“শুনুন দাদা, এটা বেণীর পার্সোনাল বাড়ি নয়। এখানে পাঁচজনে একসাথে থাকে। যদিও ও সিঙ্গেল রুমে থাকত। তবুও মেসের বাকি ছেলেরা শুনবে কেন! এরকম রসালো একটা ঘটনা চোখের সামনে ঘটছে কেউ যে কিছু বলবে না বা করবে না এরকমটা ভাবা যায় কি?”

“তখন তোমরা কি করলে? প্রতিবাদ জানালে?”

“প্রথমে তাই করা হয়েছিল। ওদের দুজনকে সাবধান করবার পরে তোমাদের ভ্রমর যার আসল নাম রঞ্জন ও চলে গেল। ব্যাপারটা এখানে মিটে গেলেই ল্যাটা চুকে যেত। গণ্ডগোলটা বাঁধল ডিনার করবার সময়। মেসের কোনও এক হনু মোবাইল ক্যামেরায় ওদের দুজনের সেই আপত্তিকর দৃশ্য সবাইকে দেখাতে শুরু করল বেণীর সামনেই। লজ্জায় ও অপমানে বেণী তখনই ভাতের থালা ফেলে দিয়ে ঘরে ঢোকে ও বেসামাল ভাবে ড্রিংক করে। এদিকে বাইরে সবাই এই নিয়ে খুব হাসাহাসি শুরু করে। যা বেণীকে একেবারেই কোণঠাসা করে দেয়। এর প্রায় ঘণ্টাখানেক বা ঘণ্টাদেড়েক বাদেই এই সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট”।

“তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে এটা এখন পুলিশের আওতায় চলে গিয়েছে?”

“জানি, বুঝতেও পারছি। অলরেডি পুলিশে খবর পৌছিয়েও গেছে। দেখুন এতে পুলিশ যা করবার করবে। আমরা নিজেরা আগবাড়িয়ে কিছু বলব না বা করব না বলে ঠিক করেছি। আপনাকেও সেটাই অনুরোধ করছি। দয়া করে আপনি কোনও স্টেটমেন্ট দিতে যাবেন না। এটা মেসের ব্যাপার মেসেই বুঝে নিতে দিন”।
হতবাক অপু চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। এক নিরপরাধ ছেলের এরকম দুর্গতির কথা ভেবে সমাজকে মনে মনে গাল মন্দ করা ছাড়া আর কি বা করতে পারে সে এখন! আজ বেণী যদি এই একই ঘটনা একটা মেয়ের সাথে করত তাহলে কি এই পরিণতি থেকে বেঁচে যেত ও?

প্রেমাংশু.........।।           

Comments

  1. নতুন কিছু শিখলাম প্রেমাংশু দা। ধন্যবাদ। সমাজ কে দিস্টিকন পরিবর্তন করতে হবে।যে যেমন তার তেমন ই বাঁচার অধিকার আছে। সমাজ টা সবার।

    ReplyDelete
  2. Thank You for reading & commenting this in my blog....

    ReplyDelete
  3. বেশ সুন্দর গোছানো লেখা!

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মিশন সান্দাকফু

MISSION SANDAKFU লেখক : - প্রেমাংশু দেবনাথ মিশন সান্দাকফু - প্রথম পর্ব পরিচয় - ট্রেন টা এক ঘণ্টার উপর লেট আছে । - তো , কি হয়েছে ? এই সুযোগে বরং ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নে। - ওরে তুই জুতো টা পর রে। - এই শত হাত মুখ টা ধুয়ে নে এবার। - দ্যাখ্ শতদল টা এখনও ঘুমোচ্ছে । - ওর পেছনে একটা ক্যাত করে লাগা দেখবি তিরিং করে উঠবে। - ওরে শতদল নিউ জলপাইগুড়ি আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঢুকবে। -Get ready boys. এই ভাবেই শুরু হয়েছিল মিশন সান্দাকফু। ট্রেকিংয়ের সময়ে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি । তাই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে লেখাটি আবার শুরু করলাম । সেদিনটা ছিল 18/12/16 । সকাল সাড়ে আটটা কি নটা হবে । সেদিন সকালে সবচেয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠল আমাদের শত। মানে শতদল জানা। কিন্তু সান্দাকফু পৌঁছাল সবার প্রথমে। শতদল কে বলা যেতে পারে আমাদের কাণ্ডারী বা পথের দিশারী । ওই হল আমাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ছিপছিপে চেহারা । অ্যাথলেটিক ফিগার । হাইট আন্দাজ 5'8" । মনে হচ্ছিল এই ...

ভাইজ্যাগ ২০৪০

ভাইজ্যাগ ২০৪০ অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ। সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদ...

ভগবান ও শয়তানের লড়াই

ভগবান ও শয়তানের লড়াই ভগবানঃ- পৃথিবীটাকে কেন ধীরে ধীরে শেষ করে দিতে চাইছিস? আর কত! থামা এবার! প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির উপর নিজের প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করছিস ক্রমাগত। ওরে শয়তান কবে শেষ হবে তোর এই লীলা খেলা? শয়তানঃ- তুই শালা নিজেকে কি ভাবিস বে? শালা উদগান্ডু। অনেক ক্ষমতাবান না তুই! আর আমি পৃথিবীটাকে শেষ করে দিতে চাইছি? ঠিক আছে, তাহলে তাই। বেশ করেছি। এই পৃথিবী, এই জগৎ, এই মহাজাগতিক সব কিছুকে সৃষ্টি করতে কে বলেছিল? জানিস না যেই মুহূর্তে সৃষ্টির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকেই ধ্বংসের দিন, ক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। আর এই কাজটি করি আমি। করছি এবং করতেই থাকব। তোর যখন এত ক্ষমতা, মানুষ যখন তোকে এত পুজো করে, তখন আটকে দেখা দেখি। কিভাবে পারিস দেখি ধ্বংসকে রুখতে। ভগবানঃ- ভুল বলছিস। সৃষ্টি অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যু, দুটোই আমার নিয়ন্ত্রণে। একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টির কাজ করে থাকি আমি। আমার কাজ মানুষকে চিন্তা, ভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক কাজে প্রয়োগ করা। আমি চাই না যে মানুষ আমাকে অন্ধ বিশ্বাসের মতো পুজো করুক। আমি চাই সঠিক আলো, সঠিক পথ অবলম্বন করে এক মানুষ অপর মানুষকে সাহায্য করুক, দুস্থদের...

আমার জীবনে তিন নারী

আমার জীবনে তিন নারী যে কোনও পুরুষের জীবনেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যে কোনও মানুষের জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা ...

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব -        দেবু বাবু শুনছেন! দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না। তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন আছেন য...

মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব

MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব টোংলুর পথে ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো? - দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল। - ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল। - জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল। ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় । - তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম । এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু কর...

প্রেমের কিছু কথা ও গান

প্রেমের কিছু কথা ও গান আজ হঠাৎ করেই যেন তোমাকে দেখতে পেলাম। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। তুমি একটা দরজার সামনে দাড়িয়ে আছ। বাইরে থেকে আলো এসে তোমার মুখেতে পড়েছে। দুলছে হাওয়ায় তোমার খোলা চুল। আমার ঘর আলো করে দাড়িয়ে রয়েছ তুমি। হাল্কা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি দেখছিলে আমাকে। তোমার সেই প্রাণভোলানো, মনজুড়ানো, সারল্যমাখা হাসি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। যা আজও দিচ্ছে। অনেকসময়েই। মনে হচ্ছিল এক ছুটে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু কেমন করে যাই। আমি যে অথর্ব। এক জড়ভরত। দেখলাম সারা ঘরময় তুমি হেঁটে বেড়াচ্ছ। শিশুর মতো খেলে বেড়াচ্ছ। কি এক অপার্থিব সুখ যেন আমার শরীরে অনুভূত হচ্ছে তোমাকে দেখতে পেয়ে। “হামেশা তুমকো চাহা, অউর চাহা, চাহা, চাহাআআআ...............” গুনগুণ করে গাইতেই থাকছি দেবদাস সিনেমার এই গানটি। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। দেখছি আরশির মধ্যে দিয়ে তুমি আমার দিকে মিটিমিটি হাসছ। সেই তোমার মুক্ত ঝরানো হাসি। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছ তুমি। জানি তা আমারই উদ্দেশ্যে। খুবই ইচ্ছে করছিল জানো তোমার পরশ পেতে। কিন্তু যখনই আরশির কাছে গেলাম ও হাতটা বাড়ালাম, তুমি কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেলে।...

মরীচিকা

মরীচিকা উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক রাখেনি। গার্গীও চায় না। ...

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ হায়দ্রাবাদের  MGBS STOPPAGE পৌঁছানোর পর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম নেক্সট বাসের জন্য যেটা কিনা  হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট পৌছবে। তার মধ্যে নয় নয় করে প্রায় 10/12 বার অটোয়ালারা আমার সাথে দরদাম করে গেছে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে 200 তো কেউ 150 তো কেউ আবার 300 ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখার্জি দা , চক্রবর্তী দা বলেই রেখেছিলেন যে ভুল করে কক্ষনো অটোতে চাপতে যাবে না। তোমার ফ্লাইট যখন সকাল আটটার পর তখন তুমি ভোর চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত MGBS এ অপেক্ষা করবে পরের বাসের জন্য। বাস এসে পড়লে তাতে উঠে পড়বে। ভাড়া হয়তো নেবে পঁচিশ থেকে তিরিশ টাকা কিংবা বড়জোর চল্লিশ টাকা। তাছাড়া অটোর থেকে অনেকগুণ আগেই গন্তব্যে পৌছে যাবে। আমিও তাই করলুম। বাস আসলো পাঁচটা দশ নাগাদ ভোরবেলায়। ভোরবেলার সদ্য প্রস্ফুটিত আলোয়  হায়দ্রাবাদ  শহরটিকে দেখতে দেখতে , খানিক ঢুলু ঢুলু চাহনিতে , ঝিমোতে ঝিমোতে পৌছে গেলাম হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট সকাল ছটা পনেরো নাগাদ। মুখার্জি দা বলেছিলেন :- - এয়ারপোর্ট গিয়ে দেখবে লোকাল কিছু বাস দাড়িয়ে আছে। সেগুলো তোমাকে ড...

মুঠো ফোন

মুঠো ফোন ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি । তার পাশে কমন স্পেস দিয়ে ঘরে যাওয়ার রাস্তা । দোতলায় উঠে সিঁড়ির ঠিক দ্বিতীয় কি তৃতীয় ধাপে বসে থাকে ও। মানে অসীম , আমাদের অসীম কুমার । হাতে একখানা স্মার্ট ফোন সঙ্গে একটা হেডফোন , কানে গোঁজা ।রোজ রাত দশটার পর থেকে চলে গল্প কথন , মন দেওয়া নেওয়ার খেলা , হাসি , ঠাট্টা , মুখ ভেংচানো , দূরভাষ যন্ত্রে একে অপরের চলচ্ছবি দেখা । স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন তো শুধু শোনা নয় বরং একে অপরকে বেশ ভালভাবেই কাছে পান প্রেমিক যুগল বা আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , বাবা মা ইত্যাদি ইত্যাদি । একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলায় আসবার সময় কোন একজনের পদচারণার শব্দ । রমিত চাটুজ্জের প্রবেশ ।দোতলায় অসীম কুমারের সামনে আসে রমিত ।ওকে জিজ্ঞাসা করে .........."বলি হ্যাঁরে হতভাগা , আর কত কষ্ট দিবি ক তো ওই যন্তরটারে ? " " রমিত দা আবার এসে শুরু করলে ? খাওয়া হয়ে গেছে যখন , যাওনা গিয়ে শুয়ে পর এবার।" - অসীম বলল। রমিত - " হ্যাঁরে পোড়ারমুখো আমারে দেইখ্যা জ্বলন তো হইবই। অহন তুই চাইনার মাইয়াটার লগে প্রেম করতাছস্ , আমি হইলাম গিয়া কাবাব মে হাড্ডি , জ্বলন তো হইবই।...