বেনীমাধব – কেবলমাত্র প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
হঠাৎ করেই মাঝরাত্রে
ফোনটা আসে অপুর কাছে। নার্সিংহোম থেকে। হন্তদন্ত হয়ে কোনোরকমে একটা বন্ধুর বাইক
জোগাড় করে নার্সিং হোমে পৌঁছায় অপু। রাত দেড়টা। নার্সিং হোমে ছোট্ট রিসেপ্সন কাম
ভিজিটরস রুমে লোকজন এখন অনেকটাই কম। রিসেপ্সনে পেশেন্টের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবার
জন্য অপু জাস্ট একটু এগিয়েছে এমন সময় ওদের চারজনকে দেখল ও। হ্যাঁ মুখগুলো চেনা
চেনা লাগছে অপুর। ওরা এক এক করে অপুর দিকে এগিয়ে এল। এই চারজনের মধ্যে একজনের নাম
তন্ময়। তন্ময়ই পুরো ঘটনাটা অপুকে বুঝিয়ে বলল। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে
কোনও এক সময়ে বেনীমাধব অত্যধিক পরিমাণে ড্রিংক করে মেসবাড়ির চারতলার ছাদে যায় ও
সেখান থেকে নীচে পাশের বাগানটায় ঝাঁপ মারে। আত্মহত্যার চেষ্টা। মেসের বেশ কিছু
ছেলে জেগে থাকায় ওরাই পাশের বাগানটায় দৌড়ে আসে ও বেনীমাধবকে রক্তাক্ত ও অচৈতন্য
অবস্থায় দেখতে পায়। তারপর তড়িঘড়ি করে কাছাকাছি এই নার্সিং হোমে ভর্তি করে ওকে।
তন্ময় ছেলেটিই উদ্যোগ নিয়ে এই কাজগুলো করেছে। এছাড়া ফোন করে বেনীমাধবের বাড়ির
লোকজন ও কাছাকাছি বন্ধুবান্ধবকে জানায় এই খবরটা। অপু জিজ্ঞাসা করে – “কাকু
কাকিমাকে কি খবরটা জানিয়েছ?”
“হ্যাঁ জানিয়েছি। ওনারা
অলরেডি রওনা হয়ে গিয়েছেন শ্রীরামপুর থেকে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত এসে পড়বেন।
শ্রীরামপুর থেকে বেলঘরিয়া খুব বেশিক্ষণ তো লাগবার কথা নয়”।
একা বসে ভাবতে থাকে অপু।
কানের কাছে যেন স্পষ্ট শুনতে পায় বেনীমাধবের সামান্য মেয়েলী কণ্ঠস্বর। “তোর নামটা
না খুব সুন্দর জানিস, অপু। ভালনামটাও। অপূর্ব ব্যানার্জি। I love this name. কেন জানিস?”
“কেন?”
“আরে বিভুতিভূষণ পড়িসনি?
পথের পাঁচালী, দেখিসনি? সত্যজিতের অপু ট্রিলজি।
“হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক।
বাঙালির কাছে অপু একটা ফেমাস নাম বটে”।
“অপুকে নিয়ে কত রিসার্চ
হচ্ছে আজকাল জানিস তো। কৌশিক গাঙ্গুলি তো ‘অপুর পাঁচালী’ বলে একটি ছবিই বানিয়েছেন
অপুকে নিয়ে”।
“হ্যাঁ দেখেছি সিনেমাটা।
পথের পাঁচালীর অপু অর্থাৎ সুবীর ব্যানার্জির লাইফ নিয়ে ছবি। বেশ ভালো লেগেছে
আমার”।
“সত্যি? তুই আমার বুকে আয়
রে অপু”।
এমন করেই হঠাৎ হঠাৎ বুকে
জড়িয়ে ধরত বেনীমাধব অপুকে। ভীষণ ইমোশনাল ছিল। খানিকটা সেন্টিমেন্টালও বোধহয়। অনেক
গুণ ছিল বেনীমাধবের। তা সে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে কবিতা লেখা, গান করা, ভালো ভালো
বিদেশী সিনেমা দেখা বা বইপড়া, যাই হোক না কেন। মাঝে মাঝে মেসেতে নিজেই রান্না করত
বেনীমাধব। সেইসময় অপু আসত নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। দারুণ ছিল রান্নার হাত
বেনীমাধবের। মাংস রান্না হলে আঙ্গুল চাটতেই থাকত সবাই। বেনীমাধবের সবচেয়ে বেশি শখ
ছিল ফটোগ্রাফি ও ফিল্মের প্রতি। খুবই ভালবাসত ও সত্যজিত রায় ও ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি।
ঋতুপর্ণকে নিজের আইডল মনে করত বেণী। ওর চলন-বলন ও আদবকায়দাও ছিল একটু মেয়েলী।
বেনীমাধবকে এফিমিনেট অর্থাৎ মেয়েলী পুরুষ বলা যেতেই পারে। তবে একটা বিষয়ে অপু
কোনদিনই দৃঢ় সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বেনীমাধবের ব্যাপারে। অপুর অনেকবারই মনে হয়েছে
বেনীমাধব কি আদৌ স্বাভাবিক নাকি হোমো সেক্সুয়াল। কিন্তু বেণীর সাথে মিশে সেরকম
কোনও আচরণ ওর চোখে পড়েনি। বেণী কোনদিনই অপূর্বর সাথে এমন কোনও আচরণ করেনি যা দেখে
ওকে হোমো সেক্সুয়াল মনে হতে পারে। কিন্তু বেণীর পছন্দ, অপছন্দ ওর চলাফেরা সব কিছুর
মধ্যে কিরকম যেন রহস্য রয়েই গেছে। মাথায় বড় চুল রাখত বেণী। মাঝখানে চেরা সিঁথি। মাথার
পেছনে ছোট করে পনিটেল। রোজ সকালে উঠে যোগাসন করত বেণী। সুঠাম চেহারা ছিল ওর। হাইট
ও তো বেশ ভাল। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। তাই বেণীর সম্পর্কে অপুর ধারণা আবছা এক আলোছায়ার
মধ্যেই যেন রয়ে গিয়েছে। বেণীর ল্যাপটপে গে সেক্সের পর্ণগ্রাফিও নজরে পড়েছে অপুর।
অপু সরাসরি একদিন জিজ্ঞাসাও করেছিল ‘তুমি এইসব দেখ? একটা ছেলের সাথে আরেকটি ছেলের
শারীরিক সঙ্গম দেখতে ভালো লাগে তোমার?’
“আরে না। এক বন্ধু বেশ
কিছু বিদেশী সিনেমা দিয়েছিল সিডিতে। সেখান থেকেই কপি পেস্ট হয়েছে বোধহয়। রাখ না
ওসব। তোদের নর্মাল সেক্সের ভিডিও দেখলে দেখতে পারিস। I don’t mind. যদিও আমি তোর
থেকে বছর পাঁচেকের বড়। দাদার মতো। তবুও এক্ষেত্রে
ছাড় দিলাম তোকে”।
‘তোদের নর্মাল সেক্সের’
এই কথাটাতে কি এক তীব্র শ্লেষের চিহ্ন ছিল না সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে, যা
অপুকে ভাবিয়েছে অনেক কিছু কিন্তু কোনও সদুত্তর পায়নি কখনও। ঠিক যেমন করে আজও কোনও
সদুত্তর পাচ্ছে না অপু এই আত্মহত্যার চেষ্টার কারণ কি হতে পারে সেই নিয়ে। মাস ছয়েক
হয়েছিল কোলকাতার এক নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় ফটোগ্রাফার হয়ে কাজ শুরু করেছিল
বেনীমাধব। এছাড়া বিভিন্ন ছোটখাটো ফার্মের সঙ্গে ফ্রিল্যান্সার হয়ে কাজ করত বেণী।
নিজের নামটাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সামনে বেশ রসিকতাও করত। কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে
অনেকটা মেয়েলী ঢঙে হেঁটে বেড়াত আর গুনগুণ করে গান করত “আমার যেমন বেণী তেমনি রবে
চুল ভেজাব না”। বেণীমাধবের চেহারাটা ছিল প্রচণ্ড পেটাই। ভগবান যেন ছেনিহাতুড়ি
সহযোগে একটি পাথরের টুকরোকে কেটে কেটে তৈরি করেছে ওর চেহারাটাকে। একদম সুঠাম,
নির্মেদ, ঝরঝরে। যা যেকোনো সুন্দরী মহিলাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মেয়েদের সাথে
খুব সহজে মিশে যেত বেণীমাধব। কোন পোশাকের সাথে কোন লিপস্টিক চলবে বা কোন জিন্সের
সাথে কোন টপ পড়তে হবে তা বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে মেয়েদের বুঝিয়ে বলত বেণী।
ইদানীং একটা ঘটনা ঘটেছিল
বেণীর জীবনে। অপুর কাছে ও স্বীকার করেছিল। -
“জানিস অপু, তোদের এই বেণীমাধবের
প্রেমে পড়েছে ভ্রমর”।
“তাই নাকি। এ তো খুব ভাল
খবর। তাহলে তোমার প্রাণভোমরা কি এখন তার হাতে?”
“উহু ব্যাপারটা সেরকম নয়।
আমি বিয়েটিয়ে, সংসার করে আমার জীবনটা নষ্ট করতে পারব না”।
“বিয়ে করলে তোমার জীবন
নষ্ট হতে যাবে কেন?”
“তুই বুজঝিস না। ও ঠিক
আছে, ভালো চাকরি করে। ওর যেহেতু একটা নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে হয়তো ও
আমাকে আমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। তুই তো জানিস আমি একটু একা একা, নিজের
মতো থাকতে ভালবাসি”।
“তা কোথায় চাকরি করে
ভ্রমর?”
“একটা নিউজ চ্যানেলের হয়ে
জার্নালিস্টের জব করে ও। স্পটে গিয়ে নিউজ কভার করাই ওর কাজ। বেশ ঝক্কি ঝামেলার।
কিন্তু ও পারে। মিনমিনে তো নয়। বরং একটু ডাকাবুকো টাইপের”।
“তাহলে অসুবিধাটা কোথায়?
তুমি তোমার মতো থাকবে, উনি ওনার মতো। মাঝে মধ্যে একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে টুরতে গেলে,
একটু খুনসুটি করলে। ব্যস আর কি! একে অপরকে নিজেদের খুশি রাখতে পারাটাই তো জীবন,
নাকি?”
অপু কথাগুলো বলেছিল ঠিকই,
কিন্তু বেণী অপুকে একটা সত্য গোপন করেছিল। ও একটা কাণ্ড করে বসে। ভ্রমরের সাথে এক
রাতের লিভ ইন রিলেশনশিপে যুক্ত হয়। তাও সেই বেলঘড়িয়ার মেসের রুমে। যা মেসের বাকি
ছেলেদের কাছে খুবই দৃষ্টিকটু হয়ে দাড়ায়। কারণ আমাদের সমাজে আজও দুটি পুরুষ বন্ধ
দরজার মধ্যে যদি কোনও ব্যক্তিগত(সেক্সুয়াল হতেও পারে নাও পারে) সম্পর্কে লিপ্ত হয়
তবে তা আজও অপরাধ বলেই গণ্য হয়। ভ্রমর কোন মহিলা নয়, একজন পুরুষ। যা কিনা বেণী
অপুকে গোপন করেছিল। তন্ময়ই সব কিছু বলে অপুকে। বন্ধ দরজার মধ্যে ওরা দুজন মানে
বেণী ও ভ্রমর (যা কিনা বেণীর দেওয়া আদুরে নাম) একে অপরকে লিপ কিস করছিল।
“তোমরা কি করে জানলে ওরা
দুজন লিপ কিস করছিল?
“আমাদের মেসের দুজন ছেলে
বেণীর ঘরের জানলা দিয়ে ওদের ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখছে”।
“তোমরা ওদের পার্সোনাল
লাইফে ইনটারফেয়ার করবার কে?”
“শুনুন দাদা, এটা বেণীর
পার্সোনাল বাড়ি নয়। এখানে পাঁচজনে একসাথে থাকে। যদিও ও সিঙ্গেল রুমে থাকত। তবুও
মেসের বাকি ছেলেরা শুনবে কেন! এরকম রসালো একটা ঘটনা চোখের সামনে ঘটছে কেউ যে কিছু
বলবে না বা করবে না এরকমটা ভাবা যায় কি?”
“তখন তোমরা কি করলে?
প্রতিবাদ জানালে?”
“প্রথমে তাই করা হয়েছিল।
ওদের দুজনকে সাবধান করবার পরে তোমাদের ভ্রমর যার আসল নাম রঞ্জন ও চলে গেল।
ব্যাপারটা এখানে মিটে গেলেই ল্যাটা চুকে যেত। গণ্ডগোলটা বাঁধল ডিনার করবার সময়।
মেসের কোনও এক হনু মোবাইল ক্যামেরায় ওদের দুজনের সেই আপত্তিকর দৃশ্য সবাইকে দেখাতে
শুরু করল বেণীর সামনেই। লজ্জায় ও অপমানে বেণী তখনই ভাতের থালা ফেলে দিয়ে ঘরে ঢোকে
ও বেসামাল ভাবে ড্রিংক করে। এদিকে বাইরে সবাই এই নিয়ে খুব হাসাহাসি শুরু করে। যা
বেণীকে একেবারেই কোণঠাসা করে দেয়। এর প্রায় ঘণ্টাখানেক বা ঘণ্টাদেড়েক বাদেই এই
সুইসাইডাল অ্যাটেম্পট”।
“তোমরা কি বুঝতে পারছ না
যে এটা এখন পুলিশের আওতায় চলে গিয়েছে?”
“জানি, বুঝতেও পারছি।
অলরেডি পুলিশে খবর পৌছিয়েও গেছে। দেখুন এতে পুলিশ যা করবার করবে। আমরা নিজেরা
আগবাড়িয়ে কিছু বলব না বা করব না বলে ঠিক করেছি। আপনাকেও সেটাই অনুরোধ করছি। দয়া
করে আপনি কোনও স্টেটমেন্ট দিতে যাবেন না। এটা মেসের ব্যাপার মেসেই বুঝে নিতে দিন”।
হতবাক অপু চুপচাপ দাড়িয়ে
থাকে। এক নিরপরাধ ছেলের এরকম দুর্গতির কথা ভেবে সমাজকে মনে মনে গাল মন্দ করা ছাড়া
আর কি বা করতে পারে সে এখন! আজ বেণী যদি এই একই ঘটনা একটা মেয়ের সাথে করত তাহলে কি
এই পরিণতি থেকে বেঁচে যেত ও?
প্রেমাংশু.........।।
নতুন কিছু শিখলাম প্রেমাংশু দা। ধন্যবাদ। সমাজ কে দিস্টিকন পরিবর্তন করতে হবে।যে যেমন তার তেমন ই বাঁচার অধিকার আছে। সমাজ টা সবার।
ReplyDeleteThank You for reading & commenting this in my blog....
ReplyDeleteবেশ সুন্দর গোছানো লেখা!
ReplyDeleteDada, Thank you very much.
Delete