অবক্ষয়
মাথার ভেতরটা কেমন যেন
করছে। চুল ছিড়ে নিতে ইচ্ছে করছে। শিল্প যে সবার দ্বারা হয় না। তাহলে কেন যে এতদিন
ধরে নিজের ভেতরের সত্তাটাকে লুকিয়ে রেখেছিল। জীবনের কত সময় চলে গেল। বয়ে গেল কত
নদীর জল। সময় যে আর নেই। এই লকডাউনের মধ্যে ঘরে থাকতে থাকতেই না কত লোকের মৃত্যু
সংবাদ আসবে। প্রেমহীন, আত্মীয়স্বজনহীন, বন্ধু বান্ধবহীন এ জীবন যে আর সহ্য হয় না।
কিন্তু হয়ত এটাই ভবিতব্য। পৃথিবীর মানুষের ললাটলিখন এখন শুধুই মৃত্যু। ‘দশভিদানিয়া’
বলে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিল ললিত। গল্পের প্রধান নায়ক একজন ক্যান্সার
সারভাইভার। মাস দুই কি তিন হয়ত তার জীবনকালে বাকি। ক্যান্সার হয়েছে জানতে পেরে
জীবনে আসে চূড়ান্ত ডিপ্রেশন। সর্ব মুহূর্তে মনে হতে থাকে কেন বেছে বেছে ওর জীবনেই
এরকম এক বিয়োগান্তক অধ্যায় আসতে হল। নায়কের জীবনে নারী বলতে কেউ নেই একমাত্র নিজের
বুড়ি মা ছাড়া। কেই বা দেখবে ওর মা’কে। হঠাৎ করে এক সকালে নায়ক নিজের সাথেই কথা
বলে। ওর ভেতরের সত্তা বাইরে বেরিয়ে এসে ওকে বলে এই তিনমাসে ওর জীবনের যা যা অপূর্ণ
স্বপ্ন রয়েছে তা পূর্ণ করতে। গল্পের নায়ক নিজের ডায়েরিতে দশটা স্বপ্ন লেখে যা ও
আগে কোনদিন ভয়ে ও সময়ের অভাবে করে উঠতে পারেনি। সেই স্বপ্ন গুলোর মধ্যে গান শেখা
থেকে শুরু করে প্রথম প্রেমিকাকে না বলতে পারা ভালবাসার কথা, বিদেশ ভ্রমণ, নারীসঙ্গ
ও এরকম আরও অনেক কিছুই ছিল। নায়ক জীবনের এই অন্তিম তিনমাসে এক এক করে দশটা স্বপ্নই
পূরণ করে। এই চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মধ্যেই নায়ক জীবনকে পুরো মাত্রায় উপভোগ করে। ললিতও
যেন এই লকডাউনের সময়ে নিজেকে আবিস্কার করে। স্কুল জীবনে একটু আধটু লিখত। ডায়েরি।
কখনও বা স্কুলের বেঞ্চ বাজিয়ে গান। বন্ধুদের সিটি ও হাততালিতে নিজের উপর গর্ব
অনুভব করত। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ঠিক যেন উত্তমকুমারের ‘চিরদিনের’
সিনেমার সেই গানটার মতন। ‘ফুল পাখী বন্ধু আমার ছিল, আর মেঘ নদী বন্ধু আমার ছিল,
তারা কোথায় গেল, কোথায় গেল, হারিয়ে কোথায় গেল’। সব যেন হারাতে বসেছে ললিত। একটা
ঘরে বন্দী হয়ে পড়ে আছে ও। সারা বিশ্বে লকডাউন চলছে। আইসোলেসন। কোয়ারেনটাইন। ভিনদেশ
থেকে এসেছিল ললিত। বাইরে চাকরি। করোনা নামক ভাইরাসের ভয়ে তড়িঘড়ি সবাইকে এক প্রকার
অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটি দিয়েছিল কোম্পানি। ললিতও পাগলের মতো ছুটে ছুটে আসছিল
নিজেকে বাঁচাবার জন্য। কিন্তু না। শরীরে যদি বেঁধে থাকে করোনার কীট। নিজের শহরে
আসার পর নিরাশার অন্ধকার ছেয়ে ফেলল ওর মনে। যেতে হল কোয়ারেনটাইন এ। শুরু হল বন্দী
জীবন। জানেনা কতদিন চলতে পারে। টেস্ট রিপোর্ট এখনও কিছু বোঝা যাচ্ছে না। যদি
পজিটিভ হয় তাহলে কতদিন ও থাকবে এই পৃথিবীতে! ও জানে না। বোঝে না। মনে পড়ে যায় ‘দশভিদানিয়া’র
কথা। শুরু করে লেখালেখি ফেসবুকে। মোবাইল ক্যামেরাতে নিজের ভিডিও তৈরি করে আপলোড
করে। সত্যি গানের গলা এখনও মানুষের এত পছন্দ হচ্ছে। এও কি সম্ভব! জীবন সায়াহ্নে
এসে এও কি এক পরম প্রাপ্তি নয়। মানুষ বেঁচে থাকে কেন! ওর প্রশ্ন তৈরি হয় মনে। কিছু
করবার জন্য। ও তো করতে পারত। হয়তো হতে পারত একজন ভাল শিল্পী। ভালো গাইয়ে অথবা
লেখক। কিন্তু কেন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন! তা নয়। আসলে নিজেকেই ঠিক চিনতে
পারেনি। ভুলে গিয়েছিল নিজেকে। এখন রোজ ভোরবেলায় ভৈরবী সুর দিয়ে জীবন সুরু করে
ললিত। উজ্জীবিত হয় আশেপাশের ভীত সন্ত্রস্ত মানুষগুলো। নিজের ইচ্ছেমত চিঠি লেখে
অনেককে। চিঠিগুলো জমিয়ে রেখে দেয় আগামী দিনের পৃথিবীর জন্য। স্বপ্ন দেখে একদিন ঝড়
নিশ্চয়ই থেমে যাবে। পৃথিবী আবার শান্ত হবে।
‘ঐ, ঐ ললিত ওঠ। আরে আর
কতক্ষন ঘুমোবি! এই নে ফোনটা ধর। বাড়ি থেকে কাকিমা ফোন করেছেন’।
ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে ওঠে
ললিত। জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাস চলতে থাকে ওর। কানাইদার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মায়ের
সাথে কথা বলা শুরু করে।
‘হ্যাঁ মা বল............
হ্যাঁ কি বলছ......... না লকডাউনের জন্য অফিস যাওয়ার তো বালাই নেই............ওয়ার্ক
ফ্রম হোম চলছে............
প্রেমাংশু............

Comments
Post a Comment