খোলা চিঠি – প্রসঙ্গ CORONA
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী
(দিদি),
আমি ভারতবর্ষের তথা
পশ্চিমবঙ্গের এক নাগরিক হিসাবে কয়েকটা কথা আপনাকে জানাতে চাই। আমি কর্মসূত্রে
বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের শেওপুর বলে একটি জেলায় বসবাস করছি বিগত দুমাস যাবৎ। আমি
একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি করি। বর্তমানে লকডাউন অবস্থায় কোম্পানির
রেন্টএড হাউসে আছি। আমি খুবই ভাগ্যবান যে দেশের এরকম এক আপৎকালীন অবস্থায় মাথার
উপর ছাদ ও পেটের ভাত দুটোই জুটে যাচ্ছে ঠিকঠাক। আমার মতো আরও অনেকে আমার সাথে
রয়েছেন। কেউ ওড়িশা থেকে, কেউ উত্তরপ্রদেশ, কেউ বিহার ও আরও বিভিন্ন রাজ্য থেকে। ঘর
ছেড়ে, পরিবার ছেড়ে থাকবার কারণে সবার মধ্যেই চাঁপা উত্তেজনা, ভয়, উদ্বেগ ইত্যাদি
কাজ করছে। যদিও আমরা সবাই একটা সুরক্ষিত ঘেরাটোপের মধ্যে রয়েছি। আমার ধারণা
ভারতবর্ষের বিভিন্ন কন্সট্রাকশন সাইটে পশিমবঙ্গের শ্রমিক ভাইয়েরা সবচেয়ে বেশি
সংখ্যায় কাজে নিযুক্ত। কারণ বিগত কয়েকবছর ধরে কাজের তাগিদে, পেটের খিদের তাগিদে
বাংলার বহু সংখ্যক মানুষ ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস করছেন। কারণ হিসাবে বলা
যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্ব। যা কিনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই মুহূর্তে
মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও আরও অনেক রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের
বাঙ্গালী শ্রমিক ও মজদুরের সংখ্যা অনেকটাই। পৃথিবী তথা ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটা
রাজ্যই আজ করোনা নামক মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত। যে কারণে মানুষের মধ্যে ভয়,
উত্তেজনা, উদ্বেগ চরমে। সাধারণত শ্রমিকেরা ঠিকাদারদের কাছে কাজ করে ও সেই মতো
দৈনিক হিসাবে মজুরি পায়। গোটা ভারতবর্ষ লকডাউন হওয়ার কারণে এইসব ঠিকাদারেরা
শ্রমিকদের কাজ থেকে বহিষ্কৃত করেছেন। ঠিকাদারদের হয়ত সম্পূর্ণ ভাবে দোষ দেওয়াও
যাবে না। কারণ কোম্পানিগুলো ঠিকাদারদের সঠিক সময়ে বিল পেমেন্ট করতেও পারে না। এর
কারণস্বরূপ ভারতবর্ষের অর্থনীতি অনেকাংশে দায়ী। যদিও আমার অর্থনৈতিক জ্ঞান নেই
বললেই চলে। নিজের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। আজ তিনদিন ধরে টিভি ও ইন্টারনেট
মাধ্যম থেকে জানতে পারছি যে এই শ্রমিকভাইদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা না কোনও ঠিকাদার
করেছে, না প্রশাসন, না সরকার, না মানুষ। এই গরীব মানুষগুলো ভয়ে, উদ্বেগে ভুখা
পেটেই কেউ ২০০ কিমি, কেউ ৫০০ কিমি কিংবা কেউ ১০০০ কিমি পর্যন্ত হেঁটে নিজের ভিটেতে
যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ তো আরেক চরম সঙ্কট অবস্থা। যা কিনা করোনার থেকে কিছু
অংশে কম নয়। মানুষ খালি পেটে এতটা পথ হাঁটবে কি করে? এ তো পুরোপুরি অশনিসঙ্কেত।
দুদিন পর তো এই মানুষগুলোর শারীরিক অবক্ষয় আরও তলানিতে ঠেকবে। এরপর হয়ত (ঈশ্বর না
করুক) দেখতে হতে পারে রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা বাঙ্গালী শ্রমিকের লাশ।
মাননীয়া দিদি কিছু একটা
করুন এই মানুষগুলোর জন্য। যেভাবে হোক এই দিন আনা, দিন খাওয়া, খেঁটে খাওয়া
মানুষগুলোকে ঘরে ফিরিয়ে আনুন। আমি নিজে পরিবার, পরিজন ছেড়ে, আমার সাধের বাংলা ছেড়ে
বাইরে পড়ে আছি বলে আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছি আমার অভিভাবক, স্ত্রী, কন্যার
উদ্বেগ। এখনও আমরা জানিনা ভারতবর্ষে লকডাউন কতদিন চলবে! এরপর বিশ্ব তথা ভারতবর্ষের
অর্থনৈতিক পরিকাঠামো কোন জায়গায় পৌঁছবে! কিন্তু ঘরের মানুষগুলো যদি ঠিক ঠিক সময়ে
ঘরে পৌঁছতে পারে, তাহলে অনেকগুলো পরিবার জীবনের মূলস্রোতে ফিরে আসবার আবারও একটা
সুযোগ পাবে। মাননীয়ার কাছে এটাই আমার একমাত্র আবেদন।
ইতি
ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গের
এক সচেতন নাগরিক
প্রেমাংশু দেবনাথ।

Comments
Post a Comment