ডিসেম্বর
ডিসেম্বর মাস আমার জীবনের
স্মরণীয় মাস। বিগত প্রায় প্রত্যেক বছর ধরেই ডিসেম্বর আমার জীবনে কিছু উল্লেখযোগ্য
স্মৃতি বহন করে চলেছে। ডিসেম্বর মাস আসলেই আমার জীবন কেমন যেন বদলাতে থাকে।
স্মৃতিবহুল কিছু ঘটনা তো আছেই, কিন্তু জীবনের টার্নিং পয়েন্ট এই ডিসেম্বরেই হতে থাকে।
বেশ কয়েকবার হয়েছে। এই ডিসেম্বরেই আবারও এক নতুন পথে চলা শুরু হবে। আবারও এক নতুন
জীবন। বাংলায় একটি কথা আছে। স্মৃতি সতত সুখের। আমার জীবনে সুখ স্মৃতি এই মাস বহন
করেছে বহুবার। একটা বেশ করুণ মনঃকষ্টের স্মৃতি আছে এই মাসেই। তবে থাক আজ আর সেটা
নিয়ে কোনও আলোচনা করতে চাই না। সম্প্রতি নতুন একটা চাকরীতে নিযুক্ত হতে চলেছি এই
মাসেই। সেই জন্যেই টার্নিং পয়েন্ট শব্দটা ব্যবহার করলাম। প্রত্যেক বছরই নিউ ইয়ার
রিজল্যুশন করেন বহু মানুষজন। আমি সেরকম ভাবে কিছু করিনা। আমি যদি কিছু করি তো সেটা
প্রতিটি দিনের রিজল্যুশন। বছরের শুরুতে প্রতিজ্ঞা করে বাকি সময়টা ভুলে গেলাম তাহলে
তো চলবে না। তাই আমার মনে হয় একেকটা দিন আমার কাছে একেকটা জীবন। একের মধ্যে বহুতে
বিশ্বাসী আমি। তাই প্রতি মুহূর্তে প্রতি সময়ে যদি মানুষ নিজেকে সুন্দর করে তুলতে
পারে তবে মানুষের জীবনে বেঁচে থাকটা বেশ আনন্দের হয় বলে আমার মনে হয়। কর্ম ও
ভাগ্যের লড়াই চিরকালীন। মানুষ কর্মের মাধ্যমে তার ভাগ্যকে সবসময় করায়ত্ত করতে চায়।
কিন্তু ভাগ্যদেবী সবসময় ধরা দেন না। জীবনের কোনও কোনও মুহূর্তে, কোনও কোনও সময় সে
টুক করে চলে আসে যা হয়ত আমরা কল্পনাও করতে পারিনা। সেই বিশেষ মুহূর্ত বা বিশেষ সময়
আমার জীবনে ডিসেম্বর মাস। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এই ডিসেম্বর মাসের আঠার তারিখে
যাত্রা শুরু করেছিলাম সান্দাকফুর উদ্দ্যেশে। দি স্মৃতি অফ সান্দাকফু আমার জীবনের
এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। যা হয়ত আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখব। যদি না
বিস্মৃতি আমাকে গ্রাস করে। পাঁচ বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম সান্দাকফু। জীবনে প্রথমবার
ট্রেকিংএর অভিজ্ঞতা। বেশ রোমাঞ্চকর। আগে লিখেওছি এ নিয়ে। আমার মনে হয় প্রত্যেক
মানুষেরই উচিত জীবনে একবার অন্তত হেঁটে হেঁটে পাহাড়ে চড়া। পাহাড়ে চড়ে চড়াই উতরাই
পেরনো আর জীবনের ওঠা পরার মধ্যে কেমন যেন একটা সামঞ্জস্য আছে। খুব মিল পাই আমি এই
দুয়ের মধ্যে। যখন মনে হয় আর পারছিনা, হাঁফ ধরে আসছে, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস খুব দ্রুত
ছুটে বেড়াচ্ছে, ঠিক তখনই একটা নতুন বাঁক। হয় তা নিয়ে যায় কোন সমতলে অথবা নিয়ে যায়
কোন উতরাই রাস্তায়। কিংবা পথ দেখায় কাছাকাছি কোনও গন্তব্যের। আমাদের জীবনটাও যে
ঠিক এরকমই। চলতে চলতে ঠিক নতুন কোন পথ বা রাস্তা এসেই যায় আমাদের জীবনে। যা দেয় এক
দারুণ স্বস্তি। খুব মসৃণ লাগে পথ সেই মুহূর্তে। ভীষণ ভালো লাগে সেই স্বস্তির
মুহূর্ত। মনে হয় জীবনটা বৃথা নয়, এর পরতে পরতে আছে সৌন্দর্য। যা অনবরত খুঁজে চলাই
আমাদের কাজ।
তো যা বলছিলাম। ডিসেম্বর
২০১৬ সালে সান্দাকফু ট্রেক। তার পরের বছর হচ্ছেনা হচ্ছেনা করেও ৪ঠা ডিসেম্বর ২০১৭
তে বিয়ের পিড়িতে বসলাম। বলেছিলাম না ভাগ্যদেবী কখন কার জন্য কি ঠিক করে রেখেছেন তা
উনিই একমাত্র জানেন। ২০১৮ ডিসেম্বর আমি এবং আমার স্ত্রী, আমরা দুজনে আমাদের
সন্তানকে নিয়ে আসবার প্রস্তুতি নিলাম। হঠাৎ করেই হয়েছিল। এখন ২০১৯। এবছর আবার সেই
নতুন গন্তব্যে যাত্রা। ও ভুলে গিয়েছিলাম। ২০১৪ ডিসেম্বর। আমার প্রথম দার্জিলিং
দেখতে যাওয়া। এটাও একটা চিরস্মরণীয় ঘটনা হয়েই থাকবে আমার জীবনে। আমি এবং আমার এক
বন্ধু হরেকৃষ্ণ দুজনে মিলে গিয়েছিলাম দার্জিলিং। মাত্র দুদিনের ডিসিশনে। ওর সাথে
একদিন দেখা হল। সে ব্যাটাও তখন বিয়ে করেনি। বললাম এবছর আমাদের না যাওয়া হল
সান্দাকফু না যাওয়া হল দার্জিলিং। দুম করে বলে বসল তাহলে চ। চ চ করতে করতে চলেই
গিয়েছিলাম দার্জিলিং। দার্জিলিং এর ম্যাল থেকে শুরু করে মার্কেট, দার্জিলিং
ষ্টেশন, বেশ কিছু টি গার্ডেন ঘুরেছিলাম আমরা একদম পায়ে হেঁটে। আমরা যে হোটেল এ
ছিলাম সেটা বেশ উঁচুতে ছিল। ম্যাল যাওয়ার রাস্তা থেকেও আরও অনেকখানি চড়াই রাস্তা
হাঁটবার পর সেখানে যাওয়া যেত। সেই প্রথম দার্জিলিং যাওয়া এবং সেখানে পায়ে হেঁটে বিভিন্ন
জায়গায় ঘোরা। এ এক অন্যরকম অনুভুতি ছিল আমার জীবনে। ফিরে আসবার আগের সন্ধ্যেতে কি
করব কি করব ভাবতে ভাবতে চলে গেলাম আইনক্স সিটি সেন্টার। গিয়ে দেখলাম আমীর খানের
পিকে সিনেমা চলছে। দুজনে মিলে ঢুকে গেলাম। ভাবুন দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে আমীর খানের
সিনেমা দেখে এলাম। তখন প্রচুর ঠাণ্ডা দার্জিলিঙে। ১/২ ডিগ্রি এবং রাতের সময়
হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা। সিনেমা দেখে ফিরতে ফিরতে রাত হয়েছিল বেশ। হেঁটে হেঁটে
পাহাড়ি চড়াই রাস্তায় উঠছি। বেশ খাঁড়াই রাস্তা থাকে মাঝে মাঝে। যেগুলোকে বলা হয়
শর্টরুট। হরেকৃষ্ণ এসব রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ওস্তাদ। আমি তো ওর সাথে ঠিক পেরে
উঠছিলাম না। তবুও যেতে তো হবেই। কনকনে ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ম্যাল যাওয়ার
কাছাকাছি মেন রোডে চলে আসলাম। হরেকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করেছিল ‘কি রে প্রেম আজ রাতে হবে
নাকি? যা ঠাণ্ডা পড়েছে’। আমিও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। রাতের বেলায় হোটেলে ফিরে বসেছিলাম
বোতল নিয়ে। ১০০ পাইপারস। ওই একদিনই। তার ঠিক পরের বছর ২০১৫ ডিসেম্বর মাইথনে
প্রোজেক্ট শেষ করলাম। কিছুদিনের জন্য চলে গিয়েছিলাম বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে।
তবে ঘুরতে নয়। অফিসের কাজে।
তাই বলছি ডিসেম্বর আমার
জীবনের এক স্মরণীয় মাস। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এরকম কিছু না কিছু স্মৃতিবিজড়িত
দিন বা মাস বা বছর রয়েছে, যা আপনার জীবনকে এক আলাদা মাত্রা দেয়। যদি মনে হয় তাহলে
শেয়ার করতে পারেন আমার সঙ্গে এই পোস্টের কমেন্ট বক্সে।

Comments
Post a Comment