কি ভীষণ আলো ঝলমলে, কত মানুষজন, কি ভীড় বাপরে বাপ! সামনে এগুলো কি? বড়ো বড়ো পুতুল! না তো এগুলোকে মডেল বলে। চিনামাটির কাপ প্লেটের মতো গায়ের রং। একদম ধবধবে সাদা মনে হচ্ছে। তার ওপরে কি রকম কালো কালো ধূসর বর্ণের জামাকাপড় পড়ানো রয়েছে। পাশে আবার সোনার গহনার দোকান রয়েছে মনে হচ্ছে। কি যেন নাম দোকানটির? "গোল্ড মিউজিয়াম জুয়েলার্স"। আচ্ছা বেলঘরিয়ার ফিডার রোডে এরকম নামের একটি দোকান রয়েছে না! হ্যাঁ রয়েছে তো। তাহলে সেই গহনার দোকানটা এখানে কি করছে! আর এটা এত বৃহদাকার, সুসজ্জিত, পাশাপাশি অনেকগুলো দোকানের মধ্যে কি করছে? ওই দোকানটা তো বেলঘরিয়ার ব্যাঙ্ক অফ বরোদার বিপরীতে অবস্থিত ছিল। ওরে বাবা, এগুলো আবার কোথা থেকে এল! এ যে প্যান্টালুনস, বিগ বাজার তারপর আরও কত কি। মোর অ্যান্ড মোর। ও আচ্ছা, সব বাজার একত্রে। তাই এত ভীষণ আলো ঝলমলে, এত মানুষজন, এত ভীড়। হ্যাঁ হ্যাঁ এবারে মনে পড়েছে। সামনে তো দুর্গাপুজো। তাই সবাই এখানে জমায়েত হয়েছে। এখানে তো সবসময়ই শুধু সেল, সেল আর সেল। সবাই শপিং এ ভীষণ ব্যস্ত। অ্যা, এইবারে মনে পড়েছে একটু একটু করে। এই লিফটে করে ওপরে উঠে আসা জায়গাটার নাম শপিং মল। 'মল'। ইস কি নোংরা, কি বিচ্ছিরি জিনিস। আরে নোংরাই তো। সেই জন্যেই তো মলে এসে বাড়ির কর্তাদের পেছন হলুদ হয়ে যায়। শপিং মলে এসে নিজেদের মলের শ্রাদ্ধ আর কি। মানুষগুলোকে দেখে মনে হয় পৃথিবীতে এদের চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। আচ্ছা ,সত্যিই কি তাই? শপিং মলে আসা মানুষগুলো কি সবাই খুব সুখী। তাই যদি হবে তাহলে যারা সর্বত্র মানুষের পকেট কাটার উদ্দেশ্য নিয়ে সবার পেছনে হয় ক্রেডিট কার্ড বা লাকি কুপনের প্রলোভনে প্রলোভিত করে চলেছে তারা কি সুখী? না কেউ সুখী নয়। সবাই সুখের পেছনে শুধু ছুটে বেড়াচ্ছে। অ্যাকোরিয়ামের মধ্যে থাকা মাছগুলো যেমন কোনও কিছু একটা পাওয়ার আশায় ছুটে বেড়ায় ঠিক সেইরকম। আচ্ছা আমরা এখন কোথায়? আমরা এখন শপিং মলে।
শপিং মল? কি ভাবে এলাম?
ওই তো সিঁড়ি বেয়ে।
সিঁড়ি? কোথায়?
ওই তো, দেখতে পাচ্ছিস না?
হ্যাঁ তাই তো। চল তো যাওয়া যাক তবে।
আরে এ সিঁড়ি তো একদম নীচে চলে গেছে।
হ্যাঁ ওপরে শপিং মল। নীচে তে গঙ্গার জল।
হ্যাঁ তাই তো। আরও নীচে নামলে এ যে জল টলমল করছে।
একদম ঠিক বলেছিস। মল-টল ভুলে আমরা বরং এখন জল টলমল দেখি। ওরে এ কোথায় এলুম রে। হ্যাঁ। এ যে মাথার উপরে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এ তুই কোথায় গেলি। আমায় ছেড়ে যাসনে।
আমি? এই তো আমি। তোকে ছেড়ে আমি আলাদা কোথায় হলুম! আমি যে তোর মধ্যে বিলীন হয়ে আছি।
আছিস? আমার মধ্যেই আছিস? তাহলে ওপরের শপিং মলের ওই জনকোলাহল কোথায় গেল? সব কেমন যেন শান্ত লাগছে। আরে ওই তো সেই গোল্ড মিউজিয়াম জুয়েলার্সের মানুষগুলো। ওরা গঙ্গার জলে দাড়িয়ে কি করছে? মহালয়ার পিতৃতর্পণ বোধহয়। আর সেই মানুষগুলোও রয়েছে যারা "দাদা ক্রেডিট কার্ড লাগবে" বলতে বলতে শপিং মলের মধ্যে আমাকে ধাওয়া করেছিল। ওরাও তো রয়েছে। সব গঙ্গার জলে। নিজেদের শুদ্ধ করতে। আচ্ছা এই সিঁড়ি বেয়ে আবার যদি ফিরে যাই তাহলে আবার সেই শপিং মলে ফিরে যেতে পারব?
না। ওই পথ কৈলাসের পথ।
মানে স্বর্গের সিঁড়ি বলছিস?
হ্যাঁ ঠিক তাই। ওখান দিয়ে এখন মা দুর্গা আসবেন সপরিবারে। দেখছিস না পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়ে গেল। ওই শোন আকাশবানীতে মহিষাসুরমর্দিনী। বীরেন্দ্র ভদ্রের চণ্ডীপাঠ। গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে আমার।
--' এ বাবু কি বিড়বিড় করছিস ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে? বীরেন্দ্র কৃষ্ণের চণ্ডীপাঠ? মহালয়া আবার সামনের বছর হবে। আজ যে বিজয়া দশমী।'
সকলকে বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
Comments
Post a Comment