দুদিন আগে ছিল ভূতচতুর্দশী। তা আমার এক বন্ধু বলছিল ভূত নিয়ে কিছু লেখালেখি করতে। সত্যি বলতে ভূত সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ কোনও অভিজ্ঞতা এ জীবনে এখনও ঘটেনি। কিন্তু সিকিম থেকে ফেরবার পথে দার্জিলিংয়ের পেডং শহরে একবার এক গা ছমছমে অনুভূতি আমার হয়েছিল। সেটা নিয়েই বরং কিছু বলি।
দুহাজার চোদ্দ সালে সিকিম থেকে ফেরবার পথে দার্জিলিংয়ের পেডং শহরে একরাত কাটিয়ে ছিলাম। চড়াই উতরাই রাস্তা। পাহাড়ের কোলে একটা হোম স্টে ছিল। সিলারি গাঁও বলে একটি গ্রামের পাশে। সম্ভবত জায়গাটির নাম জলেপলাই। সেই পাহাড় ঘেরা গ্রামে যখন খুশি মেঘের আনাগোনা চলতো। হয়তো ঘরে বসে আছি। মেঘ এসে কখনো মাথায়, কখনও চুলে কখনও মুখে এসে ছোঁয়া দিল। বেশ লাগছিল সেই মুহূর্ত। সেইদিন বিকেলে আমরা চারপাঁচ বন্ধু গ্রামের কাছাকাছি মার্কেট থেকে সামান্য কিছু কেনাকাটা করে উতরাই রাস্তা বরাবর সেই হোম স্টে তে ফিরছি। সূর্যের আনাগোনা শেষ হয়ে সন্ধ্যা খুব গাড়ো হয়ে এল। ধীরে ধীরে তা একদম নিকষ কালো অন্ধকারে পরিণত হল। শীতের সন্ধ্যা। আশেপাশে বিভিন্নরকম পোকামাকড় ও ঝিঝিপোকার ডাক। আঁকাবাঁকা পথের পাশে বিশালাকার পর্বতাঞ্চল। বিস্তর ঘন জঙ্গল। উতরাই রাস্তায় আমাদের তখনও আরও তিন চার কিমি হাঁটা বাকি। হঠাত্ করে শতদল সবার উদ্দেশে বলে উঠল যে এরকম জায়গায় শেয়াল, চিতাবাঘ, হায়েনা ও রেড পান্ডার আনাগোনা লক্ষ করা যায়। সুতরাং আমরা যেন একটু তাড়াতাড়ি হাঁটি। তাতে আমরা একটু তাড়াতাড়ি হাঁটা লাগালাম। কিন্তু অন্ধকারে সামনে চারপাঁচ হাত দুরের লোককে ঠাহর করতে না পারার দরুন হন্টন বেগ কমাতে হল। হাতে না আছে টর্চ না আছে কোনও লাঠি। সামনে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। চারবছর আগে সবার হাতে স্মার্ট ফোনও ছিল না। আমরা পাঁচজন ছিলাম। আমি, হরেকৃষ্ণ, তন্ময়, শতদল এবং সর্বাশীষ। শতদল এবং সর্বাশীষের হাতে স্মার্ট ফোন ছিল। আমাদের সাধারণ ফোন। সন্ধ্যা সাড়ে ছটা থেকে সাতটা হবে তখন। আগেই বললাম একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। সর্বাশীষ ফ্ল্যাশ লাইট অন করল ওর মোবাইলে। সেই পাহাড়ি রাস্তায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওই সামান্য আলোতেই যে যার মতো হাঁটার স্পিড বাড়ালাম। আমি ছিলাম সবচেয়ে বেঁটে মানুষ। তাই লম্বা লম্বা পায়েদের সঙ্গে পারব কেন। এর মধ্যে হরেকৃষ্ণ ও শতদল নিজেদের মধ্যে দৌড়ানোর রেস শুরু করল। কে আগে পৌছায়। এক ধরনের বচপনা। যা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। বাকি তিনজনের মধ্যে সর্বাশীষ তখন একটু এগিয়ে গেছে। তার পেছনে তন্ময় ও আমি। আমাদের দুজনের মধ্যে সামান্য কিছু কথাবার্তা চলছিল। তন্ময় বলছিল যে যাদের রাশিচক্র একটু উইক বা হাল্কা ধরনের তাদের নাকি এরকম সময়ে অতৃপ্ত আত্মারা আত্মীয় হয়ে দেখা টেখা দেয়। আমি বললাম আমার তো মেষ রাশি। আমার রাশি হাল্কা না ভারি? ও বললে হাল্কা। দেখ আজ তোমাকে কে দেখা দেয়। আমি বললাম তোমার তো তুলা রাশি, তা তুমি কি এতদিনে কারওর দেখা টেখা পেলে? আসলে তুলা রাশিই সবচেয়ে হাল্কা কিনা। তাতে সে বাবু বেশ রসিয়ে রসিয়ে গালগল্প শোনাতে লাগল আমাকে। বলল কোনও একবার কোনও এক ট্রেকিং এ নাকি ও তেনাদের দেখেছে। রাতের বেলা টেন্টের মধ্যে থাকাকালীন কেউ নাকি ওকে নিশিডাকার মতো করে ডেকে বাইরে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আমি ওর বস্তাপচা গল্পে কান না দিয়ে সামনে কিছুটা এগিয়ে তাকিয়ে দেখি সর্বাও তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। আমাদের সাথে আর আলো নেই। প্রায় এক কিমি পথ তখনও হাঁটা বাকি। এমন সময় ঝিঝিপোকার ডাক যেন আরো শান্ত হয়ে এল। চারিদিকের নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করে ফেলল আমাদের। নৈশব্দেরও যেন এক শব্দ আছে। সেই খুব সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর শব্দ যেন আমাদের ছেয়ে ফেলতে লাগল। আশেপাশে আর কেউ নেই। শুধু আমি আর তন্ময়। সর্বাশীষকে আর দেখতে পেলাম না। আমি আর তন্ময় দুজনেই কেউ আর কথা বলছি না। মানে কথা বলবার অবস্থায় তখন আর কেউ নেই। এক আশ্চর্য জড়তা আমাদের শরীরে ভর করেছে। শরীরে অত্যন্ত ক্লান্তি বোধ করলাম। পা দুটো যেন চলতেই চাইছে না। মাঝে মাঝে কেমন যেন টলমল করতে লাগল পা দুটো। গায়ে শিরশিরানি ভাব। মনে হল কেউ যেন পেছন থেকে বা পাশ থেকে আমাদের দুজনকে ফলো করছে। হঠাত্ খপ করে আমার হাতটা কেউ যেন চেপে ধরল। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। স্পষ্ট শুনতে পেলাম তন্ময় বলে উঠল - তাড়াতাড়ি চল প্রেমাংশু, এখানে আর এক মুহূর্ত নয়। আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। তন্ময়কে কিছু বলতে চাইলাম কিন্তু বলতে পারলাম না। কেমন যেন বোবা বনে গেলাম। ওই একপ্রকার টানতে টানতে সেই বিভীষিকাময় পথটা অতিক্রম করাল। বেশ কিছুক্ষণ একটা জবুথবু ভাব যেন আমাকে ঘিরে ধরেছিল। আরও কিছুটা যাওয়ার পর তন্ময় আমাকে সজোরে একটা ধাক্কা মারে। সম্বিত্ ফিরে পেলাম আমি। দেখি সামনে আমাদের হোম স্টে। হরেকৃষ্ণ দুর থেকে হাত নেড়ে ডাকছে - কি রে তোরা তাড়াতাড়ি আয়। খাবার যে ঠাণ্ডা হয়ে এল।
বন্ধুরা হয়েছে নাকি এরকম কোনও অভিজ্ঞতা তোমাদের? হলে জানাও কমেন্টস বক্সে। শেয়ার হোক তোমাদের অভিজ্ঞতা।
Comments
Post a Comment