Skip to main content

মিশন সান্দাকফু - নবম পর্ব


মিশন সান্দাকফু - নবম পর্ব

ডবল প্রেমাংশু


ঘুমটা ভাঙল সকাল সাড়ে ছটার একটু পরে। গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম তাড়াতাড়ি। বাইরে এসে যে দৃশ্য দেখলাম তা দেখে আমার মনে হল আমি যেন স্বপ্ন দেখছি। বাইরের রাস্তাঘাট, টিনের চাল, আশেপাশে থাকা লম্বা লম্বা পাহাড়ী গাছপালার উপর কেউ যেন তুলোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। টুকরো টুকরো বরফ গুলি তুলোর মতোই দেখাচ্ছে। কি অপূর্ব সে দৃশ্য। আমার উপর টুপটাপ করে বরফ পড়ছে। আমি হাতে ধরবার চেষ্টা করছি আর ভাবছি যা আমার সাথে হচ্ছে তা কি সত্যিই না স্বপ্ন। যে আমার কল্পনারও অতীত। এরকম দৃশ্য শুধুমাত্র টিভি বা সিনেমাতেই দেখা যায়।
ঘরে গিয়ে ওদের চারজনকে ডাকতে গেলাম। শুনলাম ভোর সাড়ে পাঁচটায় সর্বাশীষ এবং তন্ময় কালাপোখরী লেকের কিছু সুন্দর মুহূর্ত ক্যামেরা বন্দি করে নিয়ে এসেছে। সেইসময় স্নোফল আরও বেশি মাত্রায় হয়েছে
ট্রেকিং শুরু করবার আগে আমি, শতদল সঞ্জীব প্রথমে কালপোখারী লেকে যাই স্নোফল দেখবার জন্য। কিন্তু তখন আর দেখতে পাইনি। জার্নি শুরু করবার পর গায়ে হাতে পায়ে অসম্ভব রকম ব্যাথা শুরু হল। সঞ্জীবও স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে সান্দাকফুই হবে ওর শেষ গন্তব্য। আমারও ঠিক সেটাই মনে হল। ফালুট পর্যন্ত যাওয়া আমাদের আর সম্ভব হবে না। কালপোখারী থেকে সান্দাকফু পুরোটাই চড়াই রাস্তা। দূরত্ব প্রায় 7কিমি। আর সেখান থেকে ফালুট 21কিমি হাঁটুতে কার কতখানি জোর তা এই সময় আমরা টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও যার টিকি আমরা পাচ্ছিলাম না সে হল শতদল। ট্রেকিং শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সে বাবু গায়েব। ওর গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে আমাদের মধ্যে ওকে আর দেখতে পেলাম না। যত সান্দাকফুর কাছাকাছি আমরা এগিয়ে চলেছি ওর গতিবেগ যেন ততটাই বেড়ে চলেছে।
আমাদের প্রথম গন্তব্য বিখায় ভন্জং। সেখানে গিয়ে চা পান করে সামান্য বিশ্রাম করে আরও কঠিন অর্থাত্ আরও চড়াই রাস্তায় আমাদের উঠতে হবে। সান্দাকফুর যত কাছাকাছি আমরা পৌছব রাস্তার উচ্চতা ততই খাঁড়া হতে থাকবে।
বিখায় ভন্জং এর পর থেকে যতই উপরে উঠছি ততই অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকছে। যার ফলে খুব হাঁফ ধরছে আমার। আমরা প্রত্যেকেই একমাত্র শতদল ছাড়া মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে খোদাই করা পাথরগুলোতে, কখনও খাঁড়াই ঘাসের জমিতে, কখনও পাহাড়ের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতাম। বিশ্রাম হয়ে গেলে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এরকম ভাবেই চলতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম আমি আবারও ওদের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি
এই তিনদিনে আমরা কিছু কিছু অভ্যাস যা প্রত্যহ করে থাকি যেমন স্নান, জামাকাপড় কাঁচা, দাঁড়ি কাটা এগুলো সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছিলাম। স্নান না করার প্রধান কারণ ছিল অসম্ভব ঠাণ্ডা আবহাওয়া। পোর্টারেরাই বারণ করেছিল। তাছাড়া এইরকম পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় জলের খুব অভাব। এরা পাহাড়ের উপর সামান্য জলের যেটুকু ব্যবস্থা করে সেটাও যে কিভাবে করে তা আমার কাছে বিস্ময়ের। যেকোনো জায়গায় বিশেষত ঠাণ্ডার স্থানে ঘুরতে গেলে মানুষ সাধারণত ড্রিঙ্কস করবার মানসিকতা নিয়েই যায়। কিন্তু এই তিনদিনে আমরা প্রত্যেকে মদ্যপান ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলাম। আসলে ভেতরে ভেতরে আমরা সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম
সূর্যের তেজ প্রখর সাথে তীব্রবেগে হাওয়া বইছে। আকাশ একদম পরিস্কার, ঝকঝকে। কিছুক্ষণ চলবার পর একটা খোদাই পাথরের পাঁচিলের উপর বসে পড়লাম। হাওয়াতে একটু শীত শীত লাগলেও সূর্যের তেজে আবার শরীর গরম হয়ে উঠছে। তিনদিন স্নান না করার কারণে সারা শরীরে একটা রুক্ষ শুখ্য ভাব দেখা দিয়েছে। মাথার চুলগুলো সব আঠা আঠা। মাথায় ঘাম বসে বসে চিটচিটে হয়ে গেছে চুলগুলো। মাঝে মাঝে মোবাইলের স্ক্রিনে নিজেকে দেখছি আর মনে মনে বলছি "আমি কি পাগল" নিজেকেই যেন ঠিকমতো চিনতে পারছি না। গালে বেশ কয়েক দিনের না কাটা বাসি দাঁড়ি। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি আবার কখন যে চলতে শুরু করেছি ঠিক বুঝতে পারিনি। পা যেন আর চলছে না। হাঁটু,কোমর, পিঠ ডান হাত, বিশেষত লাঠি ধরে থাকা অংশটায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছি। নিজেই নিজেকে বারবার বলছি " প্রেমাংশু চল তাড়াতাড়ি। ওরা যে সব সান্দাকফু পৌছে গেল।" লাঠির উপর ভর করে পা দুটো কে টেনে হিচড়ে এগিয়ে চলেছি। ঘামে শরীর ভিজে একাকার। হাওয়াতে শুকিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে। কিন্তু আবারও ঘেমে উঠছি। এই ভাবে চলতে চলতেই একসময় আমার ভেতরকার আমি হঠাত্ হঠাত্ বাইরে বেড়িয়ে আসছে আর বিভিন্ন প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করছে। আমার সামনে আসলো আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা
প্রেমাংশু 2 - তোর দ্বারা কিস্যুটি হবে না। বুঝলি
প্রেমাংশু 1 - কেন ? কি হবে না ?
প্রেমাংশু 2 - সবাই তো তোর আগে চলে গেল। আর তুই কোথায় পড়ে রইলি দ্যাখ্
প্রেমাংশু 1 - আমার লড়াই আমার নিজের সাথে। আর কারওর সাথে নয়
প্রেমাংশু 2 - হ্যাঁ তা ঠিক। যে ব্যক্তি লড়াইয়ে হারে সে এই অজুহাতটা ভালই দিতে জানে
প্রেমাংশু 1 - আমি ওদের সাথে লড়তে যাব কেন? আমি তো ওদের সাথে লড়তে আসিনি
প্রেমাংশু 2 - তবে কেন এসেছিস?
প্রেমাংশু 1 - নিজেকে আরও ভালো করে জানতে, বুঝতে, অনুভব করতে। নিজেকে আরও বেশি করে চিনতে
প্রেমাংশু 2 - রাখ তো তোর ওই ছেদো কথা। কি সব জানা, বোঝা, চেনার কথা বলছিস? শালা ইন্টেলেকচুয়াল
প্রেমাংশু 1 - ওইসব তুই বুঝবি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সময়কে অনুভব করতে চাই আমি। ট্রেকিং সম্বন্ধে আগে অনেক শুনেছিলাম। কিন্তু আগে তো কখনও ট্রেকিং করিনি। তাই এই অভিজ্ঞতাটা নিতে এসেছি। জীবনের সাথে ট্রেকিং এর অনেক মিল। দুটোর মধ্যেই চড়াই, উতরাই সমতল পথ রয়েছে। কি মিল না এই দুটোর মধ্যে?
প্রেমাংশু 2 - তুই জানিস তোর এই পিছিয়ে পড়াটাকে তোর বন্ধুরা ভালভাবে নিচ্ছে না। বিশেষত শতদল। ভেতরে ভেতরে কিন্তু তোর উপর একটু খচেই আছে। তার উপর তুই যখন আজ সান্দাকফু পৌছে গিয়ে বলবি যে তুই আর ফালুট যেতে চাস না, তখন তোর উপর কেমন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে বলতো? ভেবেছিস কখনো?
প্রেমাংশু 1 - আমার ভাববার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি এই মানসিকতা নিয়েই এসেছিলাম যে আমি সান্দাকফু পর্যন্ত ট্রেক করতে যাচ্ছি। সেটা ওদের বলেওছিলাম। কিন্তু ওরা আগ বাড়িয়ে ফালুট ফালুট করে চেঁচাতে লাগল। দেখব কার কত দম ফালুট যাওয়ার। সঞ্জীব তো আজ বলেই ফেলল যে আর ফালুট যাবে না। আমার মনে হয় সর্বাশীষও আর পারবে না যেতে। আমরা কেউই প্রফেশনাল ট্রেকার নই। জাস্ট শখের যাত্রা
প্রেমাংশু 2 - বাহ্ বেশ বলেছিস। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে দল ভারি করছিস। বেশ সুচতুর তুই। সুকৌশলে যেকোনো জিনিস খুব ভালো এড়াতে পারিস। যেরকমভাবে এতদিন ধরে বাস্তব পরিস্থিতিগুলো এড়িয়ে আসছিস
প্রেমাংশু 1 - কি এড়িয়ে আসছি আমি?
প্রেমাংশু 2 - অনেক কিছু। সত্যিগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছিস। you have no guts to face the truth, to face the challenge. তুই ভীতু, কাপুরুষ একটা। নিজের কমফর্ট জোন ছেড়ে বেড়িয়ে কিছু করবার বান্দা তুই নোস। লড়াইয়ের কথা বলছিস, তোর সামনে কোনও কঠিন পরিস্থিতি আসলে তুই তার থেকে পালিয়ে দুরে চলে যাস না? নিজেকে প্রশ্ন করে দ্যাখ্ তো। এই যে তুই তোর বন্ধুদের থেকে এতটা পিছিয়ে পড়েছিস, কেন?
প্রেমাংশু 1 - আমার সারা শরীরে ব্যাথা
প্রেমাংশু 2 - সমস্ত ব্যাথা বেদনা ভুলে গিয়ে একবার ওদের সাথে চলবার চেষ্টা করেই দ্যাখ্ না, একবার সমস্ত ভয়কে দুর করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে দ্যাখ্, একবার পিছনে না তাকিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখে হেঁটে দ্যাখ্, একবার নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে নিঙরে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেই দ্যাখ্ না কি হয়?
প্রেমাংশু 1 - না না না, আআআ আমি পারবো না। আমার ভয় করে
প্রেমাংশু 2 - কিসের ভয় প্রেম, কিসের ভয়। হারিয়ে যাওয়ার ভয়, মরে যাওয়ার ভয়, কথা রাখতে না পারার ভয়? তুই তো কারওর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নোস। আর তুই কি এত যত্ন করে সবকিছু বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিস? জানিসনা সুনামির শক্তি কি অপরিসীম? নিমেষে সবকিছু কেমন ধূলিসাত্ করে দিতে পারে?
প্রেমাংশু 1 - আমি এইসব কথাগুলো আগে বহুবার ভেবেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছুর থেকে মুক্তির পথ মৃত্যু। আত্মহত্যা
প্রেমাংশু 2 - হা হা হা হা দেখেছিস বলেছিলাম না তুই কাপুরুষ, ভীরু। আচ্ছা আত্মহত্যা করবার মতো বুকের পাটা তোর আছে? ঠিক আছে, এক কাজ কর। এই পাহাড়ী খাদের মধ্যে এক ঝাঁপ মার। জাস্ট একটা সেকেন্ডের মুহূর্ত। তারপর সব শেষ। আমিও আর তোকে জ্বালাতে আসবো না
প্রেমাংশু 1 - না মানে, আমি সুখে মরতে চাই। যেখানে আমার কোনও আঘাত লাগবে না। মানুষ ঘুমের মধ্যে যেরকম মরে যায় অনেকটা সেইরকম মৃত্যু। এই পাহাড়ী খাদের মধ্যে মেঘের সমুদ্র দেখে মনে হচ্ছে এখানে ভীষণ শান্তি,ভীষণ নীরব, কোলাহলহীন। কিন্তু ঝাঁপ মারবার পর যদি আমি ভাঙাচোরা অবস্থায় বেঁচে থাকি, অনেকটা সোনার কেল্লার ডঃ হাজরার মতো; না না, আমি পারবো না
প্রেমাংশু 2 - আমি জানি, তুই পারবি না। তুই হচ্ছিস সুবিধাবাদী এবং MEGALOMANIAC , তোর দুঃখ, কষ্ট অনিবার্য
হঠাত্ করে সামনে সর্বাশীষ সঞ্জীবকে দেখে সম্বিত্ ফিরে পেলাম।
-------- এর পর শেষ পর্ব---------- সান্দাকফু জয়

Comments

Popular posts from this blog

মিশন সান্দাকফু

MISSION SANDAKFU লেখক : - প্রেমাংশু দেবনাথ মিশন সান্দাকফু - প্রথম পর্ব পরিচয় - ট্রেন টা এক ঘণ্টার উপর লেট আছে । - তো , কি হয়েছে ? এই সুযোগে বরং ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নে। - ওরে তুই জুতো টা পর রে। - এই শত হাত মুখ টা ধুয়ে নে এবার। - দ্যাখ্ শতদল টা এখনও ঘুমোচ্ছে । - ওর পেছনে একটা ক্যাত করে লাগা দেখবি তিরিং করে উঠবে। - ওরে শতদল নিউ জলপাইগুড়ি আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঢুকবে। -Get ready boys. এই ভাবেই শুরু হয়েছিল মিশন সান্দাকফু। ট্রেকিংয়ের সময়ে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি । তাই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে লেখাটি আবার শুরু করলাম । সেদিনটা ছিল 18/12/16 । সকাল সাড়ে আটটা কি নটা হবে । সেদিন সকালে সবচেয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠল আমাদের শত। মানে শতদল জানা। কিন্তু সান্দাকফু পৌঁছাল সবার প্রথমে। শতদল কে বলা যেতে পারে আমাদের কাণ্ডারী বা পথের দিশারী । ওই হল আমাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ছিপছিপে চেহারা । অ্যাথলেটিক ফিগার । হাইট আন্দাজ 5'8" । মনে হচ্ছিল এই ...

ভাইজ্যাগ ২০৪০

ভাইজ্যাগ ২০৪০ অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ। সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদ...

ভগবান ও শয়তানের লড়াই

ভগবান ও শয়তানের লড়াই ভগবানঃ- পৃথিবীটাকে কেন ধীরে ধীরে শেষ করে দিতে চাইছিস? আর কত! থামা এবার! প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির উপর নিজের প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করছিস ক্রমাগত। ওরে শয়তান কবে শেষ হবে তোর এই লীলা খেলা? শয়তানঃ- তুই শালা নিজেকে কি ভাবিস বে? শালা উদগান্ডু। অনেক ক্ষমতাবান না তুই! আর আমি পৃথিবীটাকে শেষ করে দিতে চাইছি? ঠিক আছে, তাহলে তাই। বেশ করেছি। এই পৃথিবী, এই জগৎ, এই মহাজাগতিক সব কিছুকে সৃষ্টি করতে কে বলেছিল? জানিস না যেই মুহূর্তে সৃষ্টির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকেই ধ্বংসের দিন, ক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। আর এই কাজটি করি আমি। করছি এবং করতেই থাকব। তোর যখন এত ক্ষমতা, মানুষ যখন তোকে এত পুজো করে, তখন আটকে দেখা দেখি। কিভাবে পারিস দেখি ধ্বংসকে রুখতে। ভগবানঃ- ভুল বলছিস। সৃষ্টি অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যু, দুটোই আমার নিয়ন্ত্রণে। একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টির কাজ করে থাকি আমি। আমার কাজ মানুষকে চিন্তা, ভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক কাজে প্রয়োগ করা। আমি চাই না যে মানুষ আমাকে অন্ধ বিশ্বাসের মতো পুজো করুক। আমি চাই সঠিক আলো, সঠিক পথ অবলম্বন করে এক মানুষ অপর মানুষকে সাহায্য করুক, দুস্থদের...

আমার জীবনে তিন নারী

আমার জীবনে তিন নারী যে কোনও পুরুষের জীবনেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যে কোনও মানুষের জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা ...

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব -        দেবু বাবু শুনছেন! দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না। তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন আছেন য...

মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব

MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব টোংলুর পথে ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো? - দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল। - ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল। - জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল। ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় । - তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম । এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু কর...

প্রেমের কিছু কথা ও গান

প্রেমের কিছু কথা ও গান আজ হঠাৎ করেই যেন তোমাকে দেখতে পেলাম। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। তুমি একটা দরজার সামনে দাড়িয়ে আছ। বাইরে থেকে আলো এসে তোমার মুখেতে পড়েছে। দুলছে হাওয়ায় তোমার খোলা চুল। আমার ঘর আলো করে দাড়িয়ে রয়েছ তুমি। হাল্কা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি দেখছিলে আমাকে। তোমার সেই প্রাণভোলানো, মনজুড়ানো, সারল্যমাখা হাসি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। যা আজও দিচ্ছে। অনেকসময়েই। মনে হচ্ছিল এক ছুটে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু কেমন করে যাই। আমি যে অথর্ব। এক জড়ভরত। দেখলাম সারা ঘরময় তুমি হেঁটে বেড়াচ্ছ। শিশুর মতো খেলে বেড়াচ্ছ। কি এক অপার্থিব সুখ যেন আমার শরীরে অনুভূত হচ্ছে তোমাকে দেখতে পেয়ে। “হামেশা তুমকো চাহা, অউর চাহা, চাহা, চাহাআআআ...............” গুনগুণ করে গাইতেই থাকছি দেবদাস সিনেমার এই গানটি। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। দেখছি আরশির মধ্যে দিয়ে তুমি আমার দিকে মিটিমিটি হাসছ। সেই তোমার মুক্ত ঝরানো হাসি। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছ তুমি। জানি তা আমারই উদ্দেশ্যে। খুবই ইচ্ছে করছিল জানো তোমার পরশ পেতে। কিন্তু যখনই আরশির কাছে গেলাম ও হাতটা বাড়ালাম, তুমি কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেলে।...

মরীচিকা

মরীচিকা উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক রাখেনি। গার্গীও চায় না। ...

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ হায়দ্রাবাদের  MGBS STOPPAGE পৌঁছানোর পর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম নেক্সট বাসের জন্য যেটা কিনা  হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট পৌছবে। তার মধ্যে নয় নয় করে প্রায় 10/12 বার অটোয়ালারা আমার সাথে দরদাম করে গেছে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে 200 তো কেউ 150 তো কেউ আবার 300 ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখার্জি দা , চক্রবর্তী দা বলেই রেখেছিলেন যে ভুল করে কক্ষনো অটোতে চাপতে যাবে না। তোমার ফ্লাইট যখন সকাল আটটার পর তখন তুমি ভোর চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত MGBS এ অপেক্ষা করবে পরের বাসের জন্য। বাস এসে পড়লে তাতে উঠে পড়বে। ভাড়া হয়তো নেবে পঁচিশ থেকে তিরিশ টাকা কিংবা বড়জোর চল্লিশ টাকা। তাছাড়া অটোর থেকে অনেকগুণ আগেই গন্তব্যে পৌছে যাবে। আমিও তাই করলুম। বাস আসলো পাঁচটা দশ নাগাদ ভোরবেলায়। ভোরবেলার সদ্য প্রস্ফুটিত আলোয়  হায়দ্রাবাদ  শহরটিকে দেখতে দেখতে , খানিক ঢুলু ঢুলু চাহনিতে , ঝিমোতে ঝিমোতে পৌছে গেলাম হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট সকাল ছটা পনেরো নাগাদ। মুখার্জি দা বলেছিলেন :- - এয়ারপোর্ট গিয়ে দেখবে লোকাল কিছু বাস দাড়িয়ে আছে। সেগুলো তোমাকে ড...

মুঠো ফোন

মুঠো ফোন ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি । তার পাশে কমন স্পেস দিয়ে ঘরে যাওয়ার রাস্তা । দোতলায় উঠে সিঁড়ির ঠিক দ্বিতীয় কি তৃতীয় ধাপে বসে থাকে ও। মানে অসীম , আমাদের অসীম কুমার । হাতে একখানা স্মার্ট ফোন সঙ্গে একটা হেডফোন , কানে গোঁজা ।রোজ রাত দশটার পর থেকে চলে গল্প কথন , মন দেওয়া নেওয়ার খেলা , হাসি , ঠাট্টা , মুখ ভেংচানো , দূরভাষ যন্ত্রে একে অপরের চলচ্ছবি দেখা । স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন তো শুধু শোনা নয় বরং একে অপরকে বেশ ভালভাবেই কাছে পান প্রেমিক যুগল বা আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , বাবা মা ইত্যাদি ইত্যাদি । একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলায় আসবার সময় কোন একজনের পদচারণার শব্দ । রমিত চাটুজ্জের প্রবেশ ।দোতলায় অসীম কুমারের সামনে আসে রমিত ।ওকে জিজ্ঞাসা করে .........."বলি হ্যাঁরে হতভাগা , আর কত কষ্ট দিবি ক তো ওই যন্তরটারে ? " " রমিত দা আবার এসে শুরু করলে ? খাওয়া হয়ে গেছে যখন , যাওনা গিয়ে শুয়ে পর এবার।" - অসীম বলল। রমিত - " হ্যাঁরে পোড়ারমুখো আমারে দেইখ্যা জ্বলন তো হইবই। অহন তুই চাইনার মাইয়াটার লগে প্রেম করতাছস্ , আমি হইলাম গিয়া কাবাব মে হাড্ডি , জ্বলন তো হইবই।...