মিশন সান্দাকফু - নবম পর্ব
ডবল প্রেমাংশু
ঘুমটা ভাঙল সকাল সাড়ে ছটার একটু পরে। গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম তাড়াতাড়ি। বাইরে এসে যে দৃশ্য দেখলাম তা দেখে আমার মনে হল আমি যেন স্বপ্ন দেখছি। বাইরের রাস্তাঘাট, টিনের চাল, আশেপাশে থাকা লম্বা লম্বা পাহাড়ী গাছপালার উপর কেউ যেন তুলোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। টুকরো টুকরো বরফ গুলি তুলোর মতোই দেখাচ্ছে। কি অপূর্ব সে দৃশ্য। আমার উপর টুপটাপ করে বরফ পড়ছে। আমি হাতে ধরবার চেষ্টা করছি আর ভাবছি যা আমার সাথে হচ্ছে তা কি সত্যিই না স্বপ্ন। এ যে আমার কল্পনারও অতীত। এরকম দৃশ্য শুধুমাত্র টিভি বা সিনেমাতেই দেখা যায়।
ঘরে গিয়ে ওদের চারজনকে ডাকতে গেলাম। শুনলাম ভোর সাড়ে পাঁচটায় সর্বাশীষ এবং তন্ময় কালাপোখরী লেকের কিছু সুন্দর মুহূর্ত ক্যামেরা বন্দি করে নিয়ে এসেছে। সেইসময় স্নোফল আরও বেশি মাত্রায় হয়েছে।
ট্রেকিং শুরু করবার আগে আমি, শতদল ও সঞ্জীব প্রথমে কালপোখারী লেকে যাই স্নোফল দেখবার জন্য। কিন্তু তখন আর দেখতে পাইনি। জার্নি শুরু করবার পর গায়ে হাতে পায়ে অসম্ভব রকম ব্যাথা শুরু হল। সঞ্জীবও স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে সান্দাকফুই হবে ওর শেষ গন্তব্য। আমারও ঠিক সেটাই মনে হল। ফালুট পর্যন্ত যাওয়া আমাদের আর সম্ভব হবে না। কালপোখারী থেকে সান্দাকফু পুরোটাই চড়াই রাস্তা। দূরত্ব প্রায় 7কিমি। আর সেখান থেকে ফালুট 21কিমি । হাঁটুতে কার কতখানি জোর তা এই সময় আমরা টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও যার টিকি আমরা পাচ্ছিলাম না সে হল শতদল। ট্রেকিং শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সে বাবু গায়েব। ওর গতিবেগ এতটাই বেশি ছিল যে আমাদের মধ্যে ওকে আর দেখতে পেলাম না। যত সান্দাকফুর কাছাকাছি আমরা এগিয়ে চলেছি ওর গতিবেগ যেন ততটাই বেড়ে চলেছে।
আমাদের প্রথম গন্তব্য বিখায় ভন্জং। সেখানে গিয়ে চা পান করে ও সামান্য বিশ্রাম করে আরও কঠিন অর্থাত্ আরও চড়াই রাস্তায় আমাদের উঠতে হবে। সান্দাকফুর যত কাছাকাছি আমরা পৌছব রাস্তার উচ্চতা ততই খাঁড়া হতে থাকবে।
বিখায় ভন্জং এর পর থেকে যতই উপরে উঠছি ততই অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকছে। যার ফলে খুব হাঁফ ধরছে আমার। আমরা প্রত্যেকেই একমাত্র শতদল ছাড়া মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে খোদাই করা পাথরগুলোতে, কখনও খাঁড়াই ঘাসের জমিতে, কখনও পাহাড়ের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতাম। বিশ্রাম হয়ে গেলে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এরকম ভাবেই চলতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম আমি আবারও ওদের থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি।
এই তিনদিনে আমরা কিছু কিছু অভ্যাস যা প্রত্যহ করে থাকি যেমন স্নান, জামাকাপড় কাঁচা, দাঁড়ি কাটা এগুলো সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছিলাম। স্নান না করার প্রধান কারণ ছিল অসম্ভব ঠাণ্ডা আবহাওয়া। পোর্টারেরাই বারণ করেছিল। তাছাড়া এইরকম পাহাড়ী দুর্গম এলাকায় জলের খুব অভাব। এরা পাহাড়ের উপর সামান্য জলের যেটুকু ব্যবস্থা করে সেটাও যে কিভাবে করে তা আমার কাছে বিস্ময়ের। যেকোনো জায়গায় বিশেষত ঠাণ্ডার স্থানে ঘুরতে গেলে মানুষ সাধারণত ড্রিঙ্কস করবার মানসিকতা নিয়েই যায়। কিন্তু এই তিনদিনে আমরা প্রত্যেকে মদ্যপান ও ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলাম। আসলে ভেতরে ভেতরে আমরা সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম।
সূর্যের তেজ প্রখর । সাথে তীব্রবেগে হাওয়া বইছে। আকাশ একদম পরিস্কার, ঝকঝকে। কিছুক্ষণ চলবার পর একটা খোদাই পাথরের পাঁচিলের উপর বসে পড়লাম। হাওয়াতে একটু শীত শীত লাগলেও সূর্যের তেজে আবার শরীর গরম হয়ে উঠছে। তিনদিন স্নান না করার কারণে সারা শরীরে একটা রুক্ষ শুখ্য ভাব দেখা দিয়েছে। মাথার চুলগুলো সব আঠা আঠা। মাথায় ঘাম বসে বসে চিটচিটে হয়ে গেছে চুলগুলো। মাঝে মাঝে মোবাইলের স্ক্রিনে নিজেকে দেখছি আর মনে মনে বলছি "আমি কি পাগল"। নিজেকেই যেন ঠিকমতো চিনতে পারছি না। গালে বেশ কয়েক দিনের না কাটা বাসি দাঁড়ি। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি আবার কখন যে চলতে শুরু করেছি ঠিক বুঝতে পারিনি। পা যেন আর চলছে না। হাঁটু,কোমর, পিঠ ও ডান হাত, বিশেষত লাঠি ধরে থাকা অংশটায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছি। নিজেই নিজেকে বারবার বলছি " প্রেমাংশু চল তাড়াতাড়ি। ওরা যে সব সান্দাকফু পৌছে গেল।" লাঠির উপর ভর করে পা দুটো কে টেনে হিচড়ে এগিয়ে চলেছি। ঘামে শরীর ভিজে একাকার। হাওয়াতে শুকিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে। কিন্তু আবারও ঘেমে উঠছি। এই ভাবে চলতে চলতেই একসময় আমার ভেতরকার আমি হঠাত্ হঠাত্ বাইরে বেড়িয়ে আসছে আর বিভিন্ন প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করছে। আমার সামনে আসলো আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা।
প্রেমাংশু 2 - তোর দ্বারা কিস্যুটি হবে না। বুঝলি।
প্রেমাংশু 1 - কেন ? কি হবে না ?
প্রেমাংশু 2 - সবাই তো তোর আগে চলে গেল। আর তুই কোথায় পড়ে রইলি দ্যাখ্।
প্রেমাংশু 1 - আমার লড়াই আমার নিজের সাথে। আর কারওর সাথে নয়।
প্রেমাংশু 2 - হ্যাঁ তা ঠিক। যে ব্যক্তি লড়াইয়ে হারে সে এই অজুহাতটা ভালই দিতে জানে।
প্রেমাংশু 1 - আমি ওদের সাথে লড়তে যাব কেন? আমি তো ওদের সাথে লড়তে আসিনি।
প্রেমাংশু 2 - তবে কেন এসেছিস?
প্রেমাংশু 1 - নিজেকে আরও ভালো করে জানতে, বুঝতে, অনুভব করতে। নিজেকে আরও বেশি করে চিনতে।
প্রেমাংশু 2 - রাখ তো তোর ওই ছেদো কথা। কি সব জানা, বোঝা, চেনার কথা বলছিস? শালা ইন্টেলেকচুয়াল।
প্রেমাংশু 1 - ওইসব তুই বুঝবি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সময়কে অনুভব করতে চাই আমি। ট্রেকিং সম্বন্ধে আগে অনেক শুনেছিলাম। কিন্তু আগে তো কখনও ট্রেকিং করিনি। তাই এই অভিজ্ঞতাটা নিতে এসেছি। জীবনের সাথে ট্রেকিং এর অনেক মিল। দুটোর মধ্যেই চড়াই, উতরাই ও সমতল পথ রয়েছে। কি মিল না এই দুটোর মধ্যে?
প্রেমাংশু 2 - তুই জানিস তোর এই পিছিয়ে পড়াটাকে তোর বন্ধুরা ভালভাবে নিচ্ছে না। বিশেষত শতদল। ভেতরে ভেতরে ও কিন্তু তোর উপর একটু খচেই আছে। তার উপর তুই যখন আজ সান্দাকফু পৌছে গিয়ে বলবি যে তুই আর ফালুট যেতে চাস না, তখন ও তোর উপর কেমন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে বলতো? ভেবেছিস কখনো?
প্রেমাংশু 1 - আমার ভাববার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি এই মানসিকতা নিয়েই এসেছিলাম যে আমি সান্দাকফু পর্যন্ত ট্রেক করতে যাচ্ছি। সেটা ওদের বলেওছিলাম। কিন্তু ওরা আগ বাড়িয়ে ফালুট ফালুট করে চেঁচাতে লাগল। দেখব কার কত দম ফালুট যাওয়ার। সঞ্জীব তো আজ বলেই ফেলল যে ও আর ফালুট যাবে না। আমার মনে হয় সর্বাশীষও আর পারবে না যেতে। আমরা কেউই প্রফেশনাল ট্রেকার নই। জাস্ট শখের যাত্রা।
প্রেমাংশু 2 - বাহ্ বেশ বলেছিস। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে দল ভারি করছিস। বেশ সুচতুর তুই। সুকৌশলে যেকোনো জিনিস খুব ভালো এড়াতে পারিস। যেরকমভাবে এতদিন ধরে বাস্তব পরিস্থিতিগুলো এড়িয়ে আসছিস।
প্রেমাংশু 1 - কি এড়িয়ে আসছি আমি?
প্রেমাংশু 2 - অনেক কিছু। সত্যিগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছিস। you have no guts to face the truth, to face the challenge. তুই ভীতু, কাপুরুষ একটা। নিজের কমফর্ট জোন ছেড়ে বেড়িয়ে কিছু করবার বান্দা তুই নোস। লড়াইয়ের কথা বলছিস, তোর সামনে কোনও কঠিন পরিস্থিতি আসলে তুই তার থেকে পালিয়ে দুরে চলে যাস না? নিজেকে প্রশ্ন করে দ্যাখ্ তো। এই যে তুই তোর বন্ধুদের থেকে এতটা পিছিয়ে পড়েছিস, কেন?
প্রেমাংশু 1 - আমার সারা শরীরে ব্যাথা।
প্রেমাংশু 2 - সমস্ত ব্যাথা বেদনা ভুলে গিয়ে একবার ওদের সাথে চলবার চেষ্টা করেই দ্যাখ্ না, একবার সমস্ত ভয়কে দুর করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে দ্যাখ্, একবার পিছনে না তাকিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রেখে হেঁটে দ্যাখ্, একবার নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে নিঙরে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেই দ্যাখ্ না কি হয়?
প্রেমাংশু 1 - না না না, আআআ আমি পারবো না। আমার ভয় করে।
প্রেমাংশু 2 - কিসের ভয় প্রেম, কিসের ভয়। হারিয়ে যাওয়ার ভয়, মরে যাওয়ার ভয়, কথা রাখতে না পারার ভয়? তুই তো কারওর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নোস। আর তুই কি এত যত্ন করে সবকিছু বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিস? জানিসনা সুনামির শক্তি কি অপরিসীম? নিমেষে সবকিছু কেমন ধূলিসাত্ করে দিতে পারে?
প্রেমাংশু 1 - আমি এইসব কথাগুলো আগে বহুবার ভেবেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছুর থেকে মুক্তির পথ মৃত্যু। আত্মহত্যা।
প্রেমাংশু 2 - হা হা হা হা । দেখেছিস বলেছিলাম না । তুই কাপুরুষ, ভীরু। আচ্ছা আত্মহত্যা করবার মতো বুকের পাটা তোর আছে? ঠিক আছে, এক কাজ কর। এই পাহাড়ী খাদের মধ্যে এক ঝাঁপ মার। জাস্ট একটা সেকেন্ডের মুহূর্ত। তারপর সব শেষ। আমিও আর তোকে জ্বালাতে আসবো না।
প্রেমাংশু 1 - না মানে, আমি সুখে মরতে চাই। যেখানে আমার কোনও আঘাত লাগবে না। মানুষ ঘুমের মধ্যে যেরকম মরে যায় অনেকটা সেইরকম মৃত্যু। এই পাহাড়ী খাদের মধ্যে মেঘের সমুদ্র দেখে মনে হচ্ছে এখানে ভীষণ শান্তি,ভীষণ নীরব, কোলাহলহীন। কিন্তু ঝাঁপ মারবার পর যদি আমি ভাঙাচোরা অবস্থায় বেঁচে থাকি, ঐ অনেকটা সোনার কেল্লার ডঃ হাজরার মতো; না না, আ আ আমি পারবো না।
প্রেমাংশু 2 - আমি জানি, তুই পারবি না। তুই হচ্ছিস সুবিধাবাদী এবং MEGALOMANIAC , তোর দুঃখ, কষ্ট অনিবার্য।
হঠাত্ করে সামনে সর্বাশীষ ও সঞ্জীবকে দেখে সম্বিত্ ফিরে পেলাম।
-------- এর পর শেষ পর্ব---------- সান্দাকফু জয়।
Comments
Post a Comment