Skip to main content

মিশন সান্দাকফু - সপ্তম পর্ব


মিশন সান্দাকফু - সপ্তম পর্ব

সাসপিশিয়াস কালাপোখরী

টোংলুতে চড়াই পথটাই বেশি ছিল। সমতল পথও ছিল। কিন্তু উতরাই পথটা ছিল না বললেই চলে। চড়াই রাস্তায় চলতে চলতে পায়ের বেশ কিছু মাসল্ ব্যাথা হয়েছিল। যেটা আমরা মোটামুটি সবাই টের পেলাম 20/12/16 তারিখে সকালবেলা। অর্থাত্ দ্বিতীয় দিনে। দ্বিতীয় দিনে হাঁটা শুরু করবার পর মনে হল দুপায়ের কাপ মাসল্ অর্থাত্ GASTROCNOMEOUS ঊরুর মাসল্ QUADRICEPS HAMSTRING যেন অল্প অল্প টান লাগছে। ডানহাতের বুড়ো আঙুল তর্জনীর মাঝামাঝি অংশে বেশ ভালরকম ব্যাথা অনুভূত হল। কারণ টা ধরতে পেরেছেন কি? কারণ টা আর কিছুই নয়, গতকাল অর্থাত্ প্রথমদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাঁশের লাঠিটাকে মুঠো করে ধরে চলছিলাম। সারাদিনে একনাগাড়ে ধরে থাকায় হাতটা ব্যাথা ব্যাথা অনুভব করলাম। আঙুলের পাশে থাকা হাঁড়ে লাগছিল লাঠিটাকে শক্ত করে ধরার সময়।
টোংলু থেকে প্রথম 2/3 কিমি পথ অতিক্রম করে যেতে হবে টামলিং। এই টামলিং বা টুমলিং জায়গাটা নেপালের অন্তর্গত। হাল্কা হাল্কা ঝোপঝাড়, ছোট ছোট প্রায় দু তিন হাত লম্বা কাঁটাগাছ, কখনও কখনও এক দু হাত উচ্চতার পাথর ডিঙিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। ঠিক মালভূমি অঞ্চলগুলি যেরকম হয় ঠিক সেইরকম লাগছে এই অঞ্চল টা। নির্দিষ্ট কোনও একটি রাস্তা এখানে নেই। কখনও ছোট টিলা পেরিয়ে, কখনও ছোট ছোট চারাগাছ ডিঙিয়ে তো কখনও হাতের লাঠির উপর ভর করে সামান্য লাফিয়ে আমরা আমাদের গন্তব্যে এগিয়ে চলেছি। দুরের দিকে চাইলে শুধু সবুজ আর সবুজ। মাথার উপর নীল আকাশ। মাঝে মাঝে মেঘ আর কুয়াশার হাতছানি। এই পথ দিয়ে বুদ্ধ এবং যোগেন এত তাড়াতাড়ি চলতে লাগল যে দুরে ওদের দেখে মনে হল দুটো পিঁপড়ে অথবা ছোট কোন পোকা পিঠের উপর খাবার বয়ে নিয়ে চলেছে। ওদের নীচে নেমে যেতে দেখলাম। মাঝে মাঝে হাঁটার সময় মনে হল যেন এই বোধহয় গর্তে পড়ে যাব। আসলে নামার সময় চোখ খুব সতর্ক পুরো শরীরটাকে খুব সন্তর্পণে ব্যালান্স করে চলতে হয়। নইলে পা ফসকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হাঁটুতে বেশ ভালরকম চাপ অনুভব করলাম। পায়ের পাতা, গোড়ালি হাঁটু এই তিন বিশেষ স্থানে বেশ ভালরকম জোর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে আমাদের। এখানকার পথ আগের মতো মসৃণ নয়। যদিও ঘাস রয়েছে অনেক। তবুও মাঝে মাঝে চকচকে পাথর, কখনও গোটা, কখনও অর্ধেক সেগুলোকে ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে চলতে থাকলাম আমরা
বেশ কিছুক্ষণ চলবার পর একবার চোখের মধ্যে একটা আলোর ঝলকানি এসে লাগল। আমি নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিলাম। দেখলাম রাস্তার এক সাইডে সামান্য ঢালু অংশটায় সাদা সাদা দাগ হয়ে রয়েছে বেশ অনেকখানি অংশ জুড়ে। আমি ওই সাদা দাগের উপর গিয়ে দাড়াতেই কাঁচ ভাঙার মতো আওয়াজ আমার কানে এসে পৌছল আর তার সাথে সাথে আমি একটু পিছলে গেলাম। তবে হাল্কা ভাবে। আর তাছাড়া হাতে লাঠি থাকায় বডি ব্যালান্সটাও হয়ে গেল। নইলে হয়েছিল আর কি। পাশেই গভীর খাদ। পড়লে এই বিশ্বচরাচরে আর কেউ খুঁজে পাবে বলে তো মনে হয় না। তা আপনারা কি ধরতে পারলেন সাদা দাগের রহস্য? কিছুই নয়। পাহাড়ী রাস্তায় ভোরের দিকে খুব ঠাণ্ডা থাকার জন্য বরফ জমে থাকে। যার মধ্যে সূর্যের আলো পড়ে চোখে ঠিকরে এসেছিল। আর বরফের উপর গিয়ে দাড়াতেই ওটা কাঁচ ভাঙার মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গিয়েছিল। সেই জন্য কানে শুনেছিলাম বরফ ভাঙার আওয়াজ।
"
তো বুদ্ধ এবং যোগেন " সঞ্জীব বলল।
"
ওরা তো একদম তরতর করে এগিয়ে চলেছে" আমি বললাম। তখন তন্ময় আমায় বলল " ঠিক আছে অত চাপ নেওয়ার কিছু নেই। আস্তে আস্তে সাবধানে চল। এমনিতে তুমি যেরকম ঘামছ তাতে শরীর টরীর আবার খারাপ লাগছে নাতো"?
"
না না I am perfectly alright. তাছাড়া আমার ঘাম বরাবরই খুব বেশি। আর শরীরের মধ্যে মাথায় ঘাম খুব বেশি হয়। যার ফলে দেখছো না চুল কেমন পাতলা হয়ে যাচ্ছে।" আমি বললাম ওকে।
"
তা তোমার প্রেশার টেশার নেই তো?" সঞ্জীব জিজ্ঞাসা করল।
" 120/70
এটাকে তো নর্মাল বলেই মনে হয়। তাই না।বরং একটু নীচের দিকে। তবে আমার যেটা মনে হয় ক্যালসিয়ামের অভাবে অনেক সময় কায়িক পরিশ্রম স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলে ঘামের পরিমাণও বেশি হয়।" আমি ওদের বললাম।
"So you have calcium deficiency."
"Yes I think I have."
আমি বললাম
কিছুটা এগিয়ে চলতে চলতে হঠাত্ করে নীচের দিকে দেখতে পেলাম অনেক টিনের চালার ঘরবাড়ি। এখান থেকে দূরত্ব এখনও প্রায় দেড় কিমি হবে। এতটা দূরত্ব থাকার জন্য ঘরবাড়িগুলো বেশ ছোট ছোট আর খুব সুন্দর লাগছিল। সূর্যের কিরণ সেই ঘরবাড়িগুলোর উপর এসে পড়েছে। একটা মিঠে রোদের খেলা চলছে গাছপালার ফাঁক দিয়ে। হঠাত্ করে তন্ময় পেছন থেকে চিত্কার করে বলল - " এই সঞ্জীব দেখে" দেখলাম পা স্লিপ করে সঞ্জীব হড়কে বেশ খানিকটা নীচে চলে গেছে। কিন্তু ওর হাতে ট্রেকিং স্টিকটা থাকায় আর বডি ওয়েটটা কম হওয়ায় নিজেকে সামলে নিল। আসলে প্রকৃতিকে অনুভব করতে গিয়ে নিজেদের অনুভূতিগুলো মাঝে মাঝে বোধহয় হারিয়ে যায়। তাছাড়া এখানকার রাস্তাটাতো আর স্বাভাবিক নয়। কেমন যেন ভাঙা ভাঙা। নুড়ি পাথর গুলি কেমন একটা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দেখে মনে হয় যেন রাস্তাটা ভাঙা হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। বেশ কয়েকবার ভাঙা পাথরের উপর পা পরে মচকেছে আমার। তাই সাবধানে চলবার চেষ্টা করছি।
-------------------
ঘড়িতে দেখলাম সকাল এগারোটা বেজে দশ। আমরা গৈরিবাস এসে গেছি। একটা ফাঁকা ঘাসের জমি দেখে পাঁচজনে একসঙ্গে এসে বসলাম। শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আজ। আজকে উতরাই পথ কিন্তু তবুও আমাদের হাঁটবার গতি খুব কম। আসলে সারা শরীরে একটা ব্যাথা অনুভব করছি। আমাদের রুকস্যাক ব্যাগগুলোকে নামিয়ে রেখে বুদ্ধ যোগেন কাছেই একটা ট্রেকিং টিমের সাথে ফুটবল খেলছে। সর্বাশীষ ওদের হাত নেড়ে ডাকাতে বুদ্ধ বলল যে একটু পরেই চা আর মোমো নিয়ে আসবে। অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে।
আমরা যেখানে বসে আছি তার ঠিক সামনেই দেখলাম SASHASTRA SIMA BALL এর মিলিটারি ক্যাম্প। যোগেন সেখানে গেল ট্রেকিং পাস নিয়ে। এই গৈরিবাস থেকে রাস্তাটা আবার চড়াই। সামুদ্রিক তল থেকে গৈরিবাসের উচ্চতা 2625 মিটার। কালাপোখরীর উচ্চতা 3186 মিটার। সুতরাং খুব স্বাভাবিক কারণেই আবার চড়াই রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। কিছুক্ষণ বসবার পর চা মোমো খেলাম। তারপর আবার যাত্রা শুরু হল। চড়াই রাস্তা হলেও আগের মতো ভাঙাচোরা নয়। আর এই এলাকা থেকে আরও অনেক ট্রেকিং টিমের দল সব একজোট হয়ে চলেছে। আমরাও চলেছি। অনেক যুবতী মহিলা অংশগ্রহণ করেছে ওই সব টিমে। কথাবার্তায় মনে হল বেশিরভাগই উত্তরভারত থেকে আসা মহিলা। বাঙালি দু একজন ছাড়া দেখতে পেলাম না। পাহাড়ী বাঁক টপকে চলেছি তো চলেইছি। রাস্তা আর শেষ হওয়ার নয়। গলা শুকিয়ে কাঠ। মাঝে মাঝে এক ঢোক কি দু ঢোক জলপান করে,কখনও লজেন্স বা বাবুলগাম মুখে রেখে চলেছি। সারা শরীর অবশ। আমার সারা শরীরে ঘাম চপচপ করছে। আবহাওয়া মেঘলা কুয়াশাচ্ছন্ন হওয়ার দরুন শরীরে থাকা জামাকাপড় ভিজে একসার।পকেটের রুমালটি ঘাম মুছে মুছে এমন অবস্থা যে সেটাকে ব্যাগের বেল্টের সাথে বেঁধে রাখতে হয়েছে। যাতে হাওয়া লেগে খানিকটা শুকায়। আরও খানিক ওপরে ওঠার পর কুয়াশা অত্যধিক ঘন হওয়ার কারণে সামনে সাত আট হাত দূরের বস্তু দেখতে পাচ্ছিলাম না। রাস্তার মাঝবরাবর টুকটুক করে হাঁটছি। একধারে গভীর খাদ আর একধারে কাঁটাগাছ নুড়ি পাথর পাহাড়ের এবড়ো খেবড়ো দেওয়াল যা কিনা কুয়াশার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আমার হাঁটার গতিবেগ এতটাই শ্লথ হয়ে গেল যে আমি সেই রাস্তায় একদম একা হয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে সেই রাস্তার উচ্চতা আরও বাড়তে থাকল। যতই উচ্চতা বাড়ছে ততই আমার গতি মন্থর হচ্ছে কেমন যেন একটা ভয় ভয় পেয়ে বসল আমার মধ্যে। অস্পষ্ট একটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ ক্রমশ আমার কানে বাজতে থাকল। দু একবার পিছনে তাকালাম। কিন্তু কই, কেউ তো পিছনে নেই। তাহলে আওয়াজটা কিসের? কানে ঠাণ্ডা লাগার জন্য পকেটে করে তুলো নিয়ে গিয়েছিলাম। সেইসময় তুলো বার করে কানে গুঁজে দিলাম। এখন শব্দটা কিছুটা হলেও কম আসছে। কিন্তু কিছুতেই পুরোপুরি যাচ্ছে না। ব্যাপারটা কি? একজায়গায় স্থির হয়ে দাড়ালাম। না কোনও শব্দ নেই। আবার চলা শুরু করলাম। আবার শব্দটি শুরু হল। আসলে আমার পায়ের জুতোর শব্দ পাহাড়ের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার আমার কানকে জাগ্রত করছে। যাইহোক বুঝতে পেরে খানিক স্বস্তি বোধ করলাম। আবার সমস্ত শরীর,মন প্রাণ একত্র করে জোরে জোরে হাঁটা লাগালাম। মনে মনে ভাবলাম কোথায় শত, কোথায় সর্বা, সঞ্জীব আর কোথায় বা তন্ময়। চারদিকে তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা শুধু এটুকু বুঝতে পারছি যে চড়াই পথটা আমি হয়তো পেরিয়ে গেছি। কারণ এখন সমতলে হাঁটলে যেরকম লাগে আমার সেরকমই বোধ হচ্ছে। অনেকেরই কন্ঠস্বর কানে আসছে কিন্তু কাউকেই কুয়াশার কারণে দেখতে পাচ্ছি না। সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্ করেই অনুভব করলাম যে আমি কিছুটা রাস্তা নীচের দিকে নেমে গেছি। ঠিক ছোটখাটো জলাশয় বা পুকুরপাড়ে নামতে গেলে যেরকম অনুভব হয় আমারও ঠিক সেইরকম অনুভব হল। কেমন যেন সন্দেহ হল যে আমি ঠিকমতো হাঁটছি তো? হঠাত্ আমার জ্যাকেটের পিঠের অংশের দিকটা কেউ একজন টেনে ধরল। আর বেশ জোরালো গলায় বলল - আরে কোথায় চলেছ? আরে এটা তো কালাপোখরী লেক। সামনে এগোলেই বিপদ।
------------
তারপর---------ট্যানট্যান্যান----------------পরের পর্বে


Comments

Popular posts from this blog

মিশন সান্দাকফু

MISSION SANDAKFU লেখক : - প্রেমাংশু দেবনাথ মিশন সান্দাকফু - প্রথম পর্ব পরিচয় - ট্রেন টা এক ঘণ্টার উপর লেট আছে । - তো , কি হয়েছে ? এই সুযোগে বরং ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নে। - ওরে তুই জুতো টা পর রে। - এই শত হাত মুখ টা ধুয়ে নে এবার। - দ্যাখ্ শতদল টা এখনও ঘুমোচ্ছে । - ওর পেছনে একটা ক্যাত করে লাগা দেখবি তিরিং করে উঠবে। - ওরে শতদল নিউ জলপাইগুড়ি আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঢুকবে। -Get ready boys. এই ভাবেই শুরু হয়েছিল মিশন সান্দাকফু। ট্রেকিংয়ের সময়ে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি । তাই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে লেখাটি আবার শুরু করলাম । সেদিনটা ছিল 18/12/16 । সকাল সাড়ে আটটা কি নটা হবে । সেদিন সকালে সবচেয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠল আমাদের শত। মানে শতদল জানা। কিন্তু সান্দাকফু পৌঁছাল সবার প্রথমে। শতদল কে বলা যেতে পারে আমাদের কাণ্ডারী বা পথের দিশারী । ওই হল আমাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ছিপছিপে চেহারা । অ্যাথলেটিক ফিগার । হাইট আন্দাজ 5'8" । মনে হচ্ছিল এই ...

ভাইজ্যাগ ২০৪০

ভাইজ্যাগ ২০৪০ অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ। সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদ...

ভগবান ও শয়তানের লড়াই

ভগবান ও শয়তানের লড়াই ভগবানঃ- পৃথিবীটাকে কেন ধীরে ধীরে শেষ করে দিতে চাইছিস? আর কত! থামা এবার! প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির উপর নিজের প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করছিস ক্রমাগত। ওরে শয়তান কবে শেষ হবে তোর এই লীলা খেলা? শয়তানঃ- তুই শালা নিজেকে কি ভাবিস বে? শালা উদগান্ডু। অনেক ক্ষমতাবান না তুই! আর আমি পৃথিবীটাকে শেষ করে দিতে চাইছি? ঠিক আছে, তাহলে তাই। বেশ করেছি। এই পৃথিবী, এই জগৎ, এই মহাজাগতিক সব কিছুকে সৃষ্টি করতে কে বলেছিল? জানিস না যেই মুহূর্তে সৃষ্টির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকেই ধ্বংসের দিন, ক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। আর এই কাজটি করি আমি। করছি এবং করতেই থাকব। তোর যখন এত ক্ষমতা, মানুষ যখন তোকে এত পুজো করে, তখন আটকে দেখা দেখি। কিভাবে পারিস দেখি ধ্বংসকে রুখতে। ভগবানঃ- ভুল বলছিস। সৃষ্টি অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যু, দুটোই আমার নিয়ন্ত্রণে। একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টির কাজ করে থাকি আমি। আমার কাজ মানুষকে চিন্তা, ভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক কাজে প্রয়োগ করা। আমি চাই না যে মানুষ আমাকে অন্ধ বিশ্বাসের মতো পুজো করুক। আমি চাই সঠিক আলো, সঠিক পথ অবলম্বন করে এক মানুষ অপর মানুষকে সাহায্য করুক, দুস্থদের...

আমার জীবনে তিন নারী

আমার জীবনে তিন নারী যে কোনও পুরুষের জীবনেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যে কোনও মানুষের জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা ...

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব -        দেবু বাবু শুনছেন! দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না। তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন আছেন য...

মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব

MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব টোংলুর পথে ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো? - দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল। - ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল। - জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল। ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় । - তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম । এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু কর...

প্রেমের কিছু কথা ও গান

প্রেমের কিছু কথা ও গান আজ হঠাৎ করেই যেন তোমাকে দেখতে পেলাম। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। তুমি একটা দরজার সামনে দাড়িয়ে আছ। বাইরে থেকে আলো এসে তোমার মুখেতে পড়েছে। দুলছে হাওয়ায় তোমার খোলা চুল। আমার ঘর আলো করে দাড়িয়ে রয়েছ তুমি। হাল্কা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি দেখছিলে আমাকে। তোমার সেই প্রাণভোলানো, মনজুড়ানো, সারল্যমাখা হাসি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। যা আজও দিচ্ছে। অনেকসময়েই। মনে হচ্ছিল এক ছুটে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু কেমন করে যাই। আমি যে অথর্ব। এক জড়ভরত। দেখলাম সারা ঘরময় তুমি হেঁটে বেড়াচ্ছ। শিশুর মতো খেলে বেড়াচ্ছ। কি এক অপার্থিব সুখ যেন আমার শরীরে অনুভূত হচ্ছে তোমাকে দেখতে পেয়ে। “হামেশা তুমকো চাহা, অউর চাহা, চাহা, চাহাআআআ...............” গুনগুণ করে গাইতেই থাকছি দেবদাস সিনেমার এই গানটি। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। দেখছি আরশির মধ্যে দিয়ে তুমি আমার দিকে মিটিমিটি হাসছ। সেই তোমার মুক্ত ঝরানো হাসি। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছ তুমি। জানি তা আমারই উদ্দেশ্যে। খুবই ইচ্ছে করছিল জানো তোমার পরশ পেতে। কিন্তু যখনই আরশির কাছে গেলাম ও হাতটা বাড়ালাম, তুমি কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেলে।...

মরীচিকা

মরীচিকা উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক রাখেনি। গার্গীও চায় না। ...

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ হায়দ্রাবাদের  MGBS STOPPAGE পৌঁছানোর পর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম নেক্সট বাসের জন্য যেটা কিনা  হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট পৌছবে। তার মধ্যে নয় নয় করে প্রায় 10/12 বার অটোয়ালারা আমার সাথে দরদাম করে গেছে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে 200 তো কেউ 150 তো কেউ আবার 300 ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখার্জি দা , চক্রবর্তী দা বলেই রেখেছিলেন যে ভুল করে কক্ষনো অটোতে চাপতে যাবে না। তোমার ফ্লাইট যখন সকাল আটটার পর তখন তুমি ভোর চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত MGBS এ অপেক্ষা করবে পরের বাসের জন্য। বাস এসে পড়লে তাতে উঠে পড়বে। ভাড়া হয়তো নেবে পঁচিশ থেকে তিরিশ টাকা কিংবা বড়জোর চল্লিশ টাকা। তাছাড়া অটোর থেকে অনেকগুণ আগেই গন্তব্যে পৌছে যাবে। আমিও তাই করলুম। বাস আসলো পাঁচটা দশ নাগাদ ভোরবেলায়। ভোরবেলার সদ্য প্রস্ফুটিত আলোয়  হায়দ্রাবাদ  শহরটিকে দেখতে দেখতে , খানিক ঢুলু ঢুলু চাহনিতে , ঝিমোতে ঝিমোতে পৌছে গেলাম হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট সকাল ছটা পনেরো নাগাদ। মুখার্জি দা বলেছিলেন :- - এয়ারপোর্ট গিয়ে দেখবে লোকাল কিছু বাস দাড়িয়ে আছে। সেগুলো তোমাকে ড...

মুঠো ফোন

মুঠো ফোন ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি । তার পাশে কমন স্পেস দিয়ে ঘরে যাওয়ার রাস্তা । দোতলায় উঠে সিঁড়ির ঠিক দ্বিতীয় কি তৃতীয় ধাপে বসে থাকে ও। মানে অসীম , আমাদের অসীম কুমার । হাতে একখানা স্মার্ট ফোন সঙ্গে একটা হেডফোন , কানে গোঁজা ।রোজ রাত দশটার পর থেকে চলে গল্প কথন , মন দেওয়া নেওয়ার খেলা , হাসি , ঠাট্টা , মুখ ভেংচানো , দূরভাষ যন্ত্রে একে অপরের চলচ্ছবি দেখা । স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন তো শুধু শোনা নয় বরং একে অপরকে বেশ ভালভাবেই কাছে পান প্রেমিক যুগল বা আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , বাবা মা ইত্যাদি ইত্যাদি । একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলায় আসবার সময় কোন একজনের পদচারণার শব্দ । রমিত চাটুজ্জের প্রবেশ ।দোতলায় অসীম কুমারের সামনে আসে রমিত ।ওকে জিজ্ঞাসা করে .........."বলি হ্যাঁরে হতভাগা , আর কত কষ্ট দিবি ক তো ওই যন্তরটারে ? " " রমিত দা আবার এসে শুরু করলে ? খাওয়া হয়ে গেছে যখন , যাওনা গিয়ে শুয়ে পর এবার।" - অসীম বলল। রমিত - " হ্যাঁরে পোড়ারমুখো আমারে দেইখ্যা জ্বলন তো হইবই। অহন তুই চাইনার মাইয়াটার লগে প্রেম করতাছস্ , আমি হইলাম গিয়া কাবাব মে হাড্ডি , জ্বলন তো হইবই।...