মিশন সান্দাকফু - ষষ্ঠ পর্ব
টোংলুর রাতের অভিজ্ঞতা
চারিদিক কেমন যেন ঘোলাটে, বর্ণহীন। খুব জোরে সোঁ সোঁ করে হাওয়া বইছে। তার মধ্যে দিয়েই শুনতে পেলাম বহুদূর থেকে আসা তন্ময়ের ডাক।
- এই শতঅঅতঅঅ, অত জোরে ছুটিস না।
- শতঅঅঅতঅঅঅ------------- এই শতঅঅঅতঅঅঅ-------------
শতদল প্রাণপণে ছুটে চলেছে চড়াই রাস্তাটার উপর দিয়ে। পিঠে ব্যাগ। হাতের লাঠিটাকে মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। আমরা সবাই ওর সাথে তাল মেলানোর জন্য জোরে জোরে ছুটে চলেছি। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছি না। ওর জীবনীশক্তি অফুরন্ত।
- শতঅঅঅতঅঅঅ------ দাঁড়াআআআ---------- অত জোরে যাসনেএএএএ------- মুখ থুবড়ে পড়বিইইইই।
- দুর শালা, শালা ল্যাদখোরের দল, তোরা কি এখানে দাড়িয়ে আড্ডা মারতে এসেছিস। তাড়াতাড়ি চল সব। আমাকে এই সিঙ্গালীলা রেঞ্জটা কভার করতেই হবে।
লক্ষ করলাম শতদলের চোখ, মুখ সব আগুনের মতো লাল হয়ে আছে। রাগে ফেটে পড়ছে যেন। কোনও কিছুকেই আর তোয়াক্কা করছে না ও। ওকে থামানোর চেষ্টা করে সঞ্জীব, তন্ময়, সর্বাশীষ ও সবশেষে আমি, আমরা চারজনে পাগলের মতো খাঁড়াই রাস্তার উপর দিয়ে ছুটে চলেছি। হঠাত্ দেখলাম সামনে একটা বিশালাকার পাথরের চাঁই, প্রায় এক মানুষ লম্বা, আমাদের দিকে গড়িয়ে আসছে ওপরের পাহাড়ী পথ বেয়ে। সেই বিশাল গোলাকার পাথরের একদম সামনে শতদল পৌছে যাচ্ছে। পাথরটা শতদলের দিকে। আর শতদল চোখ গুলো বড় বড় করে চেল্লাতে চেল্লাতে পাথরটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় দুজনের ধাক্কা লাগবার মুহূর্তে শতদলের বিশাল এক লাফ। ঠিক যেমন করে গুলাম সিনেমায় আমীর খান সামনের দিকে ধেয়ে আসা ট্রেনটাকে ক্রস করে লাফিয়েছিল ঠিক সেইরকম ভাবে। আমি ভীষণ রকম চমকে উঠলাম। দেখলাম পাথরটা তীব্রবেগে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। তন্ময়, সঞ্জীব ও সর্বাশীষের কি অবস্থা দেখতে যাব হঠাত্ করে আমার পা ফসকে গেল। আমি পাহাড়ী রাস্তার পাশের খাদটায় পড়ে গেলাম।
হঠাত্ করে শুনতে পেলাম কাঠের মেঝের উপর কারওর হেঁটে চলার আওয়াজ। কেউ যেন একজন তীব্রভাবে পায়চারি করছে।
- কি রে, সর্বা, কি হয়েছে তোর?
- দম নিতে পারছি না, খুব কষ্ট হচ্ছে। সেই মুহূর্তে আমি ধড়ফড় করে উঠলাম বিছানা ছেড়ে। দেখলাম সর্বাশীষ সাড়া ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছে। ছটফট করছে। সঞ্জীব আবারও ওকে এক ডোজ COCA 30 খাওয়ালো। আমি বিছানার উপর উঠে বসেছি। আসলে স্বপ্ন দেখছিলাম। পাহাড়, গোলাকার পাথরের চাঁই, শতদলের পাগলের মতো দৌড়ানো এইসব।
- তুই এক কাজ কর ভাই। এই ঘরের দরজাটা খুলে বারান্দার সামনেটা গিয়ে দাঁড়া। বাইরে যাস না। Temperature এখন কিন্তু মাইনাসে। তন্ময় কটা বাজে রে এখন? - শতদল জিজ্ঞাসা করল।
- রাত সাড়ে বারোটা।
- কি রে প্রেম তুই এখন ঠিক আছিস তো? যা খেল দেখাচ্ছিলি গুরু।
- হ্যাঁ ঠিক আছি। সর্বার কি শ্বাসের সমস্যা হচ্ছে? আসলে ঘরটাতো একদম বদ্ধ। সাফোকেশন তৈরি হয়েছে। দরজাটা না হয় হাল্কা করে কিছুক্ষণ খোলাই থাক।
- হ্যাঁ সে না হয় হোল। কিন্তু ঘুমের মধ্যে চিত্কার করছিলিস কেন?
- স্বপ্ন দেখছিলাম।
- কিসের? ক্যাটরিনা কাইফকে জড়িয়ে ধরে আদর করার স্বপ্ন?
-তাহলে কি আর চিত্কার করি। পাহাড়ের থেকে খাদে পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
- যাচ্চলে। তুই ওই খাদেই পড়বি যা মনে হচ্ছে। এ চল চল শুয়ে পড় সবাই। সর্বা ঠিক হলে ও আপনিই চলে আসবে।- এই বলে শতদল ও ওরা শুয়ে পড়ল।
আমি একটু জল খেয়ে লাইটটা নিভিয়ে আবার এসে শুলাম। শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকলাম এই কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।
লামেডুরা থেকে প্রায় 4 কিমি পথ অতিক্রম করে যখন আমরা টোংলু এসে পৌছলাম তখন বিকেল সাড়ে চারটে হবে। আমরা GTA এর তৈরি করা TREKKERS HUT এ উঠলাম। দেখতে খুব সুন্দর। কাঠের তৈরি ঘর। যে ঘরটিতে আমাদেরকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল সেটাতে মোট সাতটা বেড ছিল।কিন্তু ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কম হওয়ার দরুন ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছিল। একদম সহ্য হচ্ছিল না। ঘরেতে একটাই 5 WATT এর CFL বাল্ব লাগানো। তাতে একে অপরের মুখটাই স্পষ্ট দেখা যায় না। আসলে এখানে ইলেকট্রিক নেই। সব কিছু সোলার পাওয়ারের উপর নির্ভরশীল। তাই লাইটের এত অভাব। ইলেকট্রিক না থাকার কারণে আমাদের প্রত্যেকের মোবাইলগুলো মাঝে মাঝে সুইচ অফ করে রাখতে হয়েছিল। অত্যধিক ঠাণ্ডা থাকার জন্য এখানে রাত 7টা থেকে 7:30 এর মধ্যে ডিনার কমপ্লিট করে নিতে হয়েছিল। এরপরে না খাবার পাওয়া যায়, না কেউ জেগে থাকে। সেই সময় সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমরা সন্ধ্যা 6 টার পর বিছানায় বসে বসে বেশ খানিকক্ষণ ধরে আড্ডা মারছিলাম। ঘন্টাখানেক আড্ডা হওয়ার পর হঠাত্ করেই আমার কাঁপুনি দিয়ে শীত ওঠে। শীতের চোটে দাঁতে দাঁত লেগে যায়। একদম ঠকঠক করে কাঁপতে থাকি সেই সময়। কোনও রকমে ডিনার কমপ্লিট করে এসে একটা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাই এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিন্তু লেপ ও কম্বলে আমার শীত না কমার জন্য শতদল ওর SLEEPING BAG টা খুলে তার মধ্যে ঢুকতে বলল। আমিও তাই করেছিলাম। যার ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই শীত একদম গায়ের হয়ে গেল। উল্টে পেটগরম হয়ে গেল। আর পেটগরম হলে ভুলভাল স্বপ্ন দেখাটা অস্বাভাবিক নয়। ডাক্তারদের সেইরকমই মত।
কিছুক্ষণ পর সর্বাশীষ ফিরে আসল। জিজ্ঞাসা করতে বলল যে ওর সমস্যাটা ঠিক হয়ে গেছে। আসলে পাহাড়ী এলাকায় অক্সিজেনের পরিমাণ কম হওয়ার জন্য অনেককেই এই ধরনের সমস্যায় ভুগতে হয়।
পরের দিন সকালে (20/12/16)
- এই সঞ্জীব ওঠ ভাই। সাতটা বেজে গেছে। রেডি হয়ে আটটার মধ্যে বেরোতেই হবে।
- কি; পেটের মধ্যে থেকে কিছু বেরোল? আমি শতদলকে জিজ্ঞাসা করলাম।
-হ্যাঁ, তবে খুব সামান্যই। শোন, ভাল কথা। এখানে কিন্তু জল খুব কম। একটাই মগ। তাতে করেই জল নিয়ে যেতে হবে বাইরে রাখা বড়ো বড়ো ড্রাম থেকে। পটি হয়ে গেলে এক মগ এক মগ করে জল নিয়ে দিয়ে দিস। ভেতরে কিন্তু কোনও বালতির ব্যবস্থা নেই।
সেইসময় তন্ময় উঃআঃ কি ঠাণ্ডা বলতে বলতে ঘরের ভেতরে এসে ঢুকল। আমাকে বলল - ভাই প্রেমাংশু ঠান্ডায় বাঁ হাতটাকে আর খুঁজে পাচ্ছি না বস।
- আর সোনা পোনার কি অবস্থা?
- আরে ভাই সোনা পোনার চামড়া তো মোটা হয়ে গেছে। তাই সেরকম সমস্যা হয় নি। কিন্তু হাতের কোনও সার নেই।
- এক কাজ কর না। হাতটা প্রথমে কিছুক্ষণ লেপের ভেতর রাখ, তারপর একটু গরম অনুভব করলে হ্যান্ডগ্লাভসটা পড়ে নিও।
সকালের কাজকর্ম সাড়া হলে আমরা কিচেনে গিয়ে গরম গরম রুটি,আলু,ক্যাপসিকাম ও গাজরের সবজি চা সহযোগে খেলাম। সকালের 1/2 ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম রুটি খেতে বেশ ভালো লাগছিল। তবে এই TREKKERS HUT টাতে খাওয়া দাওয়া সেরকম ভালো হয়নি। গতরাতে তো শুধু ভাত,ডাল,পাপড় ভাজা, একটা সবজি( কি দিয়ে খেয়েছিলাম মনে নেই ) ও ওমলেট দিয়ে ডিনার শেষ করেছিলাম। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবারও নতুন উদ্যমে শুরু করলাম ব্যাগপত্তর গুছোনো। সেই দুটো দুটো করে চারখানা রুকস্যাক ব্যাগ বুদ্ধ এবং যোগেনকে দেওয়া হল। চেষ্টা করলাম এবারে যাতে ওদের ব্যাগের ওজন গুলোকে একটু কম করা যায়। টোংলুর TREKKERS HUT থেকে বেরোলাম সকাল সাড়ে আটটা কি নটা নাগাদ। আমাদের এর পরের গন্তব্য টামলিং হয়ে গৈরিবাস ও গৈরিবাস থেকে কালীপোখারী। মোট 13কিমি পথ অতিক্রম করতে হবে আজকে। আজকের পথে উতরাই রাস্তা অনেক বেশি। আর সবচেয়ে বড়ো চমক আমরা এখন যাব নেপালের মধ্যে দিয়ে। কারণ কালীপোখারী জায়গাটা নেপালের অন্তর্গত।--------------কি আছে সেখানে ------------ আসবে সপ্তম পর্বে ।

Comments
Post a Comment