মিশন সান্দাকফু - অষ্টম পর্ব
একটু উষ্ণতার জন্য
টিমটিম করে একটা বাতি জ্বলছে ঘরের মধ্যে। আবছা আবছা আলো সেখানে। অন্ধকারটা আমাদের প্রত্যেককে গ্রাস করে রয়েছে। তাতে একে অপরের মুখটা ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। একটা বড় ডাইনিং টেবিলের চারপাশে বসে রয়েছি আমি,সঞ্জীব,তন্ময়, সর্বাশীষ ও শতদল। ঘরের মধ্যে আলো ছায়ার খেলা চলছে। আমাদের হাতে দস্তানা, পায়ে মোজা, কানে মাফলার বা টুপি। শীতে জবুথবু আমরা সবাই। আমাদের সাথে রয়েছে বুদ্ধ, যোগেন এবং আরও দু চারজন। তারা অন্য একটা ট্রেকিং টিমের। চা ও চাউমিনের অর্ডার দিয়ে আমরা হাল্কা আড্ডা মারছি।
- এই শুধু শুধু বসে না থেকে ওই পাঁপড়ের প্যাকেটটা খোল। প্রেম পাঁপড়টা নিয়ে আন্টিকে দে তো। শুকনো করে উনুনে সেঁকে দিক। খেতে ভালোই লাগবে শুকনো পাঁপড়। কি বল? - শতদল বলল।
আমি আমাদের সাথে আনা পাঁপড়ের প্যাকেটটা নিয়ে গেলাম উনুনের কাছে। কাঠের জ্বালানির উনুন। এই সময় আগুনের গরম আঁচটা নিতে দারুণ লাগছে।
- দিজিয়ে মুঝে দিজিয়ে। এই বলে যোগেন এগিয়ে এসে পাঁপড়ের প্যাকেটটা আমার হাত থেকে নিল ও উনুনে পাঁপড় সেঁকতে লাগল। আমিও ওর সাথে হাত লাগালাম।
- তুমহারা ইয়ে নেচার মুঝে বহুত আচ্ছা লগতা হ্যায়। তুম কভি ভি বৈঠে নেহি রহেতে হো।
- হা, হর টাইম বিজি রহেনা পসন্দ করতা হু। উসসে শরীর কা যো দর্দ হ্যায় না সব চলে যাতা হ্যায়। আপ যাদা বৈঠে রহেঙ্গে তো শরীর মে যাদা দর্দ পকর লেগা। - যোগেন বলল।
- তুমকো হামেশা কাম করনা আচ্ছা লগতা হ্যায় না?
- জী হা। আপলোগ ভী বৈঠিয়ে মত। থোরাসা চলিয়ে ফিরিয়ে। বাহারসে চন্দা মামা কা সুন্দর রোশনী আ রহী হ্যায় ওহ যাকে দেখিয়ে। থোরাসা ইধর উধর ভাগিয়ে।
- সহী কাহা তুমনে। হমলোগ তো বহুত কামচোর হ্যায়। ইসলিয়ে হমলোগকা তবিয়ত ইতনা বিগড়তা হ্যায়।
কালাপোখরীর যে TREKKERS HUT টাতে উঠেছি সেটার ঘরগুলো একটু ছোট ছোট হওয়ায় ঠাণ্ডা টোংলু অপেক্ষা কম। এখানে একজন মধ্যবয়সী মহিলা যাকে আমরা আন্টি বলে সম্বোধন করছি, উনি এবং ওনার মেয়ে আমাদের জন্য রাতের রান্না করছেন। মেয়েটিকে দেখতে বেশ সুন্দর। বয়স আন্দাজ 25 এর মধ্যেই বোধহয়। পরিধেয় বস্ত্র বেশ চিত্তাকর্ষক। হেয়ার কাটিং ভীষণ স্টাইলিশ, বেশ লম্বা ও ইউ আকৃতির কেশ। পরনে একটা কালো কোট হাঁটু পর্যন্ত লম্বা। কোমরে কটি বন্ধ। চোখে একটা বেশ বড়ো কালো ফ্রেমের চশমা। মুখশ্রীর মধ্যে একটা বুদ্ধিদীপ্ত ছাপ থাকায় খুব স্মার্ট দেখাচ্ছে ওকে। ও যেখানে দাঁড়িয়ে রান্নার কাজে ওর মাকে সাহায্য করছে তার পাশেই একটা টেবিলে দেখলাম চেতন ভগতের " FIVE POINT SOMEONE " বইটি। সুতরাং এই ফ্যামিলিতে যে একটা আধুনিকতা ও আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে তা বেশ ভালরকম বোঝা গেল।
সন্ধ্যা 6টা বেজে 5 মিনিটে আমরা চা সহযোগে পাঁপড় ভাজা খেলাম। সঙ্গে জোরদার আড্ডা। হঠাত্ করে শতদল জিজ্ঞাসা করল আমায় --------
কি রে ভাই, তুই ওখানে হঠাত্ পাঁপড় ভাজতে চলে গেলি যে?
- একটু উষ্ণতার জন্য। আমি বললাম।
- এ যে ডাবল মিনিং প্রেম ভাই। - সঞ্জীব বলল।
- হ্যাঁ ভাই। যে যেভাবে নেবে। আমি গেলাম তোমাদের জন্য পাঁপড় সেঁকতে আর তোমরা তো ভাবলে অন্য কিছু। ভালো ভালো।
- তুই সত্যি করে বলতো তুই কি ওখানে শুধু পাঁপড় সেঁকতেই গিয়েছিলি?
- বললাম তো একটু উষ্ণতার জন্য গিয়েছিলাম। ডবল মিনিং করে নিলে তো আর কোন সন্দেহ থাকে না তাই না।
- তা উষ্ণতা পেলি?
- হ্যাঁ পেলাম তো। উনুনের কাছে শারীরিক উষ্ণতা আর ওর কাছে চাক্ষুষ উষ্ণতা।
- জিও জিও প্রেম ভাই । চালিয়ে যাও।
- তা যাই হোক। তুই কিন্তু সাবধানে চলাফেরা করিস।
- কেন কি হল?
- কেন আবার। কালাপোখরীর লেকে আরেকটু হলে ডুবতে যাচ্ছিলিস। তন্ময় তোকে হঠাত্ করে না দেখলে তো আজ একটা কেলেঙ্কারি বাঁধিয়েছিলিস আর কি। এখন আবার পাঁপড় সেঁকতে সেঁকতে অন্য কোথাও চলে যাসনা যেন।
- বলি কা বখড়া বনা রহা হ্যায় কা? হা? চল চল জলদি জলদি চায়ে কে সাথ পাঁপড় খতম কর।
আমরা সেই রাতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় ডিনার শেষ করলাম। তারপর স্বচ্ছ আকাশে সুন্দর চাঁদের দৃশ্য দেখলাম। বুঝলাম আকাশ পরিস্কার হয়েছে। অর্থাত্ কুয়াশা ও মেঘের ঘনঘটা এখন আর নেই। মনে মনে বলতে লাগলাম যে আগামী কালও যেন আকাশ এইরকম পরিস্কার থাকে। তাহলে সকাল সকাল স্নো ফল এবং সান্দাকফুতে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য খুব লাভজনক হবে। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। তাই আর বাইরে থাকলাম না। ঘরে এসে বসলাম। ট্রেকিং শেষ করে আসার পর হাতে পায়ে ও বুকে পিঠে আমি খুব ভালো করে সরষের তেল মেখে নিয়েছিলাম। তাই এত ঠাণ্ডাতেও সেদিন আমি অতটা কাবু হইনি। সেইসময় সঞ্জীব আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল
- কোথায় কোথায় তেল লাগালে প্রেম ভাই?
- বললে বুঝতে পারবে তো?
- এতে না বোঝার কি আছে?
- GASTROCNOMEOUS, HAMSTRING, QUADRICEPS, GLUTEOUS MAXIMUS & MINIMUS in lower part of human body. & DELTOID, BICEPS, TRICEPS, PRONATOR TERES, TEAPEZOID IN UPPER. ......
- ঠিক আছে ।থাম থাম। বাইসেপস্, ট্রাইসেপস্ আর ডেলটয়েড এই তিনটে চিনি। বাকিগুলো জাস্ট মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
- মাধ্যমিকের সাঁতরার বইয়ে দেওয়া আছে ছবি সমেত। দেখে নিও।
- তোমার এখনও এইসব মনে আছে?
- মনে রাখতে হয় বস্। নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়। তাছাড়া ট্রেকিং করব বলে এসেছি। কোন কোন মাসল্ ব্যাথা হচ্ছে সেগুলো যদি নাই বুঝলাম তাহলে আর কিসের ট্রেকিং করলাম।
রাতের বেলা আমরা কেউ COCA 30 কেউ SPONGIA 30 কেউ PARACETAMOL খেয়ে নিলাম ঠাণ্ডা ও গা হাতপা ব্যাথা থেকে বাঁচতে। তারপর আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করবার পর সটান লেপের তলায় বডি চালান করলাম। কালাপোখরীতে আমরা দুটো রুম পেয়েছিলাম। একটায় আমি আর সর্বাশীষ আর অপরটায় তন্ময়,সঞ্জীব আর শতদল। পাশের ঘর থেকে তন্ময় আমায় জিজ্ঞাসা করল -
" প্রেমাংশু এই লেপের ভেতর একসাথে সবার ঢুকে যাওয়াকে এক কথায় কি বলবে?
- আমি চেঁচিয়ে বললাম " একটু উষ্ণতার জন্য।"
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
- তা উষ্ণতার জন্য একটা গান হয়ে যাক। - শতদল বলল।
- আমি শুরু করলাম
" কৌন হ্যায় যো সপনো মে আয়া
কৌন হ্যায় যো দিল মে সমায়া
ওহ্ ঝুক গয়া আসমা ভী
ইশক নে মেরা রঙ্গ লায়া।
ও প্রিয়া আআআআআ আআআ---------------
চলবে -------------
Comments
Post a Comment