মরীচিকা
উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন
গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর
একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ
করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ
বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে
চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ
করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস
হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে
সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও
নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন
যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে
নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও
গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক
রাখেনি। গার্গীও চায় না। ও একা হাতেই সব কিছু সামলে নেয়। এ নিয়ে ওর কোন অভিযোগও
নেই পূর্বায়ণের প্রতি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই একই কাজ, এই টিফিন বানানো, রান্না করা,
একটু টিভি অথবা গান শোনা আর সন্ধ্যে বেলা কলিগ বন্ধুদের বাড়িতে আড্ডা দিয়ে জীবনটা
যেন একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছে গার্গীর।
আজ পূর্বায়ণ অফিস চলে
যাওয়ার পর তাই এই কথাগুলো বারবার মনে হতে লাগল গার্গীর। কিন্তু কেন যে এরকম মনে
হতে লাগল সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না ও। বিয়ের আগে যখন ও জানতে পারল যে পূর্বায়ণ ওকে
বাইরে নিয়ে গিয়ে ওকে সাথে করে নিয়ে রাখবে, তখন গার্গীর আনন্দের সীমা ছিল না। কত
রকম স্বপ্ন দেখা, আনন্দে মনের মধ্যে কত রকম রঙিন জাল বোনা শুরু করেছিল ও সেসময়। কিন্তু
আজ ওর মনে একটা প্রশ্নই ঘোরাফেরা করে। সেটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। মনে মনে ও ভাবে ‘কি
আমার অস্তিত্ব? আমার জীবনের উদ্দেশ্যটাই বা কি? আমি কি শুধুমাত্র সংসার সামলিয়েই
জীবনটা শেষ করে দেব?’ বিয়ের আগে একটা চাকরি করত গার্গী। কম্পুটারের ওয়েব
ডিজাইনিঙের উপর একটা কোর্স করে একটা ছোট খাটো চাকরিও পেয়েছিল। পূর্বায়ণের সাথে ওর
প্রেম করেই বিয়ে। কিন্তু বিয়ে ঠিক হওয়াতে তখন হঠাৎ করেই গার্গী চাকরীটা ছেড়ে দেয়
পূর্বায়ণের সাথে কোনরকম আলোচনা না করে। আজ মাঝে মাঝেই পূর্বায়ণ বলে যে হুট করে
চাকরীটা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয়নি গার্গীর। কিন্তু ও কি পারত বিয়ের পর গার্গীকে একা
ছেড়ে থাকতে? আজ পূর্বায়ণ কথায় কথায় নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতার কথা বলে কিন্তু
গার্গী বেশ হাড়ে হাড়ে টের পায় যখন সংসারের কোন কাজে সামান্য ছোটখাটো বা খুঁটিনাটি
ভুল হয়, তখন পূর্বায়ণ কিরকম রিঅ্যাক্ট করে। প্রায়শই ওকে বলতে শোনা যায় ‘তোমার জন্য
আমার জীবনটা শালা হেল হয়ে গেল’। ঠিক যেন চিনতে পারে না ও পূর্বায়ণকে। সেই সময়
নিজেকে ভীষণ একা মনে হয় ওর। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে ও। তখন
মনে হয় চাকরীটা ছেড়ে দিয়ে এসে বোধহয় ঠিকই করেছে ও। যে পুরুষ মানুষ সামান্য পান
থেকে চুন খসলেই চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে দেয়, সে একা একা কিভাবে সংসারটা সামলাত
সেটা ভাবলেই অবাক হয়ে যায় গার্গী। গার্গীর মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে পূর্বায়ণের
গার্গীর প্রতি প্রেম, ভালবাসা, শারীরিক ও মানসিক টান যেন বিয়ের পর থেকে অনেকটাই
কমতে শুরু করেছে। বিয়ের আগে ওরা মাঝে মধ্যেই কখনও সিনেমা হলে, পার্কে, কখনও
গার্গীর নিজের বাড়িতে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে মিলিত হত। অবাধে যাওয়া আসা ছিল পূর্বায়ণের
গার্গীর বাড়িতে। যদিও গার্গী ছিল অনেক বেশি রক্ষণাত্মক। নিজের আব্রু কখনওই
পূর্বায়ণের হাতে পুরোপুরি সঁপে দেয়নি। কিন্তু পূর্বায়ণকে বেশ ভাল লাগত ওর এই
ছেলেমানুষির জন্য, এই পাগলামির জন্য।
ঘড়িতে সকাল সাড়ে নটা।
মনটা অন্যমনস্ক হওয়ার দরুন অনেক সময় গড়িয়ে চলে গেল। এরপর ঘরের বাকি কাজগুলোও সেড়ে
ফেলতে হবে। তার আগে ও স্নান সারবে বলে ঠিক করল। সেই বুঝে বাথরুমে ঢুকল। বেডরুমের
সাথে লাগোয়া বাথরুম ওর। কি একটা মনে হওয়াতে ও বাথরুমের থেকে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের
লম্বা আয়নাটার সামনে দাঁড়াল। নিজেকে দেখতে লাগল ও ভাল করে। পরনের নাইটি টাকে ছেড়ে
ফেলল। শরীরে অন্তর্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রায় উন্মুক্ত শরীরটাকে ভাল করে দেখতে
লাগল ও। একটু যেন মুটিয়েছে। পেটে বেশ খানিক মেদ জমেছে এই ২৭/২৮ বছরেই। কিন্তু মুখ,
স্তন, সারা শরীর, ফর্সা রঙয়ের চামড়া এর জৌলুস তো কমেনি। যে চামড়ার ফর্সা রঙ নিয়ে
গার্গীর বেশ একটু গর্বই ছিল তার জৌলুস তো এখনও রয়েছে। তবে কেন পূর্বায়ন অতটা আগ্রহ
দেখায় না ওর প্রতি। সপ্তাহে এক দুদিনের বেশি শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতেই চায় না
গার্গীর সাথে। এ নিয়ে বেশি জোরাজুরি করলে ও বলে প্রাচীন যোগাসনের বইতে সপ্তাহে এক
বা দুদিনের বেশি সহবাস শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর বলে উল্লেখ আছে। মাঝে মাঝে পূর্বায়ণকে
কেমন সেঁকেলে মনে হয় গার্গীর। ওদের দুজনের বয়সের পার্থক্যটা তো খুব বেশি নয়। পাঁচ
বছরের। কিন্তু এরই মধ্যে কেমন যেন হাঁফিয়ে ওঠে পূর্বায়ণ। কোন দ্বিতীয় নারীর সাথে সম্পর্ক
থাকতে পারে এরকম কখনও মনে হয় না গার্গীর। ও সমস্ত কিছু যুক্তি দিয়ে মিলিয়ে দেখেছে।
আর পূর্বায়ণ যেহেতু একটু সহজ, সরল স্বভাবের তাই গার্গী ওকে বিশ্বাসও করে
পুরোমাত্রায়। কিন্তু তবুও কেন যেন মনের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের দানা আটকে যায়।
জীবনটাকে ধীরে ধীরে মরীচিকা মনে হতে থাকে ওর। মাঝে মাঝে পূর্বায়ণ ওকে আবার নতুন
করে সব কিছু শুরু করতে বলে। আবার নতুন করে চাকরী-বাকরির চেষ্টা করতে বলে। কিন্তু
গার্গী কিছুতেই পেরে ওঠে না। ওর খালি মনে হতে থাকে সম্পর্কের বাঁধনটা যেন এই কম
সময়েই কেমন আলগা হয়ে আসছে। নতুন করে শুরু করলে এ বাঁধন আরওই আলগা হতে থাকবে।
জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলো ধীরে ধীরে কেমন ফিকে হতে শুরু করছে। সবই যেন কেমন মরীচিকায়
পরিণত হচ্ছে।
গভীর রাত। আড়াইটে তিনটে
হবে। পূর্বায়ণ ঘুমের মধ্যে শুনতে পায় চাঁপা গোঙানির শব্দ। ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে
দেখে গার্গী বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
- -গার্গী, এই গার্গী কি হয়েছে? কাঁদছ কেন?
- -তুমি বুঝবে না। তোমার কি মন বলে কিছু আছে? নিজের ভালমন্দ
ছাড়া তুমি কি আর কিছু বোঝ?
-
-কেন বউ? কি করেছি আমি বল? আমি কি তোমার খেয়াল রাখছি না?
-
-কতটুকু খেয়াল রাখ তুমি আমার? কখনও বোঝ কি আমার মনের কষ্ট?
সংসারের বাকি জিনিসের কোনও খোঁজখবর রাখ একমাত্র দোকান আর বাজার ছাড়া? এই জীবনই কি
আমি ছেয়েছিলাম? সব মরীচিকার মত লাগছে।
-
-দেখ গার্গী, এই সময়ে অফিসে খুব চাপের জন্য হয়ত তোমার খেয়াল
ততটা রাখতে পারছি না। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আমি তোমায় অবহেলা করছি, আমি
তোমার কথা ভাবছি না।
-
-মনে করো না ছাই। আমার প্রতি সেই টান তোমার কোথায় যা বিয়ের
আগে ছিল। তখন পাগলের মত আমায় চাইতে, দুদিন দেখা না হলে ফোন করে আমাকে পাগল করে
দিতে। কোথায় গেল তোমার সেই আবেগ, সেই ভালবাসা? সকাল ৯ টার আগেই বেরিয়ে যাও আর ফেরো
সেই রাত দশটায়। কখনও তারও পর। তারপর নিজের পছন্দসই খানাপিনা, টিভি, ফেসবুক, হোয়াটসয়াপ
এসব করেই তো তুমি তোমার জীবনটা কাটাচ্ছ। এখানে আমি কোথায়? আমার কি অস্তিত্ব আছে
তুমি বলতে পার?
-
-দেখ তুমি যেগুলো চাইছ সেগুলো যে কোন মেয়েই তার স্বামীর কাছ
থেকে চায় বিয়ের পর। এটাই স্বাভাবিক। আমি হয়ত কিছুটা সময় বের করে তোমার সাথে
থাকলাম, কথা বললাম, তোমার সাথে মনের কথা শেয়ার করলাম। কিন্তু এতেই কি তোমার মনের
যে চাহিদা তা মিটবে? আমার দৈনন্দিন জীবনে অনেকটা সময়ই আমি অফিসকে দিয়ে রেখেছি।
সেটাকে নিয়েই তো আমাকে চলতে হবে। সাথে তোমাকে নিয়েও। কিন্তু ভাল করে বোঝ গার্গী,
আমি ছাড়াও তোমার নিজস্ব একটা জীবন আছে। যেটা তোমার, একান্তই তোমার।
-
-আর তোমার জীবনটা কি আমার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নেই?
-
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই আছে। আমি তো অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি
ছাড়াও তোমার তো একটা নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে, নিজস্ব প্যাশন আছে। তুমি কেন এত একা
হয়ে যাচ্ছ জানো? কারণ তুমি আমাকে সময় দিয়ে মাপতে থাকছ সবসময়। কতটুকু সময় আমি থাকছি
আর কতটুকু সময় আমি থাকছি না, শুধু এসবই তোমার মাথায় ঘুরছে। কিন্তু এই স্বল্পসময়ের
মধ্যেও আমাদের জীবনের ঘটে যাওয়া এমন কিছু ভাল ঘটনা বা স্মৃতি আছে যা হয়ত তোমাকে
আনন্দ দিয়েছে। যে সুখকর ঘটনাগুলোর কথা হয়ত তুমি বিয়ের আগে ভেবেও দেখনি। জীবনটা
শুধুমাত্র মরীচিকা হয়ে গেল এরকম না ভেবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাও। নিজের কথা ভাবো। নিজের
ফেলে আসা প্যাশনের কথা ভাবো, আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করো তাহলে দেখবে তুমি আর
কখনওই একা হচ্চো না। তখন হয়ত এই মরীচিকাময় জীবনের মধ্যেও জলের সন্ধান পাবে।
চুপ করে
পূর্বায়ণের কথাগুলো শুনতে থাকে গার্গী। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সত্যি একেক
সময় পূর্বায়ণকে কেমন যেন অচেনা লাগে। ভীষণ ম্যাচিওরড মনে হয়। পূর্বায়ণও গার্গীর
দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। বাঁ হাত দিয়ে গার্গীর গালের উপর নেমে আসা চুলগুলোকে
হাল্কা করে সরিয়ে দেয়। কপালে একটা স্নেহচুম্বন দিয়ে বলে ‘এবারে তাহলে ঘুমাতে যেতে
পারি ম্যাডাম?’ গার্গীও সামান্য একটা স্মাইল করে পাশ ফিরে শোয়। সত্যিই জীবনটাকে তো
আর বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যেতেই পারে। নইলে মরীচিকার হাত
থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।

Khub valo laglo pore. Onek ta match kore amader construction field a jara ache tader daily life er sathe.
ReplyDeleteহ্যাঁ আমাদের লাইফের অনুকরণেই রচিত। আমি তো সবাইকেই দেখছি। সমস্যাটা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।
Deletegood one
ReplyDeleteThank You Subarna Di.....................
DeleteThank You PK. Keep in touch................
ReplyDeleteExecellent work. Keep it up...
ReplyDelete