Skip to main content

মরীচিকা


মরীচিকা


উফফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন গার্গী। রোজ সকাল বেলা এই সময়টায় খুব তাড়াহুড়ো পড়ে যায় ওর। সকাল সাড়ে আটটার পর একটু রিলিফ পায় যেন। ছ’টার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ টাশ করবার পর ঘর ঝাড়া, মোছা করে পূর্বায়ণের জন্য সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট ও অফিসের লাঞ্চ বানিয়ে তবেই ওর মুক্তি। গার্গীর স্বামী পূর্বায়ণ একটি মালটি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে পোস্টেড। পূর্বায়ণ ঘড়ি ধরে, সময় মেনে কাজ করতে পছন্দ করে। সময়ের একটু নড় চড় হলেই দুম করে মাথাগরম, চেঁচামেচি চলতে থাকে ওর। আজ আট মাস হল গার্গীর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগে জীবন সম্পর্কে ওর যে ধারণা ছিল, বিয়ের পর থেকে সেই ধারণাটা যেন বদলাতে শুরু করেছে। পূর্বায়ণ যে ওকে খুব কষ্টে রেখেছে এমনটা মোটেও নয়। বরং পূর্বায়ণের মতে বেশ ভালোই রেখেছে ও গার্গীকে। কিন্তু গার্গীর মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে দিন কে দিন। বিয়ে হওয়ার পর পরই পূর্বায়ণ গার্গীকে নিয়ে এসেছে ঝাড়খণ্ডে অফিসের ফ্ল্যাটে। দুজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। কিন্তু তবুও গার্গীর যেন মন পুরোপুরি ভরে না। দুজনের সংসার বলে পূর্বায়ণ কোনও কাজের লোক রাখেনি। গার্গীও চায় না। ও একা হাতেই সব কিছু সামলে নেয়। এ নিয়ে ওর কোন অভিযোগও নেই পূর্বায়ণের প্রতি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই একই কাজ, এই টিফিন বানানো, রান্না করা, একটু টিভি অথবা গান শোনা আর সন্ধ্যে বেলা কলিগ বন্ধুদের বাড়িতে আড্ডা দিয়ে জীবনটা যেন একঘেয়ে লাগতে শুরু করেছে গার্গীর।  

আজ পূর্বায়ণ অফিস চলে যাওয়ার পর তাই এই কথাগুলো বারবার মনে হতে লাগল গার্গীর। কিন্তু কেন যে এরকম মনে হতে লাগল সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না ও। বিয়ের আগে যখন ও জানতে পারল যে পূর্বায়ণ ওকে বাইরে নিয়ে গিয়ে ওকে সাথে করে নিয়ে রাখবে, তখন গার্গীর আনন্দের সীমা ছিল না। কত রকম স্বপ্ন দেখা, আনন্দে মনের মধ্যে কত রকম রঙিন জাল বোনা শুরু করেছিল ও সেসময়। কিন্তু আজ ওর মনে একটা প্রশ্নই ঘোরাফেরা করে। সেটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। মনে মনে ও ভাবে ‘কি আমার অস্তিত্ব? আমার জীবনের উদ্দেশ্যটাই বা কি? আমি কি শুধুমাত্র সংসার সামলিয়েই জীবনটা শেষ করে দেব?’ বিয়ের আগে একটা চাকরি করত গার্গী। কম্পুটারের ওয়েব ডিজাইনিঙের উপর একটা কোর্স করে একটা ছোট খাটো চাকরিও পেয়েছিল। পূর্বায়ণের সাথে ওর প্রেম করেই বিয়ে। কিন্তু বিয়ে ঠিক হওয়াতে তখন হঠাৎ করেই গার্গী চাকরীটা ছেড়ে দেয় পূর্বায়ণের সাথে কোনরকম আলোচনা না করে। আজ মাঝে মাঝেই পূর্বায়ণ বলে যে হুট করে চাকরীটা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয়নি গার্গীর। কিন্তু ও কি পারত বিয়ের পর গার্গীকে একা ছেড়ে থাকতে? আজ পূর্বায়ণ কথায় কথায় নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতার কথা বলে কিন্তু গার্গী বেশ হাড়ে হাড়ে টের পায় যখন সংসারের কোন কাজে সামান্য ছোটখাটো বা খুঁটিনাটি ভুল হয়, তখন পূর্বায়ণ কিরকম রিঅ্যাক্ট করে। প্রায়শই ওকে বলতে শোনা যায় ‘তোমার জন্য আমার জীবনটা শালা হেল হয়ে গেল’। ঠিক যেন চিনতে পারে না ও পূর্বায়ণকে। সেই সময় নিজেকে ভীষণ একা মনে হয় ওর। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে ও। তখন মনে হয় চাকরীটা ছেড়ে দিয়ে এসে বোধহয় ঠিকই করেছে ও। যে পুরুষ মানুষ সামান্য পান থেকে চুন খসলেই চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে দেয়, সে একা একা কিভাবে সংসারটা সামলাত সেটা ভাবলেই অবাক হয়ে যায় গার্গী। গার্গীর মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে পূর্বায়ণের গার্গীর প্রতি প্রেম, ভালবাসা, শারীরিক ও মানসিক টান যেন বিয়ের পর থেকে অনেকটাই কমতে শুরু করেছে। বিয়ের আগে ওরা মাঝে মধ্যেই কখনও সিনেমা হলে, পার্কে, কখনও গার্গীর নিজের বাড়িতে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে মিলিত হত। অবাধে যাওয়া আসা ছিল পূর্বায়ণের গার্গীর বাড়িতে। যদিও গার্গী ছিল অনেক বেশি রক্ষণাত্মক। নিজের আব্রু কখনওই পূর্বায়ণের হাতে পুরোপুরি সঁপে দেয়নি। কিন্তু পূর্বায়ণকে বেশ ভাল লাগত ওর এই ছেলেমানুষির জন্য, এই পাগলামির জন্য।

ঘড়িতে সকাল সাড়ে নটা। মনটা অন্যমনস্ক হওয়ার দরুন অনেক সময় গড়িয়ে চলে গেল। এরপর ঘরের বাকি কাজগুলোও সেড়ে ফেলতে হবে। তার আগে ও স্নান সারবে বলে ঠিক করল। সেই বুঝে বাথরুমে ঢুকল। বেডরুমের সাথে লাগোয়া বাথরুম ওর। কি একটা মনে হওয়াতে ও বাথরুমের থেকে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের লম্বা আয়নাটার সামনে দাঁড়াল। নিজেকে দেখতে লাগল ও ভাল করে। পরনের নাইটি টাকে ছেড়ে ফেলল। শরীরে অন্তর্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রায় উন্মুক্ত শরীরটাকে ভাল করে দেখতে লাগল ও। একটু যেন মুটিয়েছে। পেটে বেশ খানিক মেদ জমেছে এই ২৭/২৮ বছরেই। কিন্তু মুখ, স্তন, সারা শরীর, ফর্সা রঙয়ের চামড়া এর জৌলুস তো কমেনি। যে চামড়ার ফর্সা রঙ নিয়ে গার্গীর বেশ একটু গর্বই ছিল তার জৌলুস তো এখনও রয়েছে। তবে কেন পূর্বায়ন অতটা আগ্রহ দেখায় না ওর প্রতি। সপ্তাহে এক দুদিনের বেশি শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতেই চায় না গার্গীর সাথে। এ নিয়ে বেশি জোরাজুরি করলে ও বলে প্রাচীন যোগাসনের বইতে সপ্তাহে এক বা দুদিনের বেশি সহবাস শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর বলে উল্লেখ আছে। মাঝে মাঝে পূর্বায়ণকে কেমন সেঁকেলে মনে হয় গার্গীর। ওদের দুজনের বয়সের পার্থক্যটা তো খুব বেশি নয়। পাঁচ বছরের। কিন্তু এরই মধ্যে কেমন যেন হাঁফিয়ে ওঠে পূর্বায়ণ। কোন দ্বিতীয় নারীর সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে এরকম কখনও মনে হয় না গার্গীর। ও সমস্ত কিছু যুক্তি দিয়ে মিলিয়ে দেখেছে। আর পূর্বায়ণ যেহেতু একটু সহজ, সরল স্বভাবের তাই গার্গী ওকে বিশ্বাসও করে পুরোমাত্রায়। কিন্তু তবুও কেন যেন মনের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের দানা আটকে যায়। জীবনটাকে ধীরে ধীরে মরীচিকা মনে হতে থাকে ওর। মাঝে মাঝে পূর্বায়ণ ওকে আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে বলে। আবার নতুন করে চাকরী-বাকরির চেষ্টা করতে বলে। কিন্তু গার্গী কিছুতেই পেরে ওঠে না। ওর খালি মনে হতে থাকে সম্পর্কের বাঁধনটা যেন এই কম সময়েই কেমন আলগা হয়ে আসছে। নতুন করে শুরু করলে এ বাঁধন আরওই আলগা হতে থাকবে। জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলো ধীরে ধীরে কেমন ফিকে হতে শুরু করছে। সবই যেন কেমন মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে।  

গভীর রাত। আড়াইটে তিনটে হবে। পূর্বায়ণ ঘুমের মধ্যে শুনতে পায় চাঁপা গোঙানির শব্দ। ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে দেখে গার্গী বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
-  -গার্গী, এই গার্গী কি হয়েছে? কাঁদছ কেন?
-   -তুমি বুঝবে না। তোমার কি মন বলে কিছু আছে? নিজের ভালমন্দ ছাড়া তুমি কি আর কিছু বোঝ?
-   
-কেন বউ? কি করেছি আমি বল? আমি কি তোমার খেয়াল রাখছি না?
-   
-কতটুকু খেয়াল রাখ তুমি আমার? কখনও বোঝ কি আমার মনের কষ্ট? সংসারের বাকি জিনিসের কোনও খোঁজখবর রাখ একমাত্র দোকান আর বাজার ছাড়া? এই জীবনই কি আমি ছেয়েছিলাম? সব মরীচিকার মত লাগছে।
-  
-দেখ গার্গী, এই সময়ে অফিসে খুব চাপের জন্য হয়ত তোমার খেয়াল ততটা রাখতে পারছি না। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আমি তোমায় অবহেলা করছি, আমি তোমার কথা ভাবছি না।
-   
-মনে করো না ছাই। আমার প্রতি সেই টান তোমার কোথায় যা বিয়ের আগে ছিল। তখন পাগলের মত আমায় চাইতে, দুদিন দেখা না হলে ফোন করে আমাকে পাগল করে দিতে। কোথায় গেল তোমার সেই আবেগ, সেই ভালবাসা? সকাল ৯ টার আগেই বেরিয়ে যাও আর ফেরো সেই রাত দশটায়। কখনও তারও পর। তারপর নিজের পছন্দসই খানাপিনা, টিভি, ফেসবুক, হোয়াটসয়াপ এসব করেই তো তুমি তোমার জীবনটা কাটাচ্ছ। এখানে আমি কোথায়? আমার কি অস্তিত্ব আছে তুমি বলতে পার?
-  
-দেখ তুমি যেগুলো চাইছ সেগুলো যে কোন মেয়েই তার স্বামীর কাছ থেকে চায় বিয়ের পর। এটাই স্বাভাবিক। আমি হয়ত কিছুটা সময় বের করে তোমার সাথে থাকলাম, কথা বললাম, তোমার সাথে মনের কথা শেয়ার করলাম। কিন্তু এতেই কি তোমার মনের যে চাহিদা তা মিটবে? আমার দৈনন্দিন জীবনে অনেকটা সময়ই আমি অফিসকে দিয়ে রেখেছি। সেটাকে নিয়েই তো আমাকে চলতে হবে। সাথে তোমাকে নিয়েও। কিন্তু ভাল করে বোঝ গার্গী, আমি ছাড়াও তোমার নিজস্ব একটা জীবন আছেযেটা তোমার, একান্তই তোমার।
-   
-আর তোমার জীবনটা কি আমার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নেই?
-   
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই আছে। আমি তো অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমি ছাড়াও তোমার তো একটা নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে, নিজস্ব প্যাশন আছে। তুমি কেন এত একা হয়ে যাচ্ছ জানো? কারণ তুমি আমাকে সময় দিয়ে মাপতে থাকছ সবসময়। কতটুকু সময় আমি থাকছি আর কতটুকু সময় আমি থাকছি না, শুধু এসবই তোমার মাথায় ঘুরছে। কিন্তু এই স্বল্পসময়ের মধ্যেও আমাদের জীবনের ঘটে যাওয়া এমন কিছু ভাল ঘটনা বা স্মৃতি আছে যা হয়ত তোমাকে আনন্দ দিয়েছে। যে সুখকর ঘটনাগুলোর কথা হয়ত তুমি বিয়ের আগে ভেবেও দেখনি। জীবনটা শুধুমাত্র মরীচিকা হয়ে গেল এরকম না ভেবে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাও। নিজের কথা ভাবো। নিজের ফেলে আসা প্যাশনের কথা ভাবো, আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করো তাহলে দেখবে তুমি আর কখনওই একা হচ্চো না। তখন হয়ত এই মরীচিকাময় জীবনের মধ্যেও জলের সন্ধান পাবে।

চুপ করে পূর্বায়ণের কথাগুলো শুনতে থাকে গার্গী। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সত্যি একেক সময় পূর্বায়ণকে কেমন যেন অচেনা লাগে। ভীষণ ম্যাচিওরড মনে হয়। পূর্বায়ণও গার্গীর দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। বাঁ হাত দিয়ে গার্গীর গালের উপর নেমে আসা চুলগুলোকে হাল্কা করে সরিয়ে দেয়। কপালে একটা স্নেহচুম্বন দিয়ে বলে ‘এবারে তাহলে ঘুমাতে যেতে পারি ম্যাডাম?’ গার্গীও সামান্য একটা স্মাইল করে পাশ ফিরে শোয়। সত্যিই জীবনটাকে তো আর বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যেতেই পারে। নইলে মরীচিকার হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়।

Comments

  1. Khub valo laglo pore. Onek ta match kore amader construction field a jara ache tader daily life er sathe.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ আমাদের লাইফের অনুকরণেই রচিত। আমি তো সবাইকেই দেখছি। সমস্যাটা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।

      Delete
  2. Thank You PK. Keep in touch................

    ReplyDelete
  3. Execellent work. Keep it up...

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মিশন সান্দাকফু

MISSION SANDAKFU লেখক : - প্রেমাংশু দেবনাথ মিশন সান্দাকফু - প্রথম পর্ব পরিচয় - ট্রেন টা এক ঘণ্টার উপর লেট আছে । - তো , কি হয়েছে ? এই সুযোগে বরং ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নে। - ওরে তুই জুতো টা পর রে। - এই শত হাত মুখ টা ধুয়ে নে এবার। - দ্যাখ্ শতদল টা এখনও ঘুমোচ্ছে । - ওর পেছনে একটা ক্যাত করে লাগা দেখবি তিরিং করে উঠবে। - ওরে শতদল নিউ জলপাইগুড়ি আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই ঢুকবে। -Get ready boys. এই ভাবেই শুরু হয়েছিল মিশন সান্দাকফু। ট্রেকিংয়ের সময়ে লেখার সময় করে উঠতে পারিনি । তাই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে লেখাটি আবার শুরু করলাম । সেদিনটা ছিল 18/12/16 । সকাল সাড়ে আটটা কি নটা হবে । সেদিন সকালে সবচেয়ে লেটে ঘুম থেকে উঠল আমাদের শত। মানে শতদল জানা। কিন্তু সান্দাকফু পৌঁছাল সবার প্রথমে। শতদল কে বলা যেতে পারে আমাদের কাণ্ডারী বা পথের দিশারী । ওই হল আমাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। ছিপছিপে চেহারা । অ্যাথলেটিক ফিগার । হাইট আন্দাজ 5'8" । মনে হচ্ছিল এই ...

ভাইজ্যাগ ২০৪০

ভাইজ্যাগ ২০৪০ অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজমের নিজস্ব রিসর্টের দোতলার বিশাল বারান্দা থেকে রুশিকোনডা বিচটাকে খুব সুন্দর লাগে দেখতে। বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রের স্রোত ও বৃষ্টির মনোরম দৃশ্যকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন আটান্ন বছরের প্রৌঢ় অংশুমান রায়। কিন্তু বারেই বারেই যেন মনে হচ্ছে এই ২০৪০ সালের ভাইজ্যাগের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান ২০১৮ সালের ভাইজ্যাগের থেকে। আজ থেকে দীর্ঘ ২২ বছর আগে কোন এক শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় যুবক অংশুমান ভাইজ্যাগে এসেছিল। সাথে ছিল ওর স্ত্রী কঙ্কণা। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। শরীরে ও মনে ভরা যৌবন। সামনে থেকে দ্যাখা উদ্দাম সমুদ্রের মতই তখন ওদের মনের গতিবেগ। সর্বদা উচ্ছ্বসিত। কিন্তু আজ অংশুমান এসেছেন রোজকার সেই একঘেয়ে জীবন থেকে একটু মুক্তির খোঁজে। সঙ্গে স্ত্রী কঙ্কণাও আছেন। সমুদ্রের উদ্দামতা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু এই প্রৌঢ় দম্পতির জীবনে সেই আবেগ, সেই উচ্ছ্বাস আর আগের মত নেই। একটু শান্তির খোঁজে, একটু নিরালায়, একটু বিশ্রামের অভিপ্রায় নিয়েই এখানে আসা। দোতলার এই বিশাল বারান্দায় মাঝখানে রাখা একটা মাঝারি সাইজের টি টেবিল। টেবিলের দুপাশে রাখা দুটো বেশ বড় আরাম কেদারা। আরাম কেদ...

ভগবান ও শয়তানের লড়াই

ভগবান ও শয়তানের লড়াই ভগবানঃ- পৃথিবীটাকে কেন ধীরে ধীরে শেষ করে দিতে চাইছিস? আর কত! থামা এবার! প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে প্রকৃতির উপর নিজের প্রতিশোধস্পৃহা ব্যক্ত করছিস ক্রমাগত। ওরে শয়তান কবে শেষ হবে তোর এই লীলা খেলা? শয়তানঃ- তুই শালা নিজেকে কি ভাবিস বে? শালা উদগান্ডু। অনেক ক্ষমতাবান না তুই! আর আমি পৃথিবীটাকে শেষ করে দিতে চাইছি? ঠিক আছে, তাহলে তাই। বেশ করেছি। এই পৃথিবী, এই জগৎ, এই মহাজাগতিক সব কিছুকে সৃষ্টি করতে কে বলেছিল? জানিস না যেই মুহূর্তে সৃষ্টির জন্ম সেই মুহূর্ত থেকেই ধ্বংসের দিন, ক্ষণ সব শুরু হয়ে যায়। আর এই কাজটি করি আমি। করছি এবং করতেই থাকব। তোর যখন এত ক্ষমতা, মানুষ যখন তোকে এত পুজো করে, তখন আটকে দেখা দেখি। কিভাবে পারিস দেখি ধ্বংসকে রুখতে। ভগবানঃ- ভুল বলছিস। সৃষ্টি অর্থাৎ জন্ম এবং মৃত্যু, দুটোই আমার নিয়ন্ত্রণে। একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টির কাজ করে থাকি আমি। আমার কাজ মানুষকে চিন্তা, ভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে সঠিক কাজে প্রয়োগ করা। আমি চাই না যে মানুষ আমাকে অন্ধ বিশ্বাসের মতো পুজো করুক। আমি চাই সঠিক আলো, সঠিক পথ অবলম্বন করে এক মানুষ অপর মানুষকে সাহায্য করুক, দুস্থদের...

আমার জীবনে তিন নারী

আমার জীবনে তিন নারী যে কোনও পুরুষের জীবনেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর শুধু পুরুষ কেন একজন নারীর জীবনেও নারীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। না এক্ষেত্রে অন্যরকম করে ভাবার কিছু নেই। আমার জীবনের গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে যে তিনজন নারীর ভূমিকা রয়েছে আমি আজ সেটাই আলোচনা করতে যাচ্ছি। যে কোনও মানুষের জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকে নারী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিভাবে? যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মায়ের কথা ভাবি তাহলে বুঝব যে মাতৃশক্তি কিরকম ভাবে আমাদের ছোটবেলাগুলোকে ঘিরে রাখত। একজন বাচ্চার জন্মের আগে থেকে সেই বাচ্চার বেড়ে ওঠার যে সময়কাল সেটাতে একজন নারী বা বলাউচিত একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করা থেকে শুরু করে তাকে পরম মমতায় লালন পালন করা, তার প্রতিটা মুহূর্তকে আগলে রাখা, তার বেড়ে ওঠাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এগুলোর মাধ্যমে নারীশক্তির পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। সেই জন্য বলা যেতেই পারে “কোন একজন মানুষের বেড়ে ওঠাতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য”। পৃথিবীতে নারীর ভুমিকাই প্রধান। এছাড়া আমরা তো এও জানি যে আমাদের ধরিত্রী বা বসুমতীকে একজন নারী বা একজন মা ...

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব

তিরুপতিতে তিনজন – দ্বিতীয় পর্ব -        দেবু বাবু শুনছেন! দেবু আচমকা পিছন ঘুরে সেই ব্যক্তির দিকে তাকাল। ও এ তো ওর অফিসের একজন সাপ্লায়ার। বাঙালি। দেবুর হটাৎ করে মনে হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া সেই লোকটির কথা। না এ লোকটি সেই লোক নয়। ইনি রায়বাবু। উনিও তিরুপতি ঘুরতে এসেছেন সপরিবারে। দেবু ওনার বিল পেমেন্ট করে থাকে বলে রায়বাবু দেবুকে বেশ খাতির যত্ন করে। এখানেও তাই রায়বাবুকে দেবুর প্রতি বেশ একটু যত্নশীল মনে হল। যদিও দেবু ওদের সাথে সময় নষ্ট না করে সামান্য কথাবার্তা শেষ করে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। চকু দা এবং পালবাবু দুজনেই বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন। দেবু পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে ওর চোখ দুটো সেই ট্রেনের লোকটিকে খুঁজতে লাগল। চকু দা পিছন থেকে তাড়া দিতে থাকছে বারবার। জিজ্ঞাসা করাতে বলল, কে এক ভদ্রলোক নাকি ওদের সেই লজের সামনে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলেছে যেখানে গেলে মন্দির দর্শনের স্পেশাল টিকিট ও লজে থাকার ফ্রি টিকিট ওদের তিনজনকে দেওয়া হবে। দেবু এই ব্যাপারটা ঠিকমত জানত না। তাই ও চকু দা’কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল। চকু দা বলল মিস্টার সুব্রমনিয়াম বলে একজন আছেন য...

মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব

MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব টোংলুর পথে ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো? - দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল। - ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল। - জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল। ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় । - তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম । এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু কর...

প্রেমের কিছু কথা ও গান

প্রেমের কিছু কথা ও গান আজ হঠাৎ করেই যেন তোমাকে দেখতে পেলাম। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। তুমি একটা দরজার সামনে দাড়িয়ে আছ। বাইরে থেকে আলো এসে তোমার মুখেতে পড়েছে। দুলছে হাওয়ায় তোমার খোলা চুল। আমার ঘর আলো করে দাড়িয়ে রয়েছ তুমি। হাল্কা করে ঘাড় ঘুরিয়ে তুমি দেখছিলে আমাকে। তোমার সেই প্রাণভোলানো, মনজুড়ানো, সারল্যমাখা হাসি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। যা আজও দিচ্ছে। অনেকসময়েই। মনে হচ্ছিল এক ছুটে চলে যাই তোমার কাছে। কিন্তু কেমন করে যাই। আমি যে অথর্ব। এক জড়ভরত। দেখলাম সারা ঘরময় তুমি হেঁটে বেড়াচ্ছ। শিশুর মতো খেলে বেড়াচ্ছ। কি এক অপার্থিব সুখ যেন আমার শরীরে অনুভূত হচ্ছে তোমাকে দেখতে পেয়ে। “হামেশা তুমকো চাহা, অউর চাহা, চাহা, চাহাআআআ...............” গুনগুণ করে গাইতেই থাকছি দেবদাস সিনেমার এই গানটি। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক। দেখছি আরশির মধ্যে দিয়ে তুমি আমার দিকে মিটিমিটি হাসছ। সেই তোমার মুক্ত ঝরানো হাসি। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিচ্ছ তুমি। জানি তা আমারই উদ্দেশ্যে। খুবই ইচ্ছে করছিল জানো তোমার পরশ পেতে। কিন্তু যখনই আরশির কাছে গেলাম ও হাতটা বাড়ালাম, তুমি কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে উবে গেলে।...

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ

হায়দ্রাবাদের হাওয়াই জাহাজ হায়দ্রাবাদের  MGBS STOPPAGE পৌঁছানোর পর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম নেক্সট বাসের জন্য যেটা কিনা  হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট পৌছবে। তার মধ্যে নয় নয় করে প্রায় 10/12 বার অটোয়ালারা আমার সাথে দরদাম করে গেছে এয়ারপোর্ট নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেউ বলে 200 তো কেউ 150 তো কেউ আবার 300 ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখার্জি দা , চক্রবর্তী দা বলেই রেখেছিলেন যে ভুল করে কক্ষনো অটোতে চাপতে যাবে না। তোমার ফ্লাইট যখন সকাল আটটার পর তখন তুমি ভোর চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত MGBS এ অপেক্ষা করবে পরের বাসের জন্য। বাস এসে পড়লে তাতে উঠে পড়বে। ভাড়া হয়তো নেবে পঁচিশ থেকে তিরিশ টাকা কিংবা বড়জোর চল্লিশ টাকা। তাছাড়া অটোর থেকে অনেকগুণ আগেই গন্তব্যে পৌছে যাবে। আমিও তাই করলুম। বাস আসলো পাঁচটা দশ নাগাদ ভোরবেলায়। ভোরবেলার সদ্য প্রস্ফুটিত আলোয়  হায়দ্রাবাদ  শহরটিকে দেখতে দেখতে , খানিক ঢুলু ঢুলু চাহনিতে , ঝিমোতে ঝিমোতে পৌছে গেলাম হায়দ্রাবাদ  এয়ারপোর্ট সকাল ছটা পনেরো নাগাদ। মুখার্জি দা বলেছিলেন :- - এয়ারপোর্ট গিয়ে দেখবে লোকাল কিছু বাস দাড়িয়ে আছে। সেগুলো তোমাকে ড...

মুঠো ফোন

মুঠো ফোন ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি । তার পাশে কমন স্পেস দিয়ে ঘরে যাওয়ার রাস্তা । দোতলায় উঠে সিঁড়ির ঠিক দ্বিতীয় কি তৃতীয় ধাপে বসে থাকে ও। মানে অসীম , আমাদের অসীম কুমার । হাতে একখানা স্মার্ট ফোন সঙ্গে একটা হেডফোন , কানে গোঁজা ।রোজ রাত দশটার পর থেকে চলে গল্প কথন , মন দেওয়া নেওয়ার খেলা , হাসি , ঠাট্টা , মুখ ভেংচানো , দূরভাষ যন্ত্রে একে অপরের চলচ্ছবি দেখা । স্মার্ট ফোনের দৌলতে এখন তো শুধু শোনা নয় বরং একে অপরকে বেশ ভালভাবেই কাছে পান প্রেমিক যুগল বা আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব , বাবা মা ইত্যাদি ইত্যাদি । একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলায় আসবার সময় কোন একজনের পদচারণার শব্দ । রমিত চাটুজ্জের প্রবেশ ।দোতলায় অসীম কুমারের সামনে আসে রমিত ।ওকে জিজ্ঞাসা করে .........."বলি হ্যাঁরে হতভাগা , আর কত কষ্ট দিবি ক তো ওই যন্তরটারে ? " " রমিত দা আবার এসে শুরু করলে ? খাওয়া হয়ে গেছে যখন , যাওনা গিয়ে শুয়ে পর এবার।" - অসীম বলল। রমিত - " হ্যাঁরে পোড়ারমুখো আমারে দেইখ্যা জ্বলন তো হইবই। অহন তুই চাইনার মাইয়াটার লগে প্রেম করতাছস্ , আমি হইলাম গিয়া কাবাব মে হাড্ডি , জ্বলন তো হইবই।...