স্মার্টফোন ব্যবহারের মূল্যায়ণ
বাচ্চাদের জন্য স্মার্টফোন কতখানি যথোপযুক্ত? এরকম একটা প্রশ্ন এখন
অনেক বাবা মায়ের মনেই ঘুরপাক খায়। আমার এক পিসিমণি ফেসবুকে আমার কিঞ্চিত লেখালেখি
পড়বার পর আমাকে এ বিষয়ে কিছু লিখতে অনুরোধ করেছেন। বিষয়টা যথেষ্ট তর্কসাপেক্ষ।
আমার মনে হয় এক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাচ্চাদের দিক বা তাদের অভিভাবকদের দিক থেকে না
ভেবে বর্তমান সময় ও বাচ্চা এবং তাদের অভিভাবকদের মানসিকতা নিয়েও ভাবা উচিত। এখন
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে আসে বাচ্চাটা কিরকম, তার বয়স কত, সে চৌবাচ্চা নাকি ইঁচড়ে
পাকা, জেদি নাকি বুদ্ধিদীপ্ত? আরও আছে। যেমন, যে কোন বাচ্চা যে কিনা মুঠোফোন
ব্যবহার করছে সেটা কি হিসাবে সে ব্যবহার করছে বা তাকে তার অভিভাবকেরা কি কি দেখবার
জন্য ব্যবহার করতে দিচ্ছেন। সেগুলো অবশ্যই লাখ টাকার প্রশ্ন বলে আমার মনে হয়।
বিষয়ের গভীরে আসার আগে দুটো ঘটনা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। বেশ
কিছুদিন আগে ফেসবুকেতেই একটা ভোটিং দেখেছিলাম। সেখানে প্রশ্ন ছিল, বাচ্চারা ফেসবুক
ব্যবহার করতে পারে কিনা। “হ্যাঁ” বা “না” উত্তরে সপক্ষে যুক্তি দেবার কথাও প্রকাশ
করেছিলেন সেই পোস্টের মালিক। উত্তরে দেখেছিলাম আধুনিক অভিভাবকগণ ৫৭ শতাংশ
বাচ্চাদের ফেসবুক ব্যবহার করাকে সমর্থন করেছেন। বাকি ৪৩ শতাংশ অভিভাবকগণ সমর্থন
করেননি। সেক্ষেত্রে প্রত্যেকে তাদের স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তিও সাজিয়েছিলেন। যদিও
সেইসব যুক্তির খুব কমসংখ্যকই আমার মনোমত হয়েছে। অবশ্য সেটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত
মত। আমার নিজের মত ছিল বয়েসের সময়সীমার উপর। আমি জানিয়েছিলাম ১২ বা নিদেনপক্ষে ১০
বছরের বাচ্চাদের নীচে ফেসবুক ব্যবহার করবার কোনও প্রয়োজন নেই। একজন বাচ্চার বৃদ্ধি
ও বিকাশ ওই ১০/১২ বছরের পর থেকেই ঠিক ঠাক হতে থাকে যখন সে ওই বহির্জগতের আদবকায়দা
গুলো ঠিক মতো বুঝতে পারে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার মনেরও বৃদ্ধি হতে থাকে। সেই
কারণে আমি নিজে ওই বয়েসের সময়সীমাতে বিশ্বাসী ছিলাম ও আছি। আসলে ইন্টারনেট, ভিডিও
গেম এগুলো সব একেকটা প্রলোভনের যন্ত্র। এই প্রলোভনে পা না বাড়ানোর জন্য যা যা
করবার সেটা অভিভাবকদেরকেই করতে হবে একেকটা সময়সীমা নির্ধারণ করে বা বয়সসীমা
নির্ধারণ করে বা বাচ্চার মানসিক অবস্থা বিচার করে। আসলে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি এই
অন্তরজালের প্রতি আসক্ত। কিছু সাইট তো এমন আছেই যা আমাদের প্রলোভিত করে, লালায়িত
করে। আমাদের পরিণত, প্রাপ্তবয়স্ক মন হয়তো সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু একজন
বাচ্চার ক্ষেত্রে সেটাতো সম্ভব নয়। তাকে নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতাতো অভিভাবকদের
হাতে। তাই সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি নির্ধারণ করে অভিভাবকদেরকেই ঠিক করতে হবে বাচ্চাকে
তিনি ঠিক কি কি জিনিস ব্যবহার করতে দেবেন আর কি কি দেবেন না।
এবারে আসি দ্বিতীয় ঘটনাটিতে। আমার এক ফেসবুক বন্ধু আছেন। আমি তার একজন
বিশাল বড় গুণমুগ্ধ ভক্তও বটে। আসলে তার লেখনী এবং কর্মপদ্ধতি আমাকে তার প্রতি
আসক্ত করে। তা গতবছর হঠাৎ করে একদিন দেখলাম সেই বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন
যে তিনি এক কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছেন। সাথে কন্যার ছবিটিও আপলোড করা। আমি ভাবলাম
বেশ তো, ঠিকই আছে। এখন তো সবাই নিজের বিয়ের ছবি, ঘুরতে যাওয়ার ছবি, বাবা হওয়ার
ছবি, মা হওয়ার ছবি ফেসবুকে আপলোড করেন। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু আমার মন
বলছিল সেই বন্ধু না জানি ফেবুতে আরও কিছু করে দেখায় যা আমাদের মতো সাধারণ মানের
মনের মানুষকে ভাবাবে। ভাবতে বাধ্য করাবে। হ্যাঁ ঠিক তাই। তার পরের কয়েকদিনের
মধ্যেই দেখলাম সেই বন্ধুর মেয়ের নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইল। যাতে ওই বাচ্চা
মেয়েটির বয়ানে সেই বন্ধুটি লিখছেন যে ‘তোমরা বন্ধুরা দেখ আজ আমি মাম্মির কোলে করে
বাড়ি এলাম, বাপি, ঠাম্মি, দাদাই সবাই আমাকে কোলে করে খালি আদর করেই চলেছে। কিন্তু
আমি তো খুব ছোট আমি কি এত চাপ নিতে পারি বল?’ আজও সেই বন্ধু তার মেয়ের বয়ানে তার
শৈশবকে আমাদের সামনে তুলে ধরছেন। আসলে বাচ্চা বোধহয় আমরা প্রত্যেকেই ভালবাসি। কোন
এক শিশুর চোখের সামনে গড়ে ওঠা দেখতে আমরা প্রত্যেকেই চাই। তাই বোধহয় এক অমোঘ
আকর্ষণ অনুভব করি সেই বাচ্চা মেয়েটির প্রোফাইল দেখলে। এই একবছর ধরে একটু একটু করে
সেই বাচ্চা মেয়েটিকে বড় হতে দেখলাম। সেটা শুধুমাত্র মেয়েটির ফটো বা ভিডিও দেখে নয়।
ওকে বড় হতে দেখলাম ওর বাবার প্রত্যেকদিনের লেখনীর মাধ্যমে। একটু একটু করে ছোট্ট
মেয়েটিকে, মেয়েটির দিনলিপির মাধ্যমে আমরা সেই ছোট্ট মেয়েটিকে চিনতে পারলাম,
ভালবেসে ফেললাম। এবার পাঠক একবার ভাবুন এই ছোট্ট মেয়েটা যার কিনা বছরখানেক বয়স সে
যখন ১০/১২ বছরের হবে তখন সে তার ফেসবুক প্রোফাইলে দেখবে তার নিজস্ব শৈশব যেটার
রচয়িতা তার বাবা। একবার ভাবুন তার মনে কতই না খুশির আবহ ফুটে উঠবে যখন সে তার শৈশবের
ইতিহাস দেখতে পাবে তার নিজের প্রোফাইলের মাধ্যমে।
সুতরাং এই ঘটনাটির মাধ্যমে আমি এটাই বোঝাতে চাইছি যে স্মার্টফোন বা
ইন্টারনেট বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটকে আমরা অভিভাবকেরা কিন্তু চাইলেই সঠিক
উপায়ে ব্যবহার করতে পারি। এগুলির সঠিক ভাবে প্রয়োগটাই কিন্তু একটা ভাল কাজের সুফল
আনতে পারে।
কোন একটা লেখায় পড়েছিলাম যে প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজেকে ট্রেন্ডসেটার
হিসাবে তৈরি করা। যাতে সেই মানুষটির বাচ্চা তাকে ফলো করে এবং সঠিক পথের সন্ধান
পায়। তা সেই দায়িত্বটা কিন্তু অভিভাবকদের উপরই বর্তায়। স্মার্টফোন ছাড়া, সোশ্যাল
নেটওয়ার্কিং ছাড়া, ইন্টারনেট ছাড়া আজ দুনিয়া অচল। সুতরাং এগুলোকে নিয়েই আমাদের চলতে
হবে। বাচ্চাদের হাতে সেগুলিকে তুলেও দিতে হবে কিন্তু তার প্রয়োগ কিভাবে হবে সেটা
শেখানোই বোধহয় অভিভাবকদের কর্তব্য। অযথা বাচ্চা বলে তার হাতের মোবাইল ফোনটা কেড়ে
নেবেন অথবা বাচ্চা ভিডিও গেম পছন্দ করেন বলে সারা দিনরাত তার হাতে ফোনটা দিয়ে
রাখবেন, এ দুটোর কোনটাই সমর্থনযোগ্য নয়।
সবশেষে বলি, হাতে থাকা ছুড়ি দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানও যায় আবার
প্রাণ কেড়ে নেওয়াও যায়। সুতরাং ছুড়ি ব্যবহারের প্রয়োগ জানাটাই জরুরী।
Faboulous. More writings need about same type of topics.
ReplyDeleteDefinitely I will try.
ReplyDelete