MISSION SANDAKFU - 5TH EDITION
মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব
টোংলুর পথে
ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো?
- দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল।
- ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল।
- জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল।
ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় ।
- তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম ।
এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম । আমাদের পাঁচ জনের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হাঁটে শতদল । ওকে দেখলাম দুটো পাহাড়ী বাঁক টপকে একটা ছোট পাহাড়ী টিলার কাছে গিয়ে পৌছিয়েছে ও আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে । উদ্দেশ্য যাতে আমরা আরও তাড়াতাড়ি হাঁটি।
- এই সঞ্জীব তোর কাছে COCA 30 টা আছে না? একটু দে তো। - সর্বাশীষ বলল।
সঞ্জীব ব্যাগ থেকে COCA 30 বার করল ও আমাদের হাতে দিল। আমি, তন্ময় ও সর্বা দুই ফোটা করে COCA 30 খেয়ে নিলাম । যদিও আমার বা তন্ময়ের কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি । তবুও ওই PREVENTION IS BETTER THAN CURE এই ভাবনা থেকেই ওষুধ টি মুখে দেওয়া । সর্বাশীষের সামান্য একটু শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে আমরা চলতে থাকলাম পাহাড়ী বাঁক গুলো ধরে ধরে । কাছাকাছির মধ্যে শতদল কে আর দেখতে পেলাম না। ওর স্পিড বেশি থাকায় ও অনেকটা ওপরে চলে গেছে ততক্ষণে । এই চিত্রে পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ চড়াই । আমাদের প্রত্যেকেরই প্রায় ঘন ঘন নিশ্বাস প্রশ্বাস চলছে । আমি ফিল করলাম আমার জ্যাকেটের ভেতর ফুলহাতা টি শার্ট আর মাথার চুল ভিজে চপচপে হয়ে গেছে । আমি ঘামতে শুরু করেছি বেশ ভালো রকম । ঘাম জিনিসটা বরাবরই আমার একটু বেশি । এক্ষেত্রেও তাই হল। তার উপর আবার চড়াই রাস্তা। একে চড়াই তার উপর আমার পিত্ত চড়া ধাত। ঘাম তো হবেই । বেশ কিছুক্ষণ চলবার পর দেখতে পেলাম পাহাড়ী রাস্তাটি ধীরে ধীরে অনেকটা জায়গা নিয়ে সমতলে পরিণত হয়েছে। মনে হতে লাগল যেন আমরা পাঁচজনে একটা পাহাড়ের ছাদে এসে উঠেছি। দূরে অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলাম শতদলকে । সবুজ ঘাসের উপর বসে জিরোচ্ছে। পাশে বসে জিভ নাড়াচাড়া করছে লাইকা । মাথার উপর দিয়ে কুয়াশা ও মেঘ একসাথে খেলা করছে। অপূর্ব সে দৃশ্য । একে একে আমরা সবাই সেই ঘাসের জমির উপর এসে বসলাম । আবার শুরু হল আরও এক খেপ ফটো সেশন। যেখানে বসলাম সেখান থেকে বাঁদিকে চড়াই রাস্তা দিয়ে আমরা উঠে এসেছি। সেই রাস্তার পাশেই গভীর খাদ। আর তার পাশেই আরেকটি পাহাড়ের কোল। সেই পাহাড়ের গায়ে দারুণ মেঘের খেলা চলতে থাকল। মাঝে মাঝে সুয্যিমামা লুকোচুরি করতে থাকায় পাহাড়ের গায়ের রংটাও অনবরত বদলাতে থাকল।সে দৃশ্য কখনওই ভোলবার নয়। ইতিমধ্যেই হঠাত্ দেখতে পেলাম প্রায় 300-350 মিটার দূরে ডানদিকে বেশ কয়েকটি চিনা প্যাটার্নের বাড়ি । দেখলাম সেখান থেকে একটা কমবয়সী ছেলে আমাদেরকে হাত নেড়ে ডাকছে । কে ও।
- সঞ্জীব, কে ঐ ছেলেটা? হাইলি সাশপিশিয়াস। - মজা করে আমি বললাম।
পাশ থেকে শতদল বলল - আরে ও বুদ্ধ । আমাদের পোর্টার। নিশ্চয়ই চায়ের বন্দোবস্ত করেছে । তোর চশমাটা কি কাজ করছে না?
আমি চশমাটা চোখ থেকে খুললাম । চশমাতে বিন্দু বিন্দু জলকণা জমেছে কুয়াশার জন্য । সাথে আমার দরদর করে গড়িয়ে পড়া মাথার ঘাম তো আছেই । ট্রেকিং করাটাতো আর কোন লাক্সারি নয়। একেবারে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবেই এ যাত্রা চলছে আমাদের । যাইহোক দেখলাম বুদ্ধ ও যোগেন আমাদেরকে ডাকছে সেদিকে যাওয়ার জন্য ।
- বাঃ চায়ের টেস্ট টা অসাধারণ ।
- স্যার জী ইয়ে দার্জিলিং টি হ্যায় ।
- লা জবাব । আজ সারাদিন এই চায়ের স্বাদ আমি জিভে করে বয়ে বেড়াব ।
- সত্যিই অতুলনীয় ।
আমরা সবাই সেই চায়ের প্রশংসা না করে পারলাম না। সাথে খেলাম শুকনো বান পাউরুটি ও বিস্কুট । কিন্তু আমাদের সঙ্গে লাইকাকে আর দেখতে পেলাম না । জিজ্ঞাসা করায় যোগেন বলল যে ও এরপর থেকে আর উপরে উঠবে না । ওর এলাকার বাইরে আর যাবে না । লাইকাকে সান্দাকফু নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন আমার অধরাই থেকে গেল ।
ঘড়িতে দেখলাম এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। এখান থেকে মোটামুটি আরও এক দেড় ঘন্টা হেঁটে লামেডুরা পৌছতে হবে । লামেডুরাতে গিয়ে আমাদের লাঞ্চ সারতে হবে । আমরা পাঁচ জনে আবার ধীরে ধীরে চলা শুরু করলাম ।কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে দশ বারো হাত দূরে কি আছে, তা ঠাহর করতে পারছিলাম না । হাতে লাঠি, পিঠে ব্যাগ,মাথায় টুপি সমেত কাঁপতে কাঁপতে চলেছি আমরা । এই জায়গায় হাওয়াটাও খুব বেশি ।কারণ এই জায়গাটা পাহাড়ের উপর বিস্তৃত একটা সমতল এলাকা । আস্তে আস্তে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌছে গেলাম লামেডুরা।
লামেডুরাতে গিয়ে দেখলাম দুটো ছোট কুঁড়েঘরের মতো ঘর। কাঠের তৈরি ওপরে টিনের শেড । বেশ অনেকরকম কারুকাজ করা। আমরা একটা ঘরের মধ্যে গিয়ে বসলাম । ঘরের মাঝখানে একটা গোলটেবিল । আমরা পাঁচ জনে সেই টেবিলটাকে ঘিরে বসলাম । হাওয়ার তীব্রতা বেড়ে যাওয়াতে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম । ঘরটির একটি দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে এক হাত বাই এক হাত মাপের একটা কাঁচ লাগানো রয়েছে। একদম স্বচ্ছ । ওখান দিয়েই ঘরটাতে আলো ঢুকছে । কিন্তু হাওয়া ঢুকতে পারছে না। ঘরটির সামনে দোকান করার জায়গা। নিত্যসামগ্রী কিছু কৌটতে সাজানো রয়েছে। সাজানো গোছানো জিনিস গুলোকে ভালভাবে লক্ষ করলে এই পাহাড়ী মানুষদের শৌখিনতার ছাপ স্পষ্ট চোখে পড়ে । খাওয়ার টেবিলে যে টেবিলক্লথ টা বিছানো রয়েছে তাতে দেখলাম বেশ সুন্দর ফুল ফুল ছাপা কারুকাজ । আমাদের শহরাঞ্চলে এই ধরনের কাজ চোখে পড়ে নি আমার । বাইরে এসে দেখলাম বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি এবং ডাল সমান সাইজ মত কেটে সুন্দর করে একটা মাচায় মজুত করে রাখা । সামনে ফাঁকা জায়গাটায় একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা আমাদের পোর্টার যোগেনের সাথে ফুটবল খেলছে । যোগেন এতটা চড়াই পথ উঠে এসেও কি করে যে আবার দৌড়াদৌড়ি শুরু করল সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না । আমরা যে ঘরে বসেছিলাম তার সামনের ঘরটাতে কিচেন। আমি সেই ঘরে গিয়ে দেখলাম বড়ো বড়ো কাঠের জ্বালানিতে রান্না হচ্ছে। একটি বছর বিশ বাইশের মেয়ে রান্না করছে। সম্ভবত সেই বাচ্চাটির মা। পাশে বুদ্ধকে দেখলাম স্যালাড কাটছে আমাদের জন্য। যোগেন খেলা ছেড়ে এসে খাওয়ার প্লেটগুলো সাজাতে লাগল। এই পাহাড়ী মানুষদের মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করলাম যে ওরা কখনও বসে থেকে সময় নষ্ট করে না। সবসময়ই কিছু না কিছু কাজে নিজেদেরকে যুক্ত রাখে। আমাদের মতো ল্যাদখোরদের কাছে এটা অবশ্যই একটা শিক্ষণীয় বিষয়।
এখান থেকে আমাদের আরও 3-4 কিমি পথ হাঁটতে হবে টোংলু পৌঁছানোর জন্য। পথ অবশ্য চড়াই, উতরাই মিলিয়ে মিশিয়ে থাকবে এমনই শুনেছি। মাঝে মাঝে সমতল পথও আছে। রাস্তায় যখন নেমেছি চলতে তো হবেই। এর পরের পথ কিরকম ------------জানাব --------
পরের পর্বে ।
মিশন সান্দাকফু - পঞ্চম পর্ব
টোংলুর পথে
ওপরে উঠতে উঠতে আরও দুটো পাহাড়ী বাঁকের পথ শেষ করলাম । সামনেই বাঁ দিকের ধারটাতে একটু সমান জায়গা রয়েছে । ঘাসের জমি । এই দশ ফুট বাই বারো ফুট জায়গার জমি হবে । সেখানেই দেখলাম বুদ্ধ এবং যোগেন কে। ওরা দুজন আমাদের বড়ো বড়ো চারখানা রুকস্যাক ব্যাগের ওপর মাথা রেখে অর্ধশায়িত হয়ে আছে । আর ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে । সর্বাশীষ জিজ্ঞাসা করল - তুমলোগ কিতনা টাইম সে ইহা বেয়ঠে হো?
- দশ মিনিট হুয়া হ্যায় । আপ লোগ আগে যাতে রহিয়ে। হমলোগ তুরন্ত পহুচ জায়েঙ্গে। - বুদ্ধ বলল।
- ভাইয়া রাস্তে মে কোয়ি চায়ে বায়ে কা ইন্তেজাম হো সকতা হ্যায়? - শতদল জিজ্ঞাসা করল।
- জরুর হো সকতা হ্যায় । চলিয়ে না । আচ্ছা চায়ে পিলায়েঙ্গে আজ। - যোগেন বলল।
ও আরও বলল - দাদা ইয়ে ব্যাগসে অগর কুছ সামান আপলোগ লে লেতে তো আচ্ছা হোতা । ওহ্ ক্যায়া হ্যায় না, দো দো ব্যাগ বহুত জাদা ভারি হো গয়া। চলনে মে দিক্কত হো রহা হ্যায় ।
- তুমলোগ চলতে রহো । কুছ টাইম বাদ খানে কা যো সামান হ্যায় না ওহ্ হম লে লেঙ্গে । - আমি বললাম ।
এই বলে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম । আমাদের পাঁচ জনের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হাঁটে শতদল । ওকে দেখলাম দুটো পাহাড়ী বাঁক টপকে একটা ছোট পাহাড়ী টিলার কাছে গিয়ে পৌছিয়েছে ও আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে । উদ্দেশ্য যাতে আমরা আরও তাড়াতাড়ি হাঁটি।
- এই সঞ্জীব তোর কাছে COCA 30 টা আছে না? একটু দে তো। - সর্বাশীষ বলল।
সঞ্জীব ব্যাগ থেকে COCA 30 বার করল ও আমাদের হাতে দিল। আমি, তন্ময় ও সর্বা দুই ফোটা করে COCA 30 খেয়ে নিলাম । যদিও আমার বা তন্ময়ের কোনও সমস্যা তৈরি হয়নি । তবুও ওই PREVENTION IS BETTER THAN CURE এই ভাবনা থেকেই ওষুধ টি মুখে দেওয়া । সর্বাশীষের সামান্য একটু শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে আমরা চলতে থাকলাম পাহাড়ী বাঁক গুলো ধরে ধরে । কাছাকাছির মধ্যে শতদল কে আর দেখতে পেলাম না। ওর স্পিড বেশি থাকায় ও অনেকটা ওপরে চলে গেছে ততক্ষণে । এই চিত্রে পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ চড়াই । আমাদের প্রত্যেকেরই প্রায় ঘন ঘন নিশ্বাস প্রশ্বাস চলছে । আমি ফিল করলাম আমার জ্যাকেটের ভেতর ফুলহাতা টি শার্ট আর মাথার চুল ভিজে চপচপে হয়ে গেছে । আমি ঘামতে শুরু করেছি বেশ ভালো রকম । ঘাম জিনিসটা বরাবরই আমার একটু বেশি । এক্ষেত্রেও তাই হল। তার উপর আবার চড়াই রাস্তা। একে চড়াই তার উপর আমার পিত্ত চড়া ধাত। ঘাম তো হবেই । বেশ কিছুক্ষণ চলবার পর দেখতে পেলাম পাহাড়ী রাস্তাটি ধীরে ধীরে অনেকটা জায়গা নিয়ে সমতলে পরিণত হয়েছে। মনে হতে লাগল যেন আমরা পাঁচজনে একটা পাহাড়ের ছাদে এসে উঠেছি। দূরে অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পেলাম শতদলকে । সবুজ ঘাসের উপর বসে জিরোচ্ছে। পাশে বসে জিভ নাড়াচাড়া করছে লাইকা । মাথার উপর দিয়ে কুয়াশা ও মেঘ একসাথে খেলা করছে। অপূর্ব সে দৃশ্য । একে একে আমরা সবাই সেই ঘাসের জমির উপর এসে বসলাম । আবার শুরু হল আরও এক খেপ ফটো সেশন। যেখানে বসলাম সেখান থেকে বাঁদিকে চড়াই রাস্তা দিয়ে আমরা উঠে এসেছি। সেই রাস্তার পাশেই গভীর খাদ। আর তার পাশেই আরেকটি পাহাড়ের কোল। সেই পাহাড়ের গায়ে দারুণ মেঘের খেলা চলতে থাকল। মাঝে মাঝে সুয্যিমামা লুকোচুরি করতে থাকায় পাহাড়ের গায়ের রংটাও অনবরত বদলাতে থাকল।সে দৃশ্য কখনওই ভোলবার নয়। ইতিমধ্যেই হঠাত্ দেখতে পেলাম প্রায় 300-350 মিটার দূরে ডানদিকে বেশ কয়েকটি চিনা প্যাটার্নের বাড়ি । দেখলাম সেখান থেকে একটা কমবয়সী ছেলে আমাদেরকে হাত নেড়ে ডাকছে । কে ও।
- সঞ্জীব, কে ঐ ছেলেটা? হাইলি সাশপিশিয়াস। - মজা করে আমি বললাম।
পাশ থেকে শতদল বলল - আরে ও বুদ্ধ । আমাদের পোর্টার। নিশ্চয়ই চায়ের বন্দোবস্ত করেছে । তোর চশমাটা কি কাজ করছে না?
আমি চশমাটা চোখ থেকে খুললাম । চশমাতে বিন্দু বিন্দু জলকণা জমেছে কুয়াশার জন্য । সাথে আমার দরদর করে গড়িয়ে পড়া মাথার ঘাম তো আছেই । ট্রেকিং করাটাতো আর কোন লাক্সারি নয়। একেবারে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবেই এ যাত্রা চলছে আমাদের । যাইহোক দেখলাম বুদ্ধ ও যোগেন আমাদেরকে ডাকছে সেদিকে যাওয়ার জন্য ।
- বাঃ চায়ের টেস্ট টা অসাধারণ ।
- স্যার জী ইয়ে দার্জিলিং টি হ্যায় ।
- লা জবাব । আজ সারাদিন এই চায়ের স্বাদ আমি জিভে করে বয়ে বেড়াব ।
- সত্যিই অতুলনীয় ।
আমরা সবাই সেই চায়ের প্রশংসা না করে পারলাম না। সাথে খেলাম শুকনো বান পাউরুটি ও বিস্কুট । কিন্তু আমাদের সঙ্গে লাইকাকে আর দেখতে পেলাম না । জিজ্ঞাসা করায় যোগেন বলল যে ও এরপর থেকে আর উপরে উঠবে না । ওর এলাকার বাইরে আর যাবে না । লাইকাকে সান্দাকফু নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন আমার অধরাই থেকে গেল ।
ঘড়িতে দেখলাম এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। এখান থেকে মোটামুটি আরও এক দেড় ঘন্টা হেঁটে লামেডুরা পৌছতে হবে । লামেডুরাতে গিয়ে আমাদের লাঞ্চ সারতে হবে । আমরা পাঁচ জনে আবার ধীরে ধীরে চলা শুরু করলাম ।কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে দশ বারো হাত দূরে কি আছে, তা ঠাহর করতে পারছিলাম না । হাতে লাঠি, পিঠে ব্যাগ,মাথায় টুপি সমেত কাঁপতে কাঁপতে চলেছি আমরা । এই জায়গায় হাওয়াটাও খুব বেশি ।কারণ এই জায়গাটা পাহাড়ের উপর বিস্তৃত একটা সমতল এলাকা । আস্তে আস্তে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌছে গেলাম লামেডুরা।
লামেডুরাতে গিয়ে দেখলাম দুটো ছোট কুঁড়েঘরের মতো ঘর। কাঠের তৈরি ওপরে টিনের শেড । বেশ অনেকরকম কারুকাজ করা। আমরা একটা ঘরের মধ্যে গিয়ে বসলাম । ঘরের মাঝখানে একটা গোলটেবিল । আমরা পাঁচ জনে সেই টেবিলটাকে ঘিরে বসলাম । হাওয়ার তীব্রতা বেড়ে যাওয়াতে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম । ঘরটির একটি দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে এক হাত বাই এক হাত মাপের একটা কাঁচ লাগানো রয়েছে। একদম স্বচ্ছ । ওখান দিয়েই ঘরটাতে আলো ঢুকছে । কিন্তু হাওয়া ঢুকতে পারছে না। ঘরটির সামনে দোকান করার জায়গা। নিত্যসামগ্রী কিছু কৌটতে সাজানো রয়েছে। সাজানো গোছানো জিনিস গুলোকে ভালভাবে লক্ষ করলে এই পাহাড়ী মানুষদের শৌখিনতার ছাপ স্পষ্ট চোখে পড়ে । খাওয়ার টেবিলে যে টেবিলক্লথ টা বিছানো রয়েছে তাতে দেখলাম বেশ সুন্দর ফুল ফুল ছাপা কারুকাজ । আমাদের শহরাঞ্চলে এই ধরনের কাজ চোখে পড়ে নি আমার । বাইরে এসে দেখলাম বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি এবং ডাল সমান সাইজ মত কেটে সুন্দর করে একটা মাচায় মজুত করে রাখা । সামনে ফাঁকা জায়গাটায় একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা আমাদের পোর্টার যোগেনের সাথে ফুটবল খেলছে । যোগেন এতটা চড়াই পথ উঠে এসেও কি করে যে আবার দৌড়াদৌড়ি শুরু করল সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না । আমরা যে ঘরে বসেছিলাম তার সামনের ঘরটাতে কিচেন। আমি সেই ঘরে গিয়ে দেখলাম বড়ো বড়ো কাঠের জ্বালানিতে রান্না হচ্ছে। একটি বছর বিশ বাইশের মেয়ে রান্না করছে। সম্ভবত সেই বাচ্চাটির মা। পাশে বুদ্ধকে দেখলাম স্যালাড কাটছে আমাদের জন্য। যোগেন খেলা ছেড়ে এসে খাওয়ার প্লেটগুলো সাজাতে লাগল। এই পাহাড়ী মানুষদের মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করলাম যে ওরা কখনও বসে থেকে সময় নষ্ট করে না। সবসময়ই কিছু না কিছু কাজে নিজেদেরকে যুক্ত রাখে। আমাদের মতো ল্যাদখোরদের কাছে এটা অবশ্যই একটা শিক্ষণীয় বিষয়।
এখান থেকে আমাদের আরও 3-4 কিমি পথ হাঁটতে হবে টোংলু পৌঁছানোর জন্য। পথ অবশ্য চড়াই, উতরাই মিলিয়ে মিশিয়ে থাকবে এমনই শুনেছি। মাঝে মাঝে সমতল পথও আছে। রাস্তায় যখন নেমেছি চলতে তো হবেই। এর পরের পথ কিরকম ------------জানাব --------
পরের পর্বে ।


Bapok interesting series. Valo laglo pore.
ReplyDeleteThank you boss
ReplyDeleteখুব ভালো!!! এর পরেরটা কি পোষ্ট করেছ?
ReplyDeleteসবকটি পর্বই পোস্ট করেছি। প্রথম থেকে দশম পর্ব পর্যন্ত। দেখো।
Delete